মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলে বিপুল জনসংখ্যার চাপে সুপেয় পানির তীব্র সংকট সৃষ্টি হবে। ক্রমবর্ধমান জনঘনত্বের চাপে কৃষিজমি সংকটের মুখে পড়বে। এই সংকট মোকাবিলা করে পরিকল্পিত ও স্বনির্ভর মিরসরাই গড়তে প্রয়োজন ‘মিরসরাই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন। যার কাজ হবে- স্থানীয় লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। পাহাড়-নদী-সমুদ্র-ঝিরি-ঝর্ণা ঘেরা মিরসরাইয়ে ইকো ট্যুরিজমের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগানো। সর্বোপরি- আবাসন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখা।
‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই): চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনায় মিরসরাই নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এসব প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রামের সংসদীয় এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সমস্যা- সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় কী- সেসব তুলে এনে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে নতুন সরকারের কাছে প্রস্তাব আকারে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে দৈনিক পূর্বকোণ এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা- সরকার এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করলে প্রতিটি আসনের দৃশ্যমান উন্নতি হবে। সার্বিক ও ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন সাধিত হলে মিরসরাই স্বনির্ভর এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি নেতা ও নজরুল গবেষক ড. কামাল উদ্দিন বলেন, মিরসরাই কেবল একটি উপজেলা নয়, এটি ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। তবে এখানকার স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত নাজুক। ৫ লাখ মানুষের জন্য মাত্র একটি হাসপাতাল। যার অবস্থাও জরাজীর্ণ। অর্থনৈতিক অঞ্চল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে জনসংখ্যার চাপ বাড়বে। যা আমাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, আমরা একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিকল্পনা করছি। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ করে তোলার ওপর জোর দিচ্ছি। মিরসরাইয়ের উন্নয়নে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মিরসরাইকে একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।
বিগত দিনগুলোতে মিরসরাইয়ের উন্নয়নে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি অভিযোগ করে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াতের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফজলুল করিম বলেন, মিরসরাই কৃষি, মৎস্য এবং বনায়নের জন্য একটি অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কৃষি ও বনায়নে পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও মাদক নির্মূল এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণে জোরারগঞ্জ থানাকে একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় রূপান্তর করা জরুরি। শিক্ষা ক্ষেত্রেও আমাদের দৈন্যদশা প্রকট। কলেজগুলোকে পূর্ণাঙ্গ অনার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে দৈন্যদশার চিত্র উঠে আসে তাইফার প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষাবিদ কামরুল হাসান এফসিএ’র বক্তব্যেও। তিনি বলেন, প্রতি বছর ২৫ লাখ লোক শ্রমবাজারে এলেও উদ্যোক্তারা দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছেন না। স্কুলগুলোতে আইটি ল্যাব থাকলেও বছরের পর বছর তালাবদ্ধ থাকে। প্রাইমারি স্কুলগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। ভালো ভবন ও উচ্চ বেতনের শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবে ছাত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, আশার কথা হলো মিরসরাইয়ে প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজ এবং মহাজন কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর চট্টগ্রাম বোর্ডে ভালো ফলাফল করছে। তবে আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কারিগরি শিক্ষা। অর্থনৈতিক অঞ্চলে দক্ষ টেকনিক্যাল পোস্টগুলো যদি বিদেশিরা দখল করে নেয়, তবে এই শিল্পাঞ্চল আমাদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নয়া দালানের’ চেয়ারম্যান মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ইকোনমিক জোনকে কেন্দ্র করে ২০৪০ সাল নাগাদ মিরসরাইয়ের জনসংখ্যা ৪ লাখ ৭০ হাজার থেকে বেড়ে ৩০ লাখে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে, এই বিপুল জনসংখ্যার আবাসন, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা। বর্তমানে ভূগর্ভস্থ পানির যে স্তর আছে, তা দিয়ে এই বিশাল চাহিদা মেটানো অসম্ভব। কারণ শিল্পের জন্যই পানির বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান জনঘনত্বের চাপে কৃষিজমি ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিরসরাইয়ের জন্য একটি পৃথক ‘মিরসরাই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা সময়ের দাবি। যা মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করবে।
কৃষি অর্থায়ন পরামর্শক জোবাইদুল ইসলাম সবুজ বলেন, শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার ফলে সাভার-গাজীপুরের মতো মিরসরাইতেও মাদক, সন্ত্রাস এবং দূষণের চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে। উন্নত বিশ্বে শিল্পাঞ্চল পরিকল্পিত হয় বলে এসব সমস্যা কম হয়। মিরসরাই উপকূলে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের সুব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান। শিল্পায়নের ফলে যারা জমি হারিয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরি দিতে হবে। মিরসরাইয়ের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন। এখান থেকেই নতুন সরকারের কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হবে।
সাংস্কৃতিক কর্মী মহিবুল আরিফ বলেন, মিরসরাইয়ে চারটি আদিবাসী পাড়া রয়েছে। তাদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতি তুলে ধরতে পারলে পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। আমাদের কোনো আধুনিক গণগ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি নেই। শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব ভবন নেই। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র বা উন্নত প্রশিক্ষণের অভাবে প্রতিভা থাকার পরও অনেকে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।
তরুণ সংগঠক আসিফ ইকবাল মিরাজ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের ওপর কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। যার ফলে বেকারত্বের বোঝা বাড়ছে। আমাদের উচ্চশিক্ষিত তরুণরা মিরসরাইয়ের শিল্পায়নে অবদান রাখতে পারবে।
ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন অব মিরসরাই’র সভাপতি আবদুল্লাহ আল মুরাদ বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম ত্রুটি হলো অতিরিক্ত থিওরিটিক্যাল বা তাত্ত্বিক নির্ভরতা। প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক শিক্ষার অভাব রয়েছে। চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে মিরসরাইয়ের কৃষি ও মৎস্য খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হলে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ কিস্তিতে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তরুণ প্রজন্ম আগ্রহী হবে। এখানে একটি সরকারি ট্রেনিং সেন্টার থাকা প্রয়োজন। যেখানে বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
ব্যাংকার ও সংগঠক নাজিম উদ্দিন বলেন, বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘সক্ষম মিরসরাই’ গড়ে তোলা। যেখানে প্রতিটি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। বর্তমান যুগে মানুষ কেবল খেয়ে-পরে নয়, শান্তিতে ও নিরাপদে বাস করতে চায়। সেটি নিশ্চিত করা প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। আমাদের প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার মেধার ভিত্তিতে একটি সুস্থ ও অবাধ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং ত্রিপুরা আদিবাসীদের নিয়ে একটি সুন্দর ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিরসরাই গড়ে তোলা প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
ইকো ট্যুরিজম এক্টিভিস্ট সংগঠন সোনালী স্বপ্নের প্রতিষ্ঠাতা মঈনুল হোসেন টিপু বলেন, মিরসরাই বাংলাদেশের একমাত্র উপজেলা যেখানে পাহাড়, সাগর, নদী, হ্রদ এবং ঝর্ণার অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। যা পর্যটন খাতের জন্য এক বিশাল সম্পদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই খাতকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের পরিবর্তে কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা বা সেবার মান নিশ্চিত করা হয়নি।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে অন্তত ৪০ জন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন। পর্যটকদের জন্য মানসম্মত হোটেল বা খাবার হোটেল নেই। ইজারা প্রথা বাতিল করে ‘কমিউনিটি বেজড ইকো-ট্যুরিজম’ চালু করা দরকার। অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ২৫ বর্গকিলোমিটারের ম্যানগ্রোভ বন হুমকির মুখে। প্রায় ১০ হাজার হরিণের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। মিরসরাইকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে ঝর্ণা, মহামায়া লেক এবং ফেনী নদীর রিভার ট্যুরিজমকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
পূর্বকোণ/আরআর
















