চট্টগ্রাম সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

কবি সাহিত্যিক ও সুফি সাধক শাহ্ আলী রজা প্রকাশ কানু শাহ (রা.)

নিজস্ব সংবাদদাতা

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ২:৩৯ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামকে বলা হয় বার আউলিয়ার পূণ্যভূমি। এই চট্টগ্রামে মহান আল্লাহতালার বাণী নিয়ে যুগে যুগে ধর্ম প্রচারক সুফি, সাধক, দরবেশ ও ওলিগণ আগমন করেন। তাতে দ্বীনের খেদমত ও ইসলামী তৎপরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। চট্টগ্রামে বনে-জঙ্গলে, পাহাড়-পর্বতে, নদী-সমুদ্রে অসংখ্য পীর আউলিয়া ও সূফী দরবেশ বিস্তৃত আছেন। তাদের মধ্যে এমন একজন কবি সাহিত্যিক ও সুফি সাধক শাহ্ধসঢ়;‌ আলী রজা প্রকাশ কানু শাহ (রা.)।

 

তিনি ১৭৫৯ ইংরেজি মোতাবেক ১৭ শ্রাবণ ১১৬৫ বাংলা ১০ রবিউস সানি ১১৫৯ হিজরি সোমবার সুবেহ্ধসঢ়;‌ সাদেকের সময় তশরিফ আনেন। এই মনীষী ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বক্কর ছিদ্দিক (রা.) এর বংশধর। শিশু হযরত আলী রজা (রা.) পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে তৎকালীন ধর্মীয় প্রথানুসারে তাঁর পিতা-মাতার সান্নিধ্যে থেকে ৭ বছর বয়সে নামাজ রোজা কুরআন শিক্ষা মাছায়েলের কিতাবাদি প্রাথমিক শিক্ষাসহ প্রকৃতির জ্ঞান অর্জন করেন।

 

শৈশব থেকেই তাঁর জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক আচরণ পরিলক্ষিত ছিল। হঠাৎ তাঁর পিতা মো. সাছির (রা.) ইন্তেকালে মায়ের উপর তার সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পিত হলে তিনি বালক হযরত আলী রজার লেখাপড়ার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

 

এদিকে, হযরত আমানত আল আরবি এর শিষ্য হযরত শাহসুফি কেয়ামুদ্দীন আউলিয়াকে (রা.) খেলাফত প্রদানপূর্বক বলেছিলেন যে, তোমার কাজ আমার মুর্শীদের কাছে দেওয়া ওয়াদা রক্ষা করা। তাই অতি শীঘ্রই তোমাকে খেলাফতের দায়িত্ব প্রদান করছি। পূর্ববঙ্গের চাঁনখালী নদীর পশ্চিমপাশে (গন্তব্য জোয়ার) ওষখাইন গ্রামে হযরত ছিদ্দিকে আকবরের আওলাদ নবীজির চেরাগ হযরত শাহ্ধসঢ়;‌ আলী রজা কানু শাহ্ধসঢ়;‌ (রা.) হাতে আমার মুর্শীদের দেওয়া আমানত পৌঁছায়ে দেবে। তিনি মোরশেদের দেওয়া আমানত নিয়ে চাঁনখালীর পশ্চিমপাশে এসে  পরৈকোড়া বাজারে বালক হযরত আলী রজা (রহ.)’র দেখা হয়। আলাপ চারিতায় ওষখাইন গ্রামে এসে মা পরান (রা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করে বালক হযরত আলী রজার (রা.) লেখা পড়ার দায়িত্বভার হাতে তুলে নেন। মা পরান (রা.) বালক হযরত আলী রজার দায়িত্বভার শাহ কেয়ামুদ্দীন আউলিয়া (রা.) হাতে তুলে দিতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। অবশেষে বালক হযরত আলী রজাকে (রা.) নিজ সংস্পর্শে রেখে ১৩ বছর বয়সে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ছবক দান করেন।

 

সাহিত্য-জীবন : নেপালের রাজ দরবার থেকে সংগৃহীত ও বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যের ধর্মীয় সাধন সঙ্গীত তথা চর্যাপদ থেকে বাংলা সাহিত্যের সূত্রপাত হলেও আমরা মুসলিম সাহিত্যিকের কাব্য পাই ১৬ শতাব্দীতে। কবি শাহ্ধসঢ়;‌ মোহাম্মদ সগীর প্রথম মুসলিম কবি হিসাবে কাব্য রচনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় আঠারো শতকে আধ্যত্মিক সাধক, পীর ও প-িত কবি হযরতুল আল্লামা আলী রজা (রা.) এর কাব্য কীর্তির পরিচয় পাই। সাধন মার্গে তিনি বৈষ্ণব, তন্ত্র, যোগ ও সুফি সাধনার আশ্চর্য সমন্বয় করেন। তাঁর রচনায় একদিকে ইসলামী সূফি তত্ত্ব ও অন্যদিকে হিন্দু যোগতন্ত্রের সমন্বয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অষ্টাদশ শতকে জন্ম নিয়েও তিনি অসাম্প্রদায়িক ও উদারনীতির কবি ছিলেন। তিনি আরবি, ফার্সী, বাংলা, দেবনগরী ও সংস্কৃতি ভাষায় বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন।

 

আধ্যাত্মিক কবি হযরতুল আল্লামা শাহ্ধসঢ়;‌ সুফি আলী রজা (রা.) যে সমস্ত গ্রন্থ রচনা করেন তা হল : (১) গোপ্ত তত্ত্বের আগম, (২) শাস্ত্রীয় আগম, (৩) দেহ বিচার আগম, (৪) জ্ঞান সাগর, (৫) সিরাজ কুলুব, (৬) ধ্যান মালা, (৭) শাহ্ধসঢ়;‌ নামা (৮) সৃষ্টি পত্তন, (৯) যোগ কালন্দর (১০) ষঠচক্র ভেদ, (১১) ইসলাম নামা, (১২) খাবনামা, (১৩) রাগ তাল নামা, (১৪) রফিকুচ্ছালেকীন, (১৫) রাহাতুর রুহ, (১৬) তারিফে রাসূল (দ.), (১৭) অমর সিং।

 

উপরোক্ত গ্রন্থগুলো বিশ্লেষণ করলে এতে কয়েক শ্রেণির কাব্য পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন- (১) প্রণয়োপখ্যান, (২) মুসলিম ধর্ম সাহিত্য, (৩) মুসলিম বৈষ্ণব পদাবলী, (৪) শাক্ত পদাবলী, (৫) সুফি সাহিত্য, (৬) সাওয়াল সাহিত্য, (৭) রাগতালনামা, (৮) তাল মালা, (৯) রাগ মালা, (১০) কবিরাজী চিকিৎসা শাস্ত্র, (১১) জ্যোতিষ শাস্ত্র, (১২) ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক মসায়েলা। এছাড়াও তিনি সাত শতাধিক ভাবমূলক, ভক্তিমূলক, বন্দনামূলক ও তত্ত্বমূলক মারফতী গান রচনা করেন।

 

উপরোক্ত গ্রন্থ ছাড়াও হযরতুল আল্লামা আলী রজা (রা.) এর স্বরচিত বিভিন্ন ধরনের দাওয়াত, দরুদ, কেয়াম মিলাদ, জিকির ছাড়াও ঈদুল আজহার খুৎবা, সুরা ফাতেহার তাফছীর, বিভিন্ন হাদিছসহ মুরিদ ও তলকীন করার নিয়ম বিষয়ক অনেক কিতাব রজায়ী বিশ্ব নূর মঞ্জিলে পীরজাদা আলহাজ মোহাম্মদ খোরশেদুল্লাহ (প্রকাশ) রজায়ী হুজুরের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে।

 

অষ্টাদশ শতকের অন্যতম কবি, আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধক হযরতুল আল্লামা শাহ্;‌ ছুফি আলী রজা (প্রকাশ কানু শাহ্) (রা.) এর স্বরচিত গ্রন্থ ও কিতাবসমূহ বর্তমানে তাঁর বংশধরদের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে। বাংলা একাডেমি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কবির রচিত তিনটি গ্রন্থ ও কয়েকটি মুসলিম বৈষ্ণব পদাবলী প্রকাশ করেন।

 

হযরত শাহ্;‌ কেয়ামুদ্দিন আউলিয়া (রা.) নিজেই হযরত শাহ আলী রজাকে (রা.) পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বেলায়তের শক্তি এলমে তাসাউফ এবং তত্ত্বজ্ঞানের গভীরতা দেখে ত্বরিকায়ে চিশতীয়া ও তরিকায়ে মোজাদ্দেদীয়া ছিলছিলার খেলাফত প্রদান করেন। যা তাঁর দাদা পীর হযরত সৈয়দ আমানত আল-নয়ামী আল আরবি কর্তৃক গুরু শাহ্ কেয়ামুদ্দীন আউলিয়াকে দেওয়া হয়েছিল।

 

উল্লেখ্য, তার গুরু শাহ কেয়ামুদ্দিন আউলিয়া (রা.) তাকে কানু নামে ডাকতেন। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রা.) এর অধস্তন আউলাদ মজজুবে ছালেকীন শামসুল বেলায়তে মারফতে রহুল আশেকান হযরত পেশ ওয়ায়ে ছারেকান সৈয়দ জিয়াউদ্দিন আহমদ (রা.) এর নিকট হতে কাদেরীয়া নক্ধসঢ়;‌শবন্দীয়া ও ছরওয়ারদীয়া ত্বরিকার খেলাফত লাভ করেন। হযরত শাহ আলী রজা (রা.) দীর্ঘকাল আপন মুর্শীদের খেদমতে শরীয়ত ত্বরিকত হাকিকত ও মারেফতের প্রতিস্তর অতিক্রম করে বেলায়তের উচ্চ আসন লাভ করেন।

 

তিনি অত্যন্ত কঠিন মেহনত ও ৩৬ বছর অরণ্য এবং খানকায় বেয়াজতের পর তার মুর্শিদ আধ্যাত্মিক মসনদের সিংহাসনে আসিন করেন এবং বেলায়তে সম্রাট খ্যাতিতে ভূষিত করে খেলাফতের সম্মানী বেলায়তের তাজ (মুকুট) তাঁর ছের মোবারকে পরিয়ে দেন। হযরত শাহ্ আলী রজা কানু শাহ্ (রা.) এর সর্ব শ্রেষ্ঠ অবদান ও কারামত তার নির্দেশিত বিষু মোবারক প্রতিবছর আষাঢ়ের শেষ ও পৌষের শেষ তিন দিন বিষু মোবারক পালিত হয়। ইহা কেবলমাত্র বাবাজান কেবলার ত্বরিকত-পন্থীদের জন্য প্রযোজ্য বিধায় সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তথাপি বিষুর তাৎপর্য সম্পর্কে তার রচিত আধ্যাত্মিক গ্রন্থ জ্ঞান সাগর নামক গ্রন্থে পাওয়া যায়- বিষু ঋতু ভাগ্যের মর্ম, যে সকলে জানে জিয়ন মরণ পন্থ শুদ্ধ মতে চিনে।

 

তার অসংখ্য কারামত জনশ্রুতি আছে। তারই ধারাবাহিকতায় পৌষের শেষ তিন দিন প্রতি বছর ওরশ শরীফ দিনটি উপলক্ষে পুরো এলাকাকে বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য ভক্ত-অনুরক্ত আগমন ঘটে আনোয়ারা ওষখাইন গ্রামে ওষখাইন আলী নগর দরবার শরীফে।

 

বাবাজান কেবলা হযরত শাহ আলী রজা (রা.) ১১৯৯ মঘীর ৫ মাঘ, ১৯ শাওয়াল মোতাবেক ১৮৩৭ ইংরেজি রোজ বুধবার ৭৮ বছর বয়সে নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন।

লেখক : নিজস্ব সংবাদদাতা, আনোয়ারা।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট