ভ্রাতৃত্বের বন্ধন শেখানো সমাজ আজ যে জিনিসটার টানাপোড়নে আছে সেটা হলো ‘সম্পর্ক’। সম্পর্ক শব্দটা যে ক্ষেত্রেই ব্যবহার করিনা কেন বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, ভাই-বোন, প্রেমিক-প্রেমিকা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর, বন্ধুত্ব বা আত্মীয়তার প্রত্যেকটিরই আছে নিজস্ব মূল্যবোধ।
প্রত্যেকটি মূল্যবোধের ক্ষেত্রে দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো তার প্রকাশমানদিক, যাতে আচরণমূল্য পরিমাণ করা যায়, অপরটি হলো তার আন্তরিক দিক; যাকে তাৎক্ষণিক ভাবে পরিমাপ করা যায় না। তাই আন্তরিক দিকটার উন্নয়ন করলে হয়তো আজকে আমাদের প্রতিটি সম্পর্কে যে টানাপোড়ন তা কিছুটা লাঘব হবে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সম্পর্কের টানাপোড়ন সৃষ্টি হয় আমাদের আচরণের জন্য। বিচ্ছেদ শব্দটি এখন এত বেশি শুনতে পাই যে, মাঝে মাঝে মনে হয় সিঙ্গেল মাদার, সিঙ্গেল ফাদার শব্দ গুলোকে ট্রেন্ড হিসেবে নিচ্ছে। এই ট্রেন্ড কি সমাজের জন্য আশীর্বাদ হতে পারবে? এতে কি কোনো সন্তান তার প্রাপ্য ভালোবাসাটা সম্পূর্ণ রূপে পাবে? এখন প্রায়ই দেখি প্রেমিক-প্রেমিকা সম্পর্কের কয়েক দিন বা কয়েক মাসের মধ্যে বিচ্ছেদ চায়। সন্তান মনে করে তাদের বাবা-মা তাদেরকে স্বাধীনভাবে থাকতে বাধা দিচ্ছে। না আবার সন্তান বড় হয়ে বাবা-মায়ের খবর নিচ্ছে না এমন খবর তো আমরা প্রায়ই শুনতে পাই। আবার এটাও দেখি ছাত্রের হাতে শিক্ষক লাঞ্চিত বা শিক্ষকের হাতে ছাত্রী লাঞ্চিত। এই বিষয়গুলো আমাদের সম্পর্ককে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে সেটা ভাবনার বিষয়।
প্রাপ্য সম্মানের কথা বলতে গেলে আরো একটি বিষয় ভাবিয়ে তোলে আমাকে সেটা হলো ‘দৃষ্টিভঙ্গি’। এখন একটা কথা প্রায়ই বলতে শুনি ‘যার যার অবস্থান থেকে সেই সঠিক’। এই বাক্য দিয়ে আসলেই কি আমরা পৃথিবীকে কোনো সুস্থ সমাজ উপহার দিতে পারবো? যখন কোন সন্তান তার বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে তখন আমরা কিভাবে বলতে পারি সেই সন্তানের অবস্থান থেকে সেই সঠিক? সেই সন্তানের দৃষ্টিভঙ্গি দিক থেকে ভাবতে গেলে বলতে হবে- বিষয়টি স্বাভাবিক। আসলেই কি এটা স্বাভাবিক কোন বিষয় হতে পারে? আমরা যখন মনে করতে থাকি আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজটা সঠিক বলে আমি করেছি তখন কি কোনো খুনিকে ফাঁসি দেয়া যেতে পারে? তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তো সে সঠিক ছিল। যার যার অবস্থান থেকে সেই সঠিক, সেটিকে আমাদের আদর্শ হিসেবে গণ্য না করে যদি সমাজকে সঠিক অবস্থানটা শেখানো যায় তাহলে হয়তো সমাজের রূপটাই পাল্টে যেতে পারে।
সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যখন কোনো সম্পর্ককে তার প্রাপ্য সম্মানটা দেয়া যায় তখন প্রকাশমান দিকটা উঠে আসে। সম্পর্কে দূরত্বের কথা বলছিলাম এখন প্রায়ই শুনি ১২ অথবা ১৩ বছর বয়সি ছেলে-মেয়েদের আত্মহত্যা করতে। যে ছেলে-মেয়ে তার কৈশোর জীবনই পার করে নাই তার ভিতরে হতাশা আসে কিভাবে? এই হতাশার মূল কারণ খুঁজতে গিয়ে পায় একাকিত্ব। আর একাকিত্ব শুরু হয় বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব থেকে।
বন্ধুত্বের কথায় ধরি, আগে সব বন্ধু মিলিত হলে আড্ডায় মেতে উঠতো আর এখন বন্ধুরা তো একত্রিত হয় ঠিকই কিন্তু তাদের মস্তিস্ক থাকে অন্যখানে। একসাথে বসে থাকে কিন্তু প্রত্যেকে তার ভার্চুয়াল জগতে ব্যস্ত। মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ যোগাযোগের এইসব পথ তৈরি করা হয়েছে প্রত্যেকে যেন তার আপনজনের সাথে সহজে যোগাযোগ করতে পারে, ভালোবাসা শেয়ার করতে পারে। ভালোবাসার মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে পারে। কিন্তু এই যোগাযোগের মাধ্যমেই মনে হয় এখন দূরত্বটা বেশি বাড়িয়ে দিল। মাঝে মাঝে মনে হয় এই আধুনিক ভার্চুয়াল জগতের চেয়ে পত্র যোগাযোগের সময়টা মধুর ছিল। স্ত্রী তার স্বামীর চিঠির জন্য অপেক্ষা করতো। বাবা-মা সন্তানের চিঠির জন্য অথবা সন্তান তার বাবা-মায়ের চিঠির জন্য অপেক্ষা করতো। এই অপেক্ষার মধ্যে যেই ভালোবাসার আবেগ লুকায়িত ছিল এখন এই ভার্চুয়াল জগতের সেটি খুঁজে পাওয়া যায় না। যেই দূরত্ব কমানোর জন্য এই ভার্চুয়াল জগতের সৃষ্টি সেই জগতটাই আজকে দূরত্ব বাড়িয়ে দিল। যখন কোন সম্পর্কে তার প্রাপ্য সম্মান, সময়, ভালোবাসা সঠিক রূপে দেয়া হয় তখন সম্পর্কে কখনো দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে না। তখন সন্তান তার বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবেনা। শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কেউ কারো হাতে লাঞ্চিত হবেনা। কোনো সন্তান হতাশায় পড়ে আত্মহত্যা করবেনা, প্রেমিক-প্রেমিকা কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। স্ত্রী তার স্বামীর কাছে স্বামী তার স্ত্রীর কাছে সব সময় প্রিয় হয়ে থাকবে। শাশুড়ির সাথে বউমার সম্পর্ক হয়ে উঠবে মা-মেয়ের মতো। পুরুষ যখন নারীকে তার সম্মানের জায়গায় রেখে বিচার করবে তখন রাস্তায় কিংবা যানবাহন বা গৃহে কোনো নারী ধর্ষিত হবে না। প্রতিটি সম্পর্কের যেই নিজস্ব সম্মানের জায়গা আছে সেটি বজায় রাখার চেষ্টা করলে হয়তো এই ব্যাধি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারবো। সিগারেটের নিকোটিন যেমন একটি মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায় তেমনি অসম্মান সম্পর্কে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ায়।
বজায় থাকুক সকল সম্পর্কের মূল্যবোধ। টিকে থাকুক সকল ভালোবাসা তার নিজস্বতা নিয়ে।
লেখক : অতিথি শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ।
পূর্বকোণ/এসি


















