চট্টগ্রাম সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্মরণ : দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত

স্মরণ : দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত

আবদুর রহমান রুবেল

১৯ জুলাই, ২০২৬ | ৩:৩৩ অপরাহ্ণ

‘‘তৎকালীন বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের অতি প্রিয় চারজন বীর সেনানীকে বাংলার জনগণ সম্মানিত করেছিলেন তাঁদের নামের আগে চারটি কথা সংযোজন করে, ‘দেশবন্ধু’ চিত্তরঞ্জন, ‘দেশপ্রিয়’ যতীন্দ্রমোহন, ‘দেশপ্রাণ’ বীরেন্দ্রনাথ এবং ‘নেতাজী’ সুভাষচন্দ্র। বাংলার রাজনৈতিক জীবনে অশেষ কৃতিত্বের জন্য দেশপ্রিয় ত্রিবিধ মুকুট ধারণ করে চট্টগ্রামের গৌরব বর্ধন করেছিলেন।

 

আমরা ভুলতে বসেছি এই সুসন্তানকে।” কথাগুলো বলেছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বীর বিপ্লবী শ্রী বিনোদবিহারী চৌধুরী, অমলেন্দু বিশ্বাস রচিত ‘ছোটদের দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন’ গ্রন্থের ভূমিকায়। পটিয়ার কৃতী সন্তান, প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা, কলকাতা করপোরেশনের পাঁচবার নির্বাচিত মেয়র দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের ৭৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামী ২১ জুলাই। ১৯৩৩ সালের এই দিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকের হাতে বন্দী অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 

সর্বভারতীয় জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের এ মহান নেতার জন্ম ১৮৮৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর পটিয়ার (বর্তমানে চন্দনাইশ) বরমা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী ও রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর পিতার নাম এডভোকেট যাত্রামোহন সেনগুপ্ত এবং মায়ের নাম বিনোদিনী দেবী। পিতা যাত্রামোহন সেনগুপ্ত ছিলেন চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আইনজীবী, বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য ও রাজনীতিক। তিনি জেএম সেন নামেই অত্যধিক পরিচিত ছিলেন। চট্টগ্রাম নগরীর জেএম সেন হল, জেএম সেন হাইস্কুল তাঁরই প্রতিষ্ঠিত। মা বিনোদিনী দেবীও ছিলেন পটিয়ার বিখ্যাত খাস্তগীর পরিবারের মেয়ে।

 

চট্টগ্রাম ও পটিয়ায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে শিক্ষা বিস্তারে খাস্তগীর পরিবার ব্যাপক অবদান রেখেছে। ডা. খাস্তগীর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডা. অন্নদাচরণ খাস্তগীর ছিলেন তাঁর মাতামহ। পিতা যাত্রামোহন ১৮৯৮ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইনপেশায় যোগ দেওয়ার কারণে সপরিবারে কলকাতা চলে যান। এ সুবাধে যতীন্দ্রমোহন কলকাতা ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল, সুবারবান স্কুল ও হেয়ার হাইস্কুলে পড়েন।

 

১৯০৪ সালে যতীন্দ্রমোহন উচ্চ শিক্ষার্থে ব্যারিস্টারী পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় জওহরলাল নেহেরুর। ক্যামব্রিজের ভারতীয় বন্ধুরা তাঁর গুণাবলি দেখে যতীন্দ্রমোহনকে ক্যামব্রিজ ইন্ডিয়ান মজলিশ ও ইস্ট এন্ড ওয়েস্ট সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত করেন। ক্যামব্রিজ শহরের ইংরেজ তরুণী মিস এডিথ নেলীর সাথে যতীন্দ্রমোহনের সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং তাঁকে বিয়ে করেন। ভারতে ফিরে তাঁর স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তা নাম ধারণ করেন। এই নেলীই পরবর্তীতে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীতে পরিণত হন।

 

১৯১০ সালে যতীন্দ্রমোহন কলকাতা হাইকোর্টে জুনিয়র ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি রিপন আইন কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯১৯ সালের ২ নভেম্বর পিতার মৃত্যুর পর তিনি সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের আপসহীন ধারার নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের একনিষ্ঠ শিষ্য। ১৯২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের বিপ্লবী ‘পাঞ্জাব-কেশরী’ লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়। যতীন্দ্রমোহন ছিলেন এ অধিবেশনের সাধারণ সম্পাদক।

 

সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এটিই ছিল যতীন্দ্রমোহনের প্রথম অগ্রযাত্রা। ১৯২১ সালের ১৪ মার্চ চট্টগ্রাম টাউন হলে (বর্তমান জেএম সেন হল) জেলা কংগ্রেসের জনসভায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ঘোষণা দেন, ‘বন্ধুগণ আমি আনন্দিত। আমাদের প্রিয় নেতা আমার প্রিয় বন্ধু যতীন্দ্রমোহন সভায় উপস্থিত হয়েছেন। এবার আমি নিঃসন্দেহ, দেশের এই বিশেষ অঞ্চলে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন যতীন্দ্রমোহনের সুষ্ঠু নেতৃত্বে সাফল্যমন্ডিত হবে। আইনব্যবসা ছেড়ে তিনি আন্দোলন পরিচালনা করবেন।’ অন্যদিকে জনতার পাল্টা হর্ষধ্বনি ‘দেশবন্ধুর জয়’ ‘ যতীন্দ্রমোহনের জয়’।

 

চট্টগ্রামে দায়িত্ব নিয়ে তিনি শ্রমিকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। কংগ্রেসের তত্ত্বাবধান গঠিত বিওসি এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নে আন্দোলন সংগঠিত করার লক্ষ্যে সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে তাঁর নেতৃত্বে তুমুল শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠে। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে আন্দোলন সফল হলে জনতা তাঁকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ‘দেশপ্রিয়’ উপাধিতে ভূষিত করে। পরবর্তীতে তিনি রেলশ্রমিকদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেফতার হন। রেল ধর্মঘটে অবদান রাখার জন্য লোককবি রমেশ শীল রচনা করেন, “আর যায় না চুপ করে থাকা। যতীনবাবুর নেতৃত্বে বন্ধ হবে রেলের চাকা মানুষের একতা-জোরে, রেলের বিটে মরিচা পড়ে। আমার রক্তে উদর পুরে, আমাকে ডেম ব্লাডি ডাকা” ১৯২৩ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক স্বরাজ্য দলের সাধারণ সম্পাদক ও আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।

 

১৯২৫ সালের ১৬ জুন ভারতের একমাত্র মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন কলকাতা করপোরেশনের মেয়র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুবরণ করেন। দেশবন্ধুর শূন্যপদে ১৭ জুলাই কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন যতীন্দ্রমোহন। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও চারবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

 

রাজনৈতিক কারণে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন। এমনকি সর্বশেষ মেয়র নির্বাচিত হন কারাবন্দী অবস্থায়। ‘সশস্ত্র বিপ্লবী ও সন্ত্রাসবাদী দলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ থাকায় ১৯৩২ সালের ২০ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। ১৯৩৩ সালের ২১ জুলাই রাঁচিস্থ কাঁকে রোডের ‘নগেন্দ্র লজ’এ অন্তরীণ অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মানুষের উপর তাঁর কেমন প্রভাব কেমন ছিল তা আমরা বুঝতে পারি রমেশ শীলের এই গানে, “তোমার দেশে দেশপ্রিয় যতীন ব্যারিস্টার।/ জন্মভূমি ভুলে যাওয়া সাজে না তোমার”

লেখক: সদস্য সচিব, পটিয়া গৌরব সংসদ

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন