চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

মন্তব্য প্রতিবেদন

বৈরুতের পথে ইসরায়েল, আলোচনা ছাড়লো ইরান

মধ্যপ্রাচ্য কি আরও বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে?

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৩ জুন, ২০২৬ | ৭:০১ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ জমেছে। লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনা স্থগিত করা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য অসন্তোষ- এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একই ভূরাজনৈতিক সংকটের বিভিন্ন অধ্যায়, যার কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েল, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ক্রমবর্ধমানভাবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকা।

 

গত কয়েক মাস ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার একটি ধারা গড়ে উঠেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে এটি ছিল একটি সম্ভাব্য আশার আলো। ট্রাম্প প্রশাসনও উপলব্ধি করেছিল যে ইউক্রেন সংকট, চীনের উত্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আরেকটি বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। বিশেষ করে তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

কিন্তু এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে ইসরায়েলের বর্তমান নিরাপত্তা-দর্শন। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার বিশ্বাস করে- ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখাই ইসরায়েলের নিরাপত্তার একমাত্র কার্যকর উপায়। তাদের যুক্তি- আলোচনা ইরানকে সময় দেয়; শক্তি প্রয়োগ তাকে দুর্বল করে।

 

এই মৌলিক পার্থক্যই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি করেছে। ট্রাম্প যেখানে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খুঁজছেন, সেখানে নেতানিয়াহু সামরিক শক্তির মাধ্যমে বাস্তবতা পরিবর্তনের কৌশল অনুসরণ করছেন। বৈরুতে হামলা এবং লেবাননে অভিযান সম্প্রসারণ শুধু হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেনি; এটি কার্যত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

 

ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত। তেহরান আলোচনার প্রক্রিয়া স্থগিত করে জানিয়ে দিয়েছে যে, গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযান চলতে থাকলে অর্থবহ আলোচনা সম্ভব নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও এমন এক অবস্থায় ফিরে গেছে, যেখানে যুদ্ধের ভাষা কূটনীতির ভাষাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

 

এই সংকটে পাকিস্তানের ভূমিকাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অতীতে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ এই ধরণের বড় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা এবং একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের কারণে পাকিস্তান আজ দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের অন্যতম প্রধান সেতুবন্ধন। কিন্তু ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং ইরানের আলোচনাবিরতি পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে বর্তমান সংকটকে শুধু ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বা ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর শিকড় আরও গভীরে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে।

 

ইসরায়েল আজ নিজেকে চারদিক থেকে নিরাপত্তা হুমকির মুখে আবিষ্কার করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিরাপত্তাহীনতার কতটা বহিরাগত এবং কতটা তার নিজস্ব নীতির ফল?
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে থেকেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের সমর্থিত দুই-রাষ্ট্র সমাধান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি অধিগ্রহণ, দীর্ঘস্থায়ী দখলনীতি এবং ফিলিস্তিনি ভূখ-ের ক্রমাগত সংকোচন শান্তির ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। বহু বিশ্লেষকের মতে, দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পরিবর্তে বাস্তবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একটি স্বাধীন ও কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।

 

গাজায় সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিপুল প্রাণহানি, অবকাঠামোর ধ্বংস এবং মানবিক বিপর্যয় বিশ্বব্যাপী ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বহু ব্যক্তি, মানবাধিকার সংগঠন ও রাষ্ট্র ইসরায়েলের কর্মকা-কে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, কয়েক দশকের দখলনীতি, অবরোধ এবং সামরিক আধিপত্যের চূড়ান্ত প্রকাশ আমরা গাজায় প্রত্যক্ষ করছি।

 

সমালোচকদের মতে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি নীতি অনুসরণ করেছে যা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ক্রমাগত সংকুচিত করেছে। এর ফলে ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিরোধের মনোভাব আরও গভীর হয়েছে। নিরাপত্তা অর্জনের উদ্দেশ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলো শেষ পর্যন্ত নতুন নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দিয়েছে।

 

ইসরায়েলি নেতৃত্ব অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দেয়। তাদের মতে, ১৯৪৮ সাল থেকেই দেশটি অস্তিত্বগত হুমকির মুখে এবং প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটিও সত্য যে ১৯৪৮ সালের যুদ্ধ, ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট, ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধ, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ, লেবানন যুদ্ধসমূহ, গাজায় সাম্প্রতিক যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং বহু রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছে। কেউ কেউ একে ‘গণহত্যার লক্ষণযুক্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং সর্বশেষ ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি বড় সামরিক সংঘাতে ইসরায়েল কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল। এসব যুদ্ধের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকলেও একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে- সামরিক বিজয় কি কখনো রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পেরেছে?

 

আজকের বাস্তবতা হলো, ইসরায়েল সামরিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও রাজনৈতিকভাবে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে। গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন এবং ইরান, চারটি ফ্রন্টে একযোগে উত্তেজনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।

 

ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বর্তমান মতপার্থক্যও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। ট্রাম্প বুঝতে পারছেন যে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। অন্যদিকে নেতানিয়াহু মনে করেন যে সামরিক চাপ কমানো মানে ইরান ও তার মিত্রদের জন্য কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করা।

 

ফলে আজ মধ্যপ্রাচ্যে মূল সংঘাত কেবল ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নয়। এটি তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের সংঘর্ষ, ট্রাম্পের কূটনৈতিক বাস্তববাদ, নেতানিয়াহুর নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সামরিক কৌশল এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রতিরোধ রাজনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক প্রচেষ্টা, যা যুদ্ধ ও কূটনীতির মধ্যবর্তী শেষ সেতুগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

 

ইতিহাসের শিক্ষা হলো, স্থায়ী শান্তি কখনো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত হয় না। ফিলিস্তিনি প্রশ্নের একটি ন্যায়সঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। যতদিন সেই মূল সংকট অমীমাংসিত থাকবে, ততদিন বৈরুত, গাজা, তেহরান কিংবা জেরুজালেমÑযেখানেই আগুন জ্বলুক না কেন, তার শিখা পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করার ঝুঁকি বহন করবে।

 

তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বিশ্ব কি আরেকটি বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, নাকি শেষ পর্যন্ত কূটনীতি যুদ্ধকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সেই উত্তরটির ওপরই নির্ভর করছে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট