বিশ্ব যখন মনে করছিল মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাত হয়তো অবসানের দিকে এগোচ্ছে, তখন ঘটনাপ্রবাহ আবারও প্রমাণ করল- এই অঞ্চলে শান্তির পথ কখনোই সরল নয়। মাত্র কয়েকদিন আগে হরমুজ প্রণালীর আকাশে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান জর্ডান, বাহরাইন ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
কিন্তু একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তেহরানের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলেন, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং ওয়াশিংটনের বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। এদিকে, আরও বিস্ময়কর ছিল সেই প্রতিবেদন, যেখানে দাবি করা হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। কিন্তু আবুধাবি তাৎক্ষণিকভাবে এ খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। প্রশ্ন হচ্ছে- আসলে কী ঘটছে?
যুদ্ধ ও কূটনীতির দ্বৈত খেলা
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কিছু নয় যে যুদ্ধ ও আলোচনা একসঙ্গে চলে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো, গত কয়েক মাসে এটি প্রায় ৩৯তম বার যখন বলা হচ্ছে ‘চুক্তি খুব কাছাকাছি’। অথচ প্রতিবারই সেই ঘোষণার পর নতুন সামরিক সংঘাত দেখা গেছে। কারণ উভয় পক্ষের রাজনৈতিক প্রয়োজন ভিন্ন।
ট্রাম্প প্রশাসন চায় বিশ্বকে দেখাতে যে কঠোর সাম-রিক চাপই ইরানকে আলোচনার টেবিলে এনেছে। অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্ব দেশের জনগণ ও বিপ্লবী গার্ডকে বোঝাতে চায় যে তারা কোনো আত্মসমর্পণ করছে না। ফলে উভয় পক্ষই একই আলোচনাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষায় উপস্থাপন করছে।
নেতানিয়াহু-ট্রাম্প: একই শিবিরে, ভিন্ন লক্ষ্য
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত দূরত্ব। ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ থামানোর কথা বললেও ইসরায়েল লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে। বৈরুতে হামলা না চালানোর জন্য মার্কিন চাপ থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য একটি রাজনৈতিক সমঝোতা, যা তিনি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মনে করেন, ইরান ও হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত চাপ বজায় রাখা উচিত। এই কৌশলগত পার্থক্যই এখন সংঘাতকে আরও জটিল করছে।
হরমুজ: বিশ্বের অর্থনীতির নাড়ি
এই পুরো সংকটের কেন্দ্রবিন্দু আসলে পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার খসড়াগুলোর অন্যতম প্রধান বিষয় হলো হরমুজ পুনরায় উন্মুক্ত রাখা। কিন্তু একই সময়ে সেখানে ড্রোন ভূপাতিত হচ্ছে, জাহাজ লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে এবং সামরিক সংঘর্ষ চলছে। অর্থাৎ, কাগজে শান্তির আলোচনা চলছে, কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্র সক্রিয়। সর্বশেষ তথ্য হলো, ইরান হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছে।
কোথায় দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি?
বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনটি শব্দে ব্যাখ্যা করা যায়- ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’। উভয় পক্ষই এমন একটি অবস্থানে রয়েছে যেখানে তারা যুদ্ধ বাড়াতে চায় না, কিন্তু নিজেদের দুর্বল দেখাতেও রাজি নয়। ফলে সীমিত হামলা, পাল্টা হামলা এবং সমান্তরাল আলোচনা চলতে থাকবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে তিনটি সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
প্রথমত, একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হতে পারে, যেখানে ইরান কিছু পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করবে এবং বিনিময়ে কিছু অর্থনৈতিক ছাড় পাবে।
দ্বিতীয়ত, কোনো বড় সামরিক ঘটনা যেমন মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যাপক প্রাণহানি বা ইসরায়েলে বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুরো প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিতে পারে।
তৃতীয়ত, লেবানন ফ্রন্টই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ ওয়াশিংটন ও তেহরান আপসের দিকে গেলেও ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত স্বাধীনভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে।
আজকের মধ্যপ্রাচ্যকে বুঝতে হলে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকালে হবে না, আলোচনার টেবিলের দিকেও তাকাতে হবে। সমস্যা হলো, এই দুই মঞ্চে সম্পূর্ণ ভিন্ন নাটক চলছে। ট্রাম্প বলছেন, চুক্তি প্রায় সম্পন্ন। ইরান বলছে, এখনো নয়। আর ইসরায়েল মাঠে এমন আচরণ করছে যেন যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো কারণই নেই।
সুতরাং বিশ্ব আজ যে প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছে তা হলো- আমরা কি শান্তির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, নাকি আরেকটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রাক্কালে?
বর্তমান বাস্তবতা বলছে, মধ্যপ্রাচ্য এখনো সেই বিপজ্জনক মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করছে, যেখানে একটি কলমের স্বাক্ষর যেমন শান্তি আনতে পারে, তেমনি একটি ক্ষেপণাস্ত্র পুরো অঞ্চলকে জ্বালিয়েও দিতে পারে।

















