যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা ভাটা পড়েছে। এর প্রভাবে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিকারকদের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থান হারিয়েছে বাংলাদেশ। আগস্ট শেষে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে চীন। এর ফলে বাজারটিতে পোশাক রপ্তানিতে তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বরাবরই শীর্ষ স্থানে ছিল ভিয়েতনাম; এখনও সেই স্থান ধরে রেখেছে দেশটি। দ্বিতীয় ছিল বাংলাদেশ; সেই স্থান এখন দখলে নিয়েছে চীন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে অগাস্ট সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ (৫.৩৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।
অন্যদিকে, এই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬৩ কোটি সাত লাখ (৫.৬৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে; যা ২০২৫ সালের জানুয়ারি-অগাস্টের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ (৪.৬৬ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল; যা ছিল গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কম।
একই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫৫ কোটি ৫৭ লাখ (৪.৫৫ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। তবে এটিও ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের চেয়ে ৩৪ দশমিক ২১ শতাংশ কম।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মত আসে দেশটি থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০২২ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি (৯.৭৩ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছিল। কিন্তু পরের বছর প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, উল্টো রপ্তানি ২৫ শতাংশ কমে। ওই বছরে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৭২৯ কোটি ডলার।
২০২৪ সালে আবার রপ্তানি সামান্য বেড়ে ৭৩৪ কোটি ডলার হয়; শতাংশ হিসাবে বেড়েছিল দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে বেড়েছিল ১২ শতাংশের মত; রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৮২০ কোটি ডলার।
অটেক্সার তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা চলতি বছরের জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে মোট ৪ হাজার ৯০৭ কোটি ৫৫ লাখ (৪৯.০৭ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কম।
গত বছরের প্রথম আট মাসে ৫ হাজার ৩০০ কোটি ৮২ লাখ (৫৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক আমদানি করেছিলেন দেশটির ব্যবসায়ীরা।
এই আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় পোশাক সরবরাহকারী দেশ ছিল ভিয়েতনাম। তারপরও দেশটি থেকে আমদানি শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ কমে ১১০৫ কোটি ৯২ লাখ ডলার থেকে ১০৯৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলারে নামে।
পিস হিসেবে পোশাক রপ্তানি কমেছে ২.৭৫ শতাংশ
পিস বা পোশাকের সংখ্যার হিসাবে জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই আট মাসে ১৭৫ কোটি ৫৬ লাখ পিস পোশাক রপ্তানি হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ অঙ্ক ছিল ১৮০ কোটি ৫২ লাখ ৬০ হাজার পিস।
তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, পিস হিসাবে জানুয়ারি-অগাস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনেরও পোশাক রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ৬১ শতাংশ। এই আট মাসে বাজারটিতে ৩৮২ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার পিস পোশাক রপ্তানি করেছে চীন।
অন্যদিকে একই সময়ে পিসের হিসাবে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি কমেছে শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ। এই আট মাসে বাজারটিতে ৩০৯ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার পিস পোশাক রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম।
ভারতের কমেছে ২৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাসের কমেছে যথাক্রমে ২১ দশমিক শূন্য নয়, শূন্য দশমিক ২৭ এবং ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ।
তবে ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। কম্বোডিয়ার বেড়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ।
অন্যদিকে ইউনিট মূল্যের ক্ষেত্রেও প্রায় সব দেশেই পতন দেখা গেছে। সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে চীনের, ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। বাংলাদেশে ইউনিট মূল্য কমেছে তুলনামূলকভাবে মাঝারি হারে, ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য কমেছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়ার, ভারত ও পাকিস্তানের কমেছে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৪৯, শূন্য দশমিক ২৫, ২ দশমিক শূন্য চার ও ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
কী বলছেন রপ্তানিকারকরা
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি কেন কমছে এমন প্রশ্নে পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “সামগ্রিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা কিন্তু কম পোশাক আমদানি করেছে। তার প্রভাব আমাদের উপরও পড়েছে।
“আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সব দেশের কমেছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি যেটা কমেছে, সেটা কিন্তু চীন ও ভারতের তুলনায় অনেক কম। এর পরও চীন আমাদের পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে গেছে। এর কারণ, চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ধরে রাখতে আগ্রাসী মার্কেটিং করছে। অর্থাৎ তারা কম দামে পোশাক রপ্তানি করে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করছে।”
তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের কারণে সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সমস্যার মুখে পড়েছে। একেক সময় একের হারে শুল্ক আরোপ করায় সব হিসাবনিকাশ পাল্টে গেছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের এই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “যদিও আট মাসের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার হার বৈশ্বিক আমদানি কমার তুলনায় কম। তবে সবশেষ অগাস্ট মাসে কমেছে কিন্তু অনেক; ১৬ শতাংশের মত। এটাই আমাদের জন্য উদ্বেগের। গ্যাস-বিদুৎ সমস্যার সমাধান না হলে আগামীতেও কিন্তু এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে।”
বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে নতুন কৌশল, মূল্য প্রতিযোগিতা ও ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
পূর্বকোণ/মিফতা



















