সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে কুয়েত দাবি করেছে, ইরানের ড্রোন হামলায় দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা রাতভর ইরানের বিরুদ্ধে ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলা চালিয়েছে এবং ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত কেশম দ্বীপে চালানো হামলাটি ছিল ‘মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের হামলার চেষ্টার জবাব’।
এদিকে ইরান দাবি করেছে, প্রতিশোধ হিসেবে তারা একটি ‘আঞ্চলিক দেশের’ ভেতরে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান কুয়েতের দিকে দুটি এবং বাহরাইনের দিকে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এগুলোর কিছু মাঝপথে ভেঙে পড়ে এবং বাকিগুলো প্রতিহত করা হয়।
পরে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, ইরানি ড্রোন হামলায় দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এতে ভবনের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
বুধবার সকালে বিমানবন্দরটির সব ধরনের উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৌদ আবদুলআজিজ আল-ওতাইবি এ ঘটনাকে ‘ইরানের অপরাধমূলক আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে আছে। সপ্তাহ শেষে কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে আলোচনা এগোয়নি।
সেন্টকম জানায়, কেশম দ্বীপে হামলার লক্ষ্য ছিল একটি ইরানি সামরিক গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন। এছাড়া তারা তিনটি আক্রমণাত্মক ড্রোন ভূপাতিত করেছে, যেগুলো আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে চলাচলরত বেসামরিক জাহাজের দিকে ছোড়া হয়েছিল।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য আগ্রাসী মার্কিন সামরিক বাহিনীকে চড়া মূল্য দিতে হবে।’
সেন্টকম আরও জানায়, ইরান অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশের দিকে ‘বেশ কয়েকটি’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কুয়েতের দিকে ছোড়া দুটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় বা মাঝপথে ভেঙে পড়ে। আর বাহরাইনের দিকে ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইনের যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে ভূপাতিত করে।’
কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। অতীতেও ইরান এসব দেশে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
এর আগে সেন্টকম জানায়, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে তারা ইরানের দিকে যাওয়া একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করে দিয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, বতসোয়ানার পতাকাবাহী ‘এম/টি লেক্সি’ নামের জাহাজটির ক্রুরা বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
মঙ্গলবার ট্যাংকারটিতে আঘাত হানার ভিডিওও প্রকাশ করেছে সেন্টকম।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি তার সমালোচকদের উদ্দেশে বলেন, ‘শান্ত থাকুন’। তিনি দাবি করেন, ‘ইরান সত্যিই একটি চুক্তি করতে চায় এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো চুক্তি হবে।’
মার্কিন গণমাধ্যমগুলো এর আগে জানিয়েছিল, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির কিছু শর্তে সংশোধন চান ট্রাম্প। এজন্য তিনি তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।
বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজের খবরে বলা হয়, সংশোধনীগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনার কাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এসব দাবি নাকচ করে বলেন, ওয়াশিংটন ‘নিয়মিতভাবে নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছে এবং নতুন কিংবা পরস্পরবিরোধী দাবি তুলে ধরছে।’
সাম্প্রতিক বিবৃতিতে সেন্টকম আরও জানায়, খার্গ দ্বীপের দিকে যাওয়া বতসোয়ানার পতাকাবাহী ‘এম/টি লেক্সি’ জাহাজটির বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যকর করা হয়েছিল।
তাদের দাবি, জাহাজটির ক্রুরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একাধিকবার মার্কিন বাহিনীর নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হয়।
সেন্টকমের তথ্যমতে, অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ অচল করা হয়েছে এবং আরও ১২২টি জাহাজকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি বতসোয়ানা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার মধ্যেই যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসে প্রকাশ্যে হাজির হন। সেখানে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র দেয়নি।
রুবিও বলেন, ‘যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার সবকিছুই শর্তসাপেক্ষ। নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে কেবল সেই কারণগুলোর সমাধান হলে, যেগুলোর জন্য প্রথমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, আর সেই কারণ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।’
কংগ্রেসে এক পর্যায়ে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।’
তবে সংঘাতের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল সম্পর্কে আইনপ্রণেতারা নানা প্রশ্ন তুলতে থাকেন।
পূর্বকোণ/রাকিব
















