বিশ্ববাজারে আবার বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলা বাড়ায় সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার ছাড়িয়েছে।
এর আগে বুধবাার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) কৌশলগত মজুত থেকে দ্রুত তেল ছাড়ার কার্যক্রমে গতি আনার কথা জানায়। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ডিজেল সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। ওই ঘোষণার পর সাময়িকভাবে তেলের দাম কমেছিল।
তবে এক দিনের ব্যবধানেই বাজারে নতুন করে সরবরাহ-ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্যানুসারে, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ০৬ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৩০ ডলারে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৫১ ডলার। এতে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৭৯ ডলার।
রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম ও সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ায় বুধবার আইইএ কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার কার্যক্রমে গতি আনার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে ডিজেল সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। এর পরদিন তেলের দাম কমে যায়।
তবে উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত অষ্টম মাসে প্রবেশ করার পর অক্টোবর মাসে এই পথে জাহাজে হামলা বেড়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজে হামলা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো তেল রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও হামলার ঝুঁকির কারণে পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য ও নাবিকদের নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে।
সর্বশেষ হামলায় কাতারের উত্তরে এক তেলবাহী জাহাজে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। বুধবার যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা জানায়, এই হামলায় কিছু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, আহতও হয়েছে বেশি কিছু মানুষ।
এএনজেড ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পণ্যবাজার কৌশলবিদ ড্যানিয়েল হাইনস বলেন, অতীতে এ ধরনের হামলার পর পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ কমে গেছে, এমন নজির আছে। তবে এবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠানোর বিকল্প পথ না থাকায় উৎপাদক দেশগুলো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই রপ্তানি চালিয়ে যেতে চাইছে।
আইইএর তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তেও বাজারে তেমন একটা স্বস্তি ফেরেনি। হাইনসের মতে, আইইএর নতুন পরিকল্পনায় যে তেল ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর সময় ঘোষিত ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার মূল পরিকল্পনারই অংশ হতে পারে। অর্থাৎ এটা কৌশলগত মজুত থেকে নতুন করে অতিরিক্ত তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত না–ও হতে পারে।
হাইনস আরও বলেন, কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়লে সাময়িকভাবে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু এতে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয় না।
এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক ও ভোক্তা যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের তথ্যও তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। গত ২ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩২ লাখ ব্যারেল কমে ৪২ কোটি ৪১ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, মজুত ১৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে।
ডিজেল ও জেট ফুয়েলসহ ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুতও ৪২ হাজার ব্যারেল কমে ১০ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। বছরের এই সময়ে গত পাঁচ বছরের গড় মজুতের তুলনায় তা বেশ কম।
ফলে হরমুজ প্রণালিতে হামলার কারণে সরবরাহঝুঁকি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া জ্বালানি মজুত—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে তেলের দাম।
পূর্বকোণ/মিফতা


















