চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

একজন কাঙ্গাল হরিনাথ ও রাষ্ট্রের দায়

রাজীব রাহুল

৩ মে, ২০২৪ | ৯:০৪ অপরাহ্ণ

‘মিলন হবে কত দিনে কিংবা ধন্য ধন্য বলি তারে’ উপমহাদেশের খ্যাতিমান বাউল শিল্পী ফকির লালন শাহের এই গানের কথাগুলো শুনেনি এমন বাঙালি নিতান্তই কম। সেই লালনের গান যিনি সর্বপ্রথম ১২৯২ বঙ্গাব্দে জঙ্গল থেকে এনে বই আকারে লোক সমাজে প্রকাশ করেছিলেন তিনিই এই বাংলার সাংবাদিকতার অগ্রদূত কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার। শুধু লালন কেন, শিষ্য মীর মোশারফ হোসেনের ‘বিষাদ সিন্ধু’র প্রকাশকও ছিলেন তিনি। এই বাংলার শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে যার অবদান অনস্বীকার্য। গত বছর মার্চের শুরুতেই সেই মহান পুরুষের জন্মভূমি কুষ্টিয়ায় শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম প্রেস ইনস্টিটিউড বাংলাদেশের (পিআইবি) স্মাতকোত্তর ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা।

 

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার গড়াই নদীর তীরবর্তী কুণ্ডুপাড়ায় কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের বসতবাড়ি। জেলাশহর থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার। বসতবাড়ির কাঙ্গাল কুঠিরে গিয়ে দেখা মিলে কাঙাল হরিনাথের চতুর্থ প্রজন্ম অশোক মজুমদারের স্ত্রী গীতা রাণী মজুমদারের। তিনি আমাদের দেখান ১২৮০ বঙ্গাব্দে কাঙ্গল হরিনাথ মজুমদারের প্রতিষ্ঠা করা বাংলার প্রথম ছাপাখানা মুথুরানাথ (এম. এন) প্রেস। প্রেস প্রতিষ্ঠার পরপর ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা কলকাতা থেকে প্রকাশ বাদ দিয়ে নিজের প্রেস প্রকাশ শুরু করেন তিনি। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২২ বছর ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা প্রকাশিত হয়।

 

সেই পত্রিকায় ১২৮৫ বঙ্গাব্দের ২২শে চৈত্র কুমারখালীর শিলাইদহ এস্টেটের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রজা নিপীড়ণের সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন। যার কারণে হরিনাথকে শায়েস্তা করতে বাড়িতে লাঠিয়াল বাহিনী পাঠিয়েছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরে খবর পেয়ে শিষ্যদের নিয়ে হরিনাথকে রক্ষা করতে ছুটে আসেন বাউল লালন শাহ। পত্রিকাটি প্রথম দিকে মাসিক প্রকাশিত হলেও ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে পাক্ষিক ও তারও সাত বছর পর সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিরাজগঞ্জের প্রজা বিদ্রোহে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা প্রজাদের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এসময় হরিনাথের বিরুদ্ধে মামলা হলে প্রজারা তার পাশে দাঁড়ায়। একবার পাবনার মি.হামফ্রি নামের এক ম্যাজিস্ট্রেট গ্রাম পরিদর্শনে এসে এক বিধবার দুধ দেয়া গাভী নিয়ে গেলে হরিনাথ ‘গরু চোর ম্যাজিস্ট্রেট’ নামে সংবাদ প্রকাশ করেন। পরে সেই ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ দিয়ে হরিনাথকে শাস্তি দেয়ার চেষ্ঠা করেও ব্যর্থ হন। এক্ষেত্রে হরিনাথের সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে গেল যেটা হলো ‘নির্ভিক সাংবাদিকতার কোন বন্ধু নেই’।

 

হরিনাথ মজুমদারের ছাপাযন্ত্রটি কাঙাল কুঠিরের জীর্ন র্শীন ঘরে পড়ে রয়েছে অযত্নে অবহেলায়। লন্ডনের ডিক্সন এন্ড কোম্পানি এর নির্মাতা। যার মডেল নাম্বার কলম্বিয়া ১৭০৬। ১৮৬৭ সালে এটি তৈরি করা হয়। যার ওজন ৩০ থেকে ৩৫ মন। একসময় তিন থেকে চারজন লোক প্রতিদিন ডাবল ক্রাউন সাইজের এই মেশিনে ছাপা কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ২২ থেকে বছর আগে এই মেশিনে ছাপাকাজ বন্ধ হয়ে যায়। মরিচা পড়া এই ছাপাযন্ত্রটি ইতিহাসের সাক্ষী হলেও ২০১৭ সালের সরকারের নির্মিত কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়নি। ১৯৮৪ সালের পর থেকে যন্ত্রটিতে ছাপা বন্ধ রয়েছে। পরিবারের কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে জাদুঘরের কর্মকর্তা মতের অমিল হওয়ায় প্রাচীন মুদ্রণ যন্ত্রটি কাঙ্গাল কুঠিরে পড়ে আছে বলে জানান গীতা রানী মজুমদার।

 

কাঙ্গাল কুঠির থেকে পায়ে হেঁটে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে হরিনাথ সড়কে ছুটে গেলাম ১৬০ বছর আগে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কুমারখালীতে মেয়েদের জন্য হরিনাথের প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় কুমারখালী বালিকা বিদ্যালয় (কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়) দেখতে। স্বয়ং ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর সে সময় স্কুলটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই সময়ে সমাজে মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা চারটি খানি কথা নয় কারণ সময়টা ছিল নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্মের ১৭ বছর আগে। প্রথমে টিন ও ছনের ছাউনি দিয়ে স্কুলের কার্যক্রম শুরু হলেও পরে সরকারি অনুদান পায় স্কুলটি।

 

স্কুলে চোখ ধাঁধানো সবুজ মাঠে কিছুক্ষণ হেঁটে একটি ভ্যানে করে আধা কিলোমিটার দূরত্বে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশ করি। ততক্ষণে আমার সহপাঠীরা জাদুঘরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ছবি তুলছে। নতুন প্রজন্মের কাছে কাঙাল হরিনাথের স্মৃতিকে তুলে ধরতে ২০১৭ সালে ডিসেম্বরে ২৮ শতক জমির ওপর সরকারের এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসনীয়। জন প্রতি ২০ টাকা করে প্রবেশ মূল্য দিয়ে জাদুঘরটি ঘুরে দেখলাম আমরা।

 

জাদুঘরটির ব্যবস্থাপক এহসানুল হক জানান, হরিনাথের ১৬৮টি স্মৃতিনিদর্শনের সম্ভার নিয়ে জাদুঘরটির পথচলা শুরু হয়। এখানে স্বল্প পরিসরে এ কমপ্লেক্সের নিচতলায় একটি আধুনিক সেমিনার কক্ষ। তার পাশে লাইব্রেরিতে আছে প্রায় ৬ শতাধিক বইয়ের সমাহার। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখা মিলবে কাঙ্গাল হরিনাথের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন জিনিসপত্র, প্রেসের বিভিন্ন রেপ্লিকা, অক্ষর, কালির নিদর্শন। নয়রাভিরাম এ স্থানে হরিনাথের গান বাজছে।

 

জাদুঘরে এসে দেখলাম কাঙ্গাল কুটিরে পড়ে থাকা ছাপাযন্ত্রটির আদলে মডেল তৈরি করে ডিসপ্লে করা হয়েছে। যদিও এটা নকল। কিছু যন্ত্রাংশ, বাংলা টাইপ অক্ষর, ছবি ও কিছু পাণ্ডুলিপি কালের সাক্ষী জাদুঘরে রাখা হয়েছে। দুইতলা ভবনে ছোট- বড় ১৫টি কক্ষ। সামনে রয়েছে শান বাঁধানো মুক্তমঞ্চ, সেখানে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ভাস্কর্য শোভা বৃদ্ধি করেছে। জাদুঘরে বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি। শুক্রবার বেলা সাড়ে তিনটা থেকে শুরু। অন্যদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় বলে জানান জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা সৌরভ নামের এক কর্মী।

 

জাদুঘর ঘুরে এক রকম ঘোরের মধ্যে ছিলাম। মনে হচ্ছেছিল মৃত্যুর ১২৬ পরও কাঙ্গাল হরিনাথ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ৬৩ বছর আয়ুকাল নিয়ে এতো প্রতিবন্ধকতার শর্তে একজন মানুষ কিভাবে সোনার মানুষ হয়ে উঠলো জানতে পারলাম। ছোটবেলায় জন্মের এক বছর পর মা ও ছয় বছর বয়সে পিতাকে হারায় হরিনাথ। সাত বছর বয়সে বিদ্যাশিক্ষার জন্য গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। তার তিন বছর পর অন্যের সহযোগিতায় কুমারখালী কৃষ্ণধন মজুমদারের ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হলেও আর্থিক দৈন্যতায় বিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে না পারায় শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় তার প্রবল আগ্রহ ছিল। যার কারণে তখনকার সময়ে অজপাড়া গাঁ কুমারখালীতে সাংবাদিকতা, শিক্ষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথ। কিন্তু উপার্জনের নির্দিষ্ট উৎস না থাকায় গ্রামবার্ত্তা পত্রিকা প্রকাশ করতে ঋণগ্রস্ত হয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘কাঙ্গাল’ হয়ে পড়েন হরিনাথ মজুমদার। হরিনাথ বারো খন্ডে প্রায় ১ হাজার বাউল গান ও ৩টি উপন্যাসসহ নিজের লেখা ৪২টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে রচনা করা ‘বিজয় বসস্ত’ তার লেখা প্রথম উপন্যাস। যেটি কলকতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম কোন বাঙালির লেখা উপন্যাস পাঠ্য তালিকায় স্থান পায়।

 

কুমারীখালী শিক্ষাসফরে যাওয়া আমার জীবনের স্মরনীয় ঘটনা। তবে একটি প্রশ্ন নিজেকে খুব পীড়া দিয়েছে সেটা হচ্ছে ক্ষণজন্মা এই মহান মানুষটির শিক্ষা, সাহিত্য, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতায় এবং সমাজ সংস্কারে এতো অবদান থাকার পরও কেন রাষ্ট্রীয় কোন মরোনোত্তর পদকে তাকে ভূষিত করেনি সরকার। বাঙালি হিসেবে আমাদের এই মানসিক দৈন্যতার দায় গুছাবে কে? অথচ কাঙ্গাল হরিনাথের চেয়ে কম প্রতিভাবানরাও একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক পেয়েছে বিগত কয়েক দশকে। অথচ তাকে স্বীকৃতি দিলে রাষ্ট্রের সম্মান বাড়বে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতায় স্মাতকোত্তর ডিপ্লোমা-২০২২-২৩ ও নিউজরুম এডিটর-দৈনিক পূর্বকোণ।

 

 

পূর্বকোণ/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট