বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিভিন্ন অশুল্ক বাধা দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স হলে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ এই অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক প্রক্রিয়া সহজীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতি হ্রাস, আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং পণ্যের গুণগত মানোন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। খাদ্যপণ্য আমদানিতে তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষার মতো কিছু বিধিনিষেধ পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করা গেলে পণ্য খালাস দ্রুত হবে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
জ্বালানি খাতে সহযোগিতার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া পারমাণবিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মডুলার পারমাণবিক চুল্লির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিপণ্য, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং বিমান পরিবহনসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বাণিজ্য সম্প্রসারণেও যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী।
রাষ্ট্রদূত চট্টগ্রাম চেম্বারসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর, মাতারবাড়ী ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, বে-টার্মিনাল এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আধুনিক এভিয়েশন লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করা গেলে চট্টগ্রাম এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ব্যয়ের বড় অংশ চলে যায় লজিস্টিকস খাতে। এ খাতে ব্যয় মোট খরচের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। লজিস্টিকস ব্যয় ৬-৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হলে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা জোরদার হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের মাল্টিমোডাল লজিস্টিকস খাতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
চেম্বার সভাপতি আরও বলেন, চট্টগ্রামে তিনটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা এবং একটি বৃহৎ বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। এসব অঞ্চলে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা উন্নয়নে সহযোগিতা দেওয়া হলে দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি খাত উপকৃত হবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনেও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতি মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ওষুধশিল্প এবং উচ্চপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্যিক কাউন্সেলর পল ফ্রস্ট, শ্রমবিষয়ক অ্যাটাশে লীনা খান, অর্থনৈতিক কর্মকর্তা জন ব্রান্সডেল, নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অ্যারিক ওয়েলস এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ আসিফ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী আলী আহমেদ, এম এ সালাম, সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, এস এম আবু তৈয়ব, ডা. মইনুল ইসলাম মাহমুদ, রাহবার এ আনোয়ার, রকিবুর রহমান টুটুল, বর্তমান পরিচালক আকতার পারভেজ, বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরআলী হোসেন এবং সাইনশাইন গ্রামার স্কুলের অধ্যক্ষ সাফিয়া রহমান গাজী বক্তব্য দেন।
সভায় চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক ও পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক, চেম্বারের বর্তমান সহসভাপতি মোহাম্মদ মসিউল আলম স্বপন এবং পরিচালকবৃন্দসহ মার্কিন দূতাবাসের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


















