চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

বন্দুকের ছায়ায় বিশ্বকাপ

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৫ জুন, ২০২৬ | ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ

একটি পৃথিবী কল্পনা করুন যেখানে প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনামে যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাত স্থান করে নিচ্ছে। এমন এক বিশ্বে ফুটবল বিশ্বকাপের মতো একটি ক্রীড়া আয়োজনকে অনেকেই হয়তো বিনোদনের বিষয় হিসেবে দেখবেন। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, মানবিক সংহতি এবং বৈশ্বিক সহাবস্থানের এক অনন্য প্রতীক।

 

আজকের পৃথিবী এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। ইউক্রেনে যুদ্ধ অব্যাহত, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা থামার কোনো লক্ষণ নেই, গাজায় মানবিক বিপর্যয় বিশ্বের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে, আর ইসরায়েল-ইরান বৈরিতা পুরো অঞ্চলকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আফ্রিকা থেকে এশিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক সংকট লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে।

 

বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। দেশগুলো ক্রমশঃ উন্নত অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা এবং নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে। শান্তির ভাষার চেয়ে শক্তির ভাষা যেন অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতি প্রায়ই যুদ্ধের পরিণতি সামাল দিতে ব্যস্ত, যুদ্ধ প্রতিরোধে নয়।

 

এমন বাস্তবতায় একটি ফুটবল মাঠের গুরুত্ব কোথায়? উত্তরটি মানব সভ্যতার গভীরে নিহিত। মানুষ শুধু রাজনৈতিক নয় সামাজিক প্রাণীও। সংঘাত, প্রতিযোগিতা ও বিভক্তির মধ্যেও মানুষ মিলনের ক্ষেত্র খোঁজে। সেই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী একটি হলো খেলাধুলা, বিশেষতঃ ফুটবল।

 

ফুটবল এমন এক ভাষা, যা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে বোঝা যায়। এতে অনুবাদকের প্রয়োজন হয় না। একটি গোলের আনন্দ, একটি অবিশ্বাস্য সেভ কিংবা শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে একই আবেগ সৃষ্টি করে। যখন কোটি কোটি মানুষ একই ম্যাচ দেখেন, তখন তারা অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও একই অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠেন।

 

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক আইন অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেকের কাছে বিশ্ব যেন আবার ব্লক রাজনীতির দিকে ফিরে যাচ্ছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপ একটি ভিন্ন বার্তা বহন করে। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, কিন্তু ধ্বংস নেই; জাতীয় গৌরব আছে, কিন্তু দখলদারিত্ব নেই; আবেগ আছে, কিন্তু ঘৃণা বাধ্যতামূলক নয়। খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে নয়, পরাজিত করতে চায়। এটাই খেলাধুলা ও যুদ্ধের মৌলিক পার্থক্য।

 

বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর মানবিক শক্তি। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ যখন একত্রিত হয়, তখন তারা পরস্পরকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে। রাজনৈতিক প্রচারণা প্রায়ই অন্য জাতি বা সংস্কৃতিকে ভয় বা সন্দেহের চোখে দেখতে শেখায়। কিন্তু খেলাধুলা সেই দেয়াল ভাঙতে সাহায্য করে। একজন আর্জেন্টাইন সমর্থক, একজন মরোক্কান সমর্থক, একজন জাপানি সমর্থক কিংবা একজন বাংলাদেশি সমর্থকÑ সবার মধ্যে একটি সাধারণ পরিচয় তৈরি হয়, সেটা হল তারা ফুটবলের মানুষ।

 

তবে বিশ্বকাপের এই ইতিবাচক দিক নিয়ে কথা বলতে গেলে আরেকটি বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। খেলাধুলা কখনোই রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। গাজায় শিশুরা যখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বড় হচ্ছে তখন বিশ্বকাপের উৎসবের মধ্যেও মানবিক দায়িত্বের প্রশ্ন রয়ে যায়। যুদ্ধের শিকার মানুষদের কষ্টকে উপেক্ষা করে কোনো বৈশ্বিক উৎসব সম্পূর্ণ হতে পারে না।

 

বরং বিশ্বকাপের মতো আয়োজন আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। পৃথিবী যখন একত্রে একটি খেলাকে উদযাপন করতে পারে, তখন শান্তি, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কেন একত্র হতে পারবে না? যদি একটি ফুটবল ম্যাচ কয়েক ঘণ্টার জন্য কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব কেন সংঘাত নিরসনে একই ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করতে পারে না?

 

আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট অস্ত্রের ঘাটতি নয়; আস্থার ঘাটতি। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সামরিক জোট নয়; পারস্পরিক বোঝাপড়া। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির নয়, মানবতার।
এই কারণেই বর্তমান সময়ে বিশ্বকাপের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এটি যুদ্ধের বিকল্প নয় কিন্তু যুদ্ধের বিপরীতে একটি শক্তিশালী প্রতীক। এটি শান্তিচুক্তি নয়, শান্তির সম্ভাবনার স্মারক। এটি কূটনীতি নয়, কূটনীতির জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সংযোগের ক্ষেত্র তৈরি করে।

 

একটি ফুটবল পৃথিবী বদলে দিতে পারে না। কিন্তু একটি ফুটবল আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারে যে বুলেট, বোমা ও বিভাজনের বাইরেও একটি পৃথিবী সম্ভব। এমন একটি পৃথিবী, যেখানে প্রতিযোগিতা যেমন থাকবে একইসঙ্গে থাকবে সহাবস্থানও। ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু শত্রুতা নয়। জাতীয় পরিচয় থাকবে, কিন্তু মানবতা তার ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে।

 

আজকের বিশ্বে এই বার্তাটিই সম্ভবত সবচেয়ে মূল্যবান। কারণ শেষ পর্যন্ত সভ্যতার অগ্রগতি নির্ধারিত হবে আমরা কত শক্তিশালী অস্ত্র বানাতে পারি তা দিয়ে নয় বরং কত ভিন্ন মানুষকে একই মাঠে, একই স্বপ্নে এবং একই মানবিক বন্ধনে যুক্ত করতে পারি তা দিয়ে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট