বন্দরনগরী চট্টগ্রাম কেবল দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রই নয়, লক্ষ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনের স্পন্দন। অথচ এই শহরের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যাতায়াত এখন এক দুঃসহ ভোগান্তি ও চরম মানসিক যন্ত্রণার নাম। দিন দিন যানজট এমন এক অস্বস্তিকর ও ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, অল্প দূরত্বের পথ অতিক্রম করতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় বন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ট্রাফিক বিভাগের ভূমিকা মাঝে মাঝেই সীমিত হয়ে পড়ে কিছু সাময়িক ও লোকদেখানো অভিযানে। পত্রিকায় কয়েকটি উচ্ছেদ বা রেকারের ছবি আর খবর ছাপিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হচ্ছে, যা বাস্তব রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনতে পারছে না।
নগরীর এই কৃত্রিম ও অনিয়ন্ত্রিত যানজটের মূল কারণগুলো আজ আর কারও অজানা নয়, কিন্তু প্রতিকার ও বাস্তবায়নের অভাব। আমার দৃষ্টিতে যানজটের মূল কারণসমূহ হচ্ছে- মান্ধাতার আমলের ম্যানুয়াল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ যেমন ট্রাফিক পুলিশ বা সার্জেন্টদের হাত দিয়ে ম্যানুয়ালি গাড়ি থামানো বা ছাড়ার পদ্ধতি শহরের যানজটকে আরও তীব্র করে তুলছে। দেখা যায়, হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনেক সময় একটি সিগন্যালে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় এক পাশের রাস্তা বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে পেছনের গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে যানজট ভয়াবহ রূপ নেয়।
পুরানো প্রতিষ্ঠানের চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত নতুন অনুমতি, শহরের মূল এলাকাগুলোতে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা পুরানো স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, শপিং মল ও রেস্তোরাঁগুলোর নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। এমনিতেই এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রধান সড়কগুলোতে চরম চাপ তৈরি হয়ে থাকে, তার ওপর পর্যাপ্ত পার্কিং ও ট্রাফিক অ্যাসেসমেন্ট ছাড়াই একই এলাকায় নতুন নতুন একই ধরনের বাণিজ্যিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও বেসামাল করে তুলছে।
ভারী যানবাহনের বেপরোয়া অবস্থান, শিল্পাঞ্চল ও বন্দরকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে নিজস্ব লোডিং ও আনলোডিং বা টার্মিনাল সুবিধা না থাকায় বিশাল আকারের কন্টেইনারবাহী লরি ও ভারী ট্রাক দিনের আলোতেই মূল রাস্তায় দীর্ঘ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, যা শহরের প্রধান সড়কগুলোকে স্তব্ধ করে দেয়।
অপরিকল্পিত রোড ডিভাইডার, কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়াই যত্রতত্র অকার্যকর রোড ডিভাইডার বসিয়ে রাস্তার স্বাভাবিক প্রশস্ততা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা কৃত্রিম যানজটের (Artificial Traffic) জন্ম দিচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত বাস ও টেম্পোর বিশৃঙ্খলা, নির্দিষ্ট বাস স্টপ না থাকায় শহরের যত্রতত্র, মোড়ের মাথায় বা রাস্তার মাঝখানে মিনিবাস, বাস ও টেম্পো থামিয়ে বিপজ্জনকভাবে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। তাতে স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় চলমান যানবাহন এর গতি বাধাগ্রস্ত হয়ে যানজট বাড়ে ।
পৃথিবীর অনেক পুরোনো ও ঐতিহাসিক শহরের দিকে তাকালে আমরা এর ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের মতো শতবর্ষী শহরে অসংখ্য বিখ্যাত হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাচীন মল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যেগুলোর নিজস্ব বিশাল পার্কিং স্পেস নেই। অথচ সেখানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এতটাই সুসংহত যে যানজট সবসময় সহনীয় পর্যায়ে থাকে। এর মূল শক্তি হলো, প্রযুক্তির ব্যবহার, অটোমেটিক সিগন্যালিং, নির্দিষ্ট নিয়মকানুন এবং আইনের কঠোর ও নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়োগ। সেখানে নির্ধারিত বাস স্টপ ছাড়া গাড়ি থামানো নিষিদ্ধ, পার্কিংয়ে স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা রয়েছে এবং ভারী যানবাহনের চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি (যেমন: গভীর রাত বা ভোর) বেঁধে দেওয়া থাকে।
সংকট উত্তরণে করণীয়:১. এআই (AI) প্রযুক্তির স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা: হাত দিয়ে মান্ধাতার আমলের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের এনালগ ব্যবস্থা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত আধুনিক স্মার্ট সিগন্যাল লাইটিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যা রাস্তার গাড়ির ঘনত্ব রিয়েল-টাইমে পরিমাপ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যাল লাল বা সবুজ করবে। ২. নতুন প্রতিষ্ঠানের নকশা ও ট্রাফিক ছাড়পত্র কঠোর করা, পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস ও নিজস্ব ট্রাফিক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া শহরের মূল সড়ক ও স্পর্শকাতর মোড়গুলোতে নতুন কোনো স্কুল, হাসপাতাল বা বাণিজ্যিক ভবনের ট্রেড লাইসেন্স ও সিডিএ অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ৩. নির্দিষ্ট বাস ও টেম্পো স্টপ বাস্তবায়ন, নগরীর প্রতিটি রুটে সুনির্দিষ্ট ‘বাস স্টপ’ চিহ্নিত করতে হবে। নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া বাস-টেম্পো থামানো বা যাত্রী ওঠানামা করালে চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. অপরিকল্পিত ডিভাইডার পুনর্ম‚ল্যায়ন, ট্রাফিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুরো শহরের রোড ডিভাইডারগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে এবং কৃত্রিম যানজট সৃষ্টিকারী অবৈজ্ঞানিক বিভাজনগুলো দ্রুত অপসারণ বা সংস্কার করতে হবে। ৫. ভারী যানবাহনের জন্য সময়সূচি, কন্টেইনার ও ট্রাক মুভমেন্টের জন্য গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং শহরের বাইরে সাময়িক টার্মিনালের ব্যবস্থা করতে হবে। ৬. প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ও ই-প্রসিকিউশন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল সিগন্যাল ব্যবস্থার মাধ্যমে অটোমেটেড ট্রাফিক অনিয়ম চিহ্নিত করে ই-প্রসিকিউশন ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। সর্বোশেষে বলতে চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বিত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই সমস্যার কিছুটা সমাধান সম্ভব।
পূর্বকোণ/নুসরাত















