চট্টগ্রাম সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

চসিকের সাবেক কাউন্সিলর সুমন ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের দুই মামলা

দিনমজুরকে ‘কোটিপতি ব্যবসায়ী’ বানিয়ে রেলওয়ের অর্থ লোপাট!

ইমাম হোসাইন রাজু

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ | ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

কাগজে-কলমে তিনি ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকার বার্ষিক লেনদেন করা ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ী। অথচ বাস্তবে তিনি একজন সাধারণ দিনমজুর। যিনি স্বাক্ষর করাতো দূরের কথা, তৃতীয় শ্রেণির বেশি পড়াশোনাই করেননি এবং কখনো চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়েও যাননি। এই প্রান্তিক নারী শ্রমিককে ‘কোটিপতি ব্যবসায়ী’ সাজিয়ে অভিনব কায়দায় বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ১ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ হিসাব শাখা, সিটি কর্পোরেশনের লাইসেন্স বিভাগ এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য ওঠে এসেছে। এ ঘটনায় দুদকের মামলা জালে ফেঁসে যাচ্ছেন তিন প্রতিষ্ঠানের ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী।
দুদক জানায়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কথিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে নথি তৈরি, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং রেলওয়ের অর্থ ছাড়ের ঘটনা ঘটে। পরে ওই হিসাবে জমা হওয়া অর্থের বড় অংশ বিভিন্ন শাখা থেকে নগদে উত্তোলন করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের কথিত মালিক কোহিনুর আক্তার ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে সরবরাহকারী শ্রেণিতে ট্রেড লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। আবেদনে তাঁর পরিচয়পত্রের অনুলিপি ও ছবি সংযুক্ত ছিল। অথচ দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আবেদনের সঙ্গে দেওয়া ছবির সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির মিল নেই। পরিচয়পত্রের প্রকৃত মালিক কোহিনুর আক্তার পেশায় একজন শ্রমিক। তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং স্বাক্ষর ছাড়া অন্য কিছু লিখতে পারেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়েও যাননি। পরিচয়পত্রে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্সের আবেদনের স্বাক্ষরেরও মিল পায়নি দুদক। এছাড়া সরেজমিনে গিয়ে ট্রেড লাইসেন্সে উল্লেখ করা ব্যবসার ঠিকানায় কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি সংস্থাটি।
দুদক জানায়, রেকর্ডপত্র সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপ-কর কর্মকর্তা মঞ্জুর উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই ভুয়া ব্যক্তিকে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেন। যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে, চসিক থেকে সংগ্রহ করা সেই ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ও জাল এনআইডি ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি-র আগ্রাবাদ শাখায় মেসার্স কসমোপলিটন কর্পোরেশন নামে একটি এসএনডি একাউন্ট খোলা হয় এবং একাউন্ট খোলার ফরমেই ব্যবসার বার্ষিক টার্নওভার দেখানো হয় ১ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। অথচ পরিচয়পত্রে সংশ্লিষ্ট নারীর পেশা ছিল শ্রমিক। তাঁর ছবির সঙ্গে পরিচয়পত্রের ছবির অমিল এবং স্বাক্ষরের অসংগতির বিষয়ও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অসংগতি থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া এবং অফিসার মো. পারভেজ কোনো ধরনের সন্দেহ বা নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই হিসাবটি খুলে দেন।
একই আইডি- পাসওয়ার্ডে ভুয়া বিল : দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কার্যালয়ের ডিএফএ/স্টোরস শাখার তিন অডিটর- পবন কুমার পালিত, মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে- একই আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ‘আইবাস++’ ব্যবস্থায় ভুয়া বিল ও টোকেন এন্ট্রি করেন। পরে ওই শাখার হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেনের আইডি ব্যবহার করে বিলটি অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিলগুলো বুকস এন্ড বাজেট শাখায় পাঠানো হয়। নথি অনুযায়ী, অস্থায়ী কর্মচারী মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ খানের মাধ্যমে বিলগুলো পাঠানো হয়েছিল। পরে অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান বিল গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষক সৈয়দ সাইফুর রহমানের কাছে পৌঁছে দেন।
দুদকের অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, বিলের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই না করে চেক ইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছেরও মূল ঠিকাদারের তথ্য যাচাই না করে বিল ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের ভিত্তিতে চেকে স্বাক্ষর করেন। পরে চেকটি নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অফিস সহায়কের মাধ্যমে কথিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এভাবে হিসাব বিভাগের একাধিক ধাপ অতিক্রম করে ভুয়া বিলের বিপরীতে সরকারি অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটে।
এক দিন পর ব্যাংকে জমা, কয়েক দফায় নগদ উত্তোলন : দুদকের নথি অনুযায়ী, রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার চেকটি ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইস্যু করা হয়। পরদিন, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি, মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশনের নামে সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় খোলা হিসাবে চেকটি জমা দেওয়া হয়। এরপর ২ জানুয়ারি ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ৮০ লাখ টাকা এবং ৮ জানুয়ারি একই শাখা থেকে আরও ৮ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। একই দিন ধানমন্ডির প্রিন্সিপাল শাখা থেকে আরও ৫ লাখ টাকা তোলার তথ্যও রয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে উত্তোলন করা হয় বলেও দুদকের অনুসন্ধানে ওঠে আসে। সব মিলিয়ে রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা কথিত ভুয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তুলে নেওয়া হয়।
ফেঁসে যাচ্ছেন ১৪ কর্মকর্তা কর্মচারী : এই অভিনব জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় রেলওয়ে, চসিক এবং সীমান্ত ব্যাংকের মোট ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা পেয়েছে দুদক। এ ঘটনায় আলোচ্য ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছে দুদক কমিশন। যেকোন মুহূর্তে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। অভিযুক্তরা হলেন- রেলওয়ের অস্থায়ী কর্মচারী মো. হাব্বিুল্লাহ খান, প্রাক্তন অডিটর পবন কুমার পালিত, জুনিয়র অডিটর মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে, হিসাব কর্মকর্তা মো. মামুন হোসেন, হিসাবরক্ষক সৈয়দ সাইফুর রহমান, হিসাব কর্মকর্তা মো. আবু নাছের, অফিস সহায়ক মো. মাকসুদুর রহমান, চসিকের লাইসেন্স পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপ-কর কর্মকর্তা এম মনজুর উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি-র অফিসার মো. পারভেজ, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া ও সাবেক ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-২ এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, অনুসন্ধানে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুয়া নথিপত্র তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলায় কমিশন মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছেন এবং শিগগিরই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট