ক্রিকেট আমার কাছে কখনো শুধু একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের নেশা, এক মানসিক জগৎ। কৈশোর থেকেই ক্রিকেটের ইতিহাস, পরিসংখ্যান, কিংবদন্তি এবং খেলার নন্দনতত্ত্ব আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছে। সেই ভালোবাসার ধারাবাহিকতায় জীবনের একটি সময় বাংলাদেশ বেতারে (রেডিও বাংলাদেশ) ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করারও সৌভাগ্য হয়। তাই ক্রিকেটের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার স্যার গারফিল্ড ‘গ্যারি’ সোবার্সের সঙ্গে কয়েক বছর আগে শ্রীলঙ্কার কলম্বোর একটি হোটেলের লবিতে আকস্মিক সাক্ষাৎ আমার কাছে শুধু একটি স্মৃতি নয়-এটি ছিল এক স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত।
আজ, ৮৯ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণের সংবাদ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রিকেট বিশ্ব শোকাহত। সংবাদটি শুনেই সেই দিনের কথা বারবার মনে পড়ছে। বুঝতে পারছি, ইতিহাসের এক জীবন্ত মহাকাব্যের সামনে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
লবিতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ। কোথাও কোনো তারকাসুলভ দূরত্ব নেই, নেই আত্মম্ভরিতা। আন্তরিক হাসি, উষ্ণ করমর্দন আর অল্প সময়ের সৌজন্যমূলক আলাপেই উপলব্ধি করেছিলাম-প্রকৃত মহত্ত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয় বিনয়।
১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই বার্বাডোজে জন্ম নেওয়া সোবার্স মাত্র ১৭ বছর বয়সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক করেন। শুরুতে তিনি বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে দলে এলেও অচিরেই ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ অলরাউন্ডারে পরিণত হন। বাঁহাতি ব্যাটিংয়ের অনন্য সৌন্দর্যের পাশাপাশি তিনি সমান দক্ষতায় বাঁহাতি ফাস্ট-মিডিয়াম, অর্থোডক্স স্পিন এবং রিস্ট স্পিন করতে পারতেন। এমন বহুমাত্রিক ক্রিকেট প্রতিভা পৃথিবী খুব কমই দেখেছে।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ৩৬৫ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের বিশ্বরেকর্ড গড়েন, যা টিকে ছিল ৩৬ বছর। ৯৩টি টেস্টে ৮,০৩২ রান, ২৬টি শতক, ২৩৫টি উইকেট এবং ১০৯টি ক্যাচ-এই পরিসংখ্যানই তাঁকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। তবু পরিসংখ্যানের বাইরেও তিনি ছিলেন ক্রিকেটীয় সৌন্দর্যের প্রতীক।
১৯৬৮ সালে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে এক ওভারে টানা ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি নাইট উপাধিতে ভূষিত হন। পরবর্তীকালে আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি’ তাঁর নামেই উৎসর্গ করা হয়-যা বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর অসামান্য অবদানের স্থায়ী স্বীকৃতি।
একজন ক্রিকেটপ্রেমী এবং সাবেক বেতার ধারাভাষ্যকার হিসেবে আমি বহু কিংবদন্তির খেলা নিয়ে কথা বলেছি। কিন্তু গ্যারি সোবার্স ছিলেন এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তিনি শুধু একজন ক্রিকেটার নন; তিনি ক্রিকেটের এক পূর্ণাঙ্গ দর্শন। তাঁর ব্যাটে ছিল শিল্প, বোলিংয়ে ছিল বিস্ময়, নেতৃত্বে ছিল প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিত্বে ছিল বিরল মানবিকতা।
আজ তাঁর প্রয়াণে ক্রিকেটের একটি স্বর্ণযুগের শেষ জীবন্ত সেতুটিও যেন ভেঙে গেল। তবে কিংবদন্তিরা কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন স্মৃতিতে, অনুপ্রেরণায় এবং ইতিহাসের পাতায়। কলম্বোর সেই হোটেল লবিতে কয়েক মিনিটের সাক্ষাৎ আজ আমার কাছে অমূল্য সম্পদ। সেদিন আমি শুধু একজন মহান ক্রিকেটারকে দেখিনি; দেখেছিলাম একজন মহান মানুষকে। স্যার গ্যারি সোবার্স চলে গেছেন, কিন্তু ক্রিকেটের আকাশে তাঁর দীপ্তি কোনো দিন ম্লান হবে না।
লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সাবেক ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার















