চট্টগ্রাম সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরে

চুক্তি দর সমন্বয়ের দাবি বার্থ অপারেটরদের, অফডক সেবায় ৯.৮৫% বাড়তি চার্জ

সারোয়ার আহমদ

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৯:২২ অপরাহ্ণ

জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার বার্থ অপারেটিং কার্যক্রমে ব্যয় বেড়ে আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বার্থ অপারেটররা। এ অবস্থায় বর্তমান বর্ধিত জ্বালানি তেলের মূল্যের সঙ্গে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের চুক্তি দর সমন্বয় করে দর বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস এন্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স এসোসিয়েশন।

অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের দাম সর্বশেষ বাড়ানোর পর বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা অফডকের কয়েকটি সেবার চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটস এসোসিয়েশন (বিকডা)।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া এক চিঠিতে চুক্তি দর সমন্বয়ের দাবি জানান বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস এন্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী।

চিঠিতে বলা হয়, ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার বার্থ অপারেটিংয়ের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। সে সময় জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য দ্রব্যের বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে ব্যয় হিসাব করে বার্থ অপারেটররা দরপত্র দাখিল করেন।

কিন্তু দরপত্র দাখিলের পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। ২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা বাড়ানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চুক্তি দরের সঙ্গে বর্ধিত জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হলেও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে চিঠিতে দাবি করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ডিজেলের দাম আরও লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। এতে দরপত্র দাখিলের সময়ের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি মোট ৪৯ টাকা বেড়ে যায়। সর্বশেষ আজ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে ডিজেলের দাম আরও ২০ টাকা বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা করা হয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি দরপত্র দাখিলের সময় ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৮০ টাকা। সে হিসাবে বর্তমানে দাম বেড়েছে লিটারপ্রতি ৫৫ টাকা, যা প্রায় ৬৯ শতাংশ। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কার্যক্রম পরিবহননির্ভর হওয়ায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বার্থ অপারেটিং খাতে। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামলে সদস্য বার্থ অপারেটরদের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় দেশের অন্যান্য খাতে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে দাবি করে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বিদ্যমান চুক্তি দরের সঙ্গে বর্তমান বর্ধিত জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করে দর বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি।

 

‘বর্ধিত ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন’

এ প্রসঙ্গে বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস এন্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী পূর্বকোণ অনলাইনকে বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক ব্যয় বাড়ার কারণে এমনিতেই বার্থ অপারেটরদের কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিবছর শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে। উৎসব ভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। এর ওপর জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়ছে। কিন্তু বার্থ অপারেটরদের আয় তো প্রতিবছর সে অনুপাতে বাড়ছে না। তাহলে এই বর্ধিত ব্যয়ের চাপ কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে?’ 

তিনি বলেন, ‘বার্থ অপারেটরদের ওপর এই চাপ যদি বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌক্তিকভাবে বিবেচনা না করে, তাহলে বন্দরের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে যাবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে যৌক্তিক হারে চুক্তি দর সমন্বয় করতে হবে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থেই বন্দর কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

 

অফডক সেবায় বেড়েছে ৯.৮৫ শতাংশ চার্জ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা অফডকগুলোর সেবাতেও। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা হওয়ায় ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সেবার চার্জ ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডা।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জারি করা এক সার্কুলারে বিকডা জানায়, ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ায় বেসরকারি অফডকগুলোর বিভিন্ন কার্যক্রমে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ পর্যালোচিত হারের ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে জ্বালানি সারচার্জ যুক্ত করা হবে। নতুন এই হার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।

বিকডার সার্কুলার অনুযায়ী, ডিজেলচালিত যেসব সেবায় এই বাড়তি চার্জ প্রযোজ্য হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—চট্টগ্রাম বন্দর ও অফডকের মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন বা হলেজ, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও অফডকের মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন বা হলেজ এবং খালি কনটেইনারের লিফট-অন/লিফট-অফ চার্জ।

এ ছাড়া রপ্তানি পণ্য স্টাফিং ও হ্যান্ডলিং প্যাকেজ চার্জের ক্ষেত্রেও বাড়তি চার্জ প্রযোজ্য হবে। এই প্যাকেজের আওতায় খালি কনটেইনার ইয়ার্ডে নেওয়া, সেখান থেকে সিএফএস শেডে পরিবহন, কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য স্টাফিং, স্টাফিং শেষে লোড ইয়ার্ডে নেওয়া এবং পরবর্তী পরিবহন ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রম রয়েছে।

রপ্তানি করা কনটেইনারের ভিজিএম চার্জেও বাড়তি অর্থ গুনতে হবে। এর মধ্যে লোড ইয়ার্ড থেকে ওজন মাপার স্থানে কনটেইনার নেওয়া, ওজন করা, পুনরায় লোড ইয়ার্ডে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট লিফট-অন/লিফট-অফ কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত।

এ ছাড়া আমদানি পণ্য ডেলিভারি প্যাকেজ চার্জও বাড়বে। এর আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর বা পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল থেকে অফডকে আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার পরিবহন, অফডকে কনটেইনার লিফট-অন/লিফট-অফ, ইমপোর্ট ডেলিভারি ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখা এবং শ্রমিকের মাধ্যমে কনটেইনার থেকে ট্রাকে পণ্য খালাসের কার্যক্রম রয়েছে।

 

‘ডিজেলচালিত সেবার ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে’

এ প্রসঙ্গে বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার পূর্বকোণ অনলাইনকে বলেন, ‘অফডকে নানা ধরনের কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ কাজেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ডিজেল ব্যবহার হয়। তাই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অফডকগুলোর ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। বর্ধিত ডিজেলের দামের সঙ্গে এই ব্যয় সমন্বয় করা ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই। এ কারণে ডিজেলচালিত সেবাগুলোতেই কেবল বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে।’

 

দুই পর্যায়ে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ

চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক কনটেইনার পরিবহন ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়— বার্থ অপারেটিং ও বেসরকারি অফডক সেবা— জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে একই সময়ে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছে। বার্থ অপারেটররা যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি দর পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে, সেখানে অফডকগুলো নির্দিষ্ট সেবার ক্ষেত্রে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়তি চার্জ কার্যকর করেছে।

ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পরিবহন এবং আমদানি-রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে পড়তে শুরু করেছে। এতে বন্দরকেন্দ্রিক সেবার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা।

 

‘রপ্তানি খাত আরও চাপে পড়বে’

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী পূর্বকোণ অনলাইনকে বলেন, ‘দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প এমনিতেই চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক পোশাক কারখানা তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আমদানি-রপ্তানি-সংক্রান্ত ব্যয় আরও বেড়ে গেলে পোশাকশিল্প বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে ব্যয় বাড়তে থাকলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। অর্ডার প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প আরও সংকটে পড়বে।’

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট