বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা প্রায়শই সমস্যার জন্য একজন চিকিৎসক, একজন হাসপাতাল পরিচালক বা একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করি। কোনো হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন, ক্যামেরার সামনে ডাক্তারদের বকাবকি, ওএসডি, সাময়িক বরখাস্ত বা লাইসেন্স বাতিল—এসব দৃশ্য জনমনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এতে কি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সমস্যার সমাধান হয়?
বাস্তবতা হলো, না। এতে সাময়িক ভীতি সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসে না। বরং দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, প্রশাসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম থাকলে অবশ্যই তদন্ত, জবাবদিহি ও শাস্তি হতে হবে, কিন্তু জনসমক্ষে অপমান কখনোই একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের পথ হতে পারে না।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় সংকট ব্যক্তি নয়; সংকট হলো কাঠামো। আজ একজন হাসপাতাল পরিচালক রোগীর সেবার জন্য দায়ী, কিন্তু তাঁর হাতে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। জনবল, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ভবন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, পানি, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা—সবকিছুর দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে দায়িত্ব এক জায়গায়, অথচ কর্তৃত্ব অন্যত্র। এই অসামঞ্জস্য দূর না করে কেবল ব্যক্তিকে দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে যুক্তরাজ্যের ঘঐঝ বা অন্য কোনো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হুবহু অনুকরণ করতে হবে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, প্রশাসনিক বাস্তবতা, রোগীর চাপ এবং বেসরকারি খাতের ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন| তাই আমাদের প্রয়োজন একটি বাংলাদেশি স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা মডেল, যা আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং যার ভিত্তি হবে নেতৃত্ব, জবাবদিহি, মানবিকতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ। এই ধরনের মডেল গড়ে তোলার জন্য বিদেশে তাকানোর আগে আমাদের নিজের দেশেই সফল উদাহরণগুলো থেকে শেখা উচিত।
উপজেলা পর্যায়ে সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। সীমিত সম্পদ দিয়েও কীভাবে পরিচ্ছন্ন, রোগীবান্ধব ও মানবিক হাসপাতাল গড়ে তোলা যায়, তা তারা দেখিয়েছে। সুন্দর পরিবেশ, স্বাস্থ্যশিক্ষামূলক তথ্য, পরিষ্কার টয়লেট, রোগীর সাপ্তাহিক খাদ্যতালিকা, স্বজনদের জন্য বসার ও খাবারের ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য কিডস জোন, মায়েদের জন্য ব্রেস্টফিডিং কর্নার, মানবতার দেয়াল, ফুলের বাগান এবং স্থানীয় সম্পদের সৃজনশীল ব্যবহার—এসব প্রমাণ করে যে উন্নত হাসপাতাল মানেই কেবল বড় বাজেট নয়; দরকার আন্তরিক নেতৃত্ব ও দলগত প্রচেষ্টা। ডা. রুহুল আমিন এবং তাঁর সহকর্মীদের নেতৃত্ব দেখিয়েছে, উপজেলা হাসপাতালও মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
জেলা পর্যায়ে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা হাসপাতাল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। জেলা হাসপাতালের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দালালচক্র, সিট বাণিজ্য, ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ঘিরে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক জটিলতা। দৃঢ়, তথ্যনির্ভর ও রোগীকেন্দ্রিক নেতৃত্বের মাধ্যমে এসব সমস্যার মোকাবিলা সম্ভব—এটি ডা. মোস্তাফিজুর রহমানের প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখিয়েছে। জেলা হাসপাতালের জন্য শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছ প্রশাসন যেমন জরুরি, তেমনি জনসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াও অপরিহার্য।
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। একটি বৃহৎ তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী, জটিল জরুরি বিভাগ, বহু বিশেষায়িত ইউনিট এবং বিশাল জনবল পরিচালনা করতে হয়। এখানে শুধু চিকিৎসাবিদ্যা জানাই যথেষ্ট নয়; দরকার শক্তিশালী প্রশাসনিক দক্ষতা, রোগীপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা, সাপোর্ট সার্ভিসের সমন্বয়, জরুরি বিভাগের কার্যকারিতা এবং সুস্পষ্ট নেতৃত্ব। ব্রিগেডিয়ার ডা. নাসিরের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা দেখায়, দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বড় সরকারি হাসপাতালেও ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। এই তিনটি উদাহরণ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—একটি সফল স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না; এটি নেতৃত্ব, জবাবদিহি, ব্যবস্থাপনা এবং কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এ কারণে সরকারের উচিত একটি জাতীয় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা সংস্কার টাস্ক ফোর্স গঠন করা। এই টাস্ক ফোর্সে সফল হাসপাতাল প্রশাসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার,স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, নার্সিং প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং রোগী অধিকার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তাদের কাজ হবে বিদেশি মডেল অনুকরণ নয়; বরং বাংলাদেশের বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি জাতীয় হাসপাতাল পরিচালনা কাঠামো তৈরি করা।
সংস্কারের কয়েকটি মৌলিক বিষয় এখনই বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি হাসপাতালে সুস্পষ্ট কমান্ড স্ট্রাকচার থাকতে হবে, যাতে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব একই ব্যবস্থার মধ্যে থাকে| দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল পরিচালককে সীমিত হলেও কার্যকর আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে ছোটখাটো মেরামত, জরুরি ক্রয়, পরিচ্ছন্নতা ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসের পর মাস অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে না হয়। তৃতীয়ত, প্রতিটি হাসপাতালে সক্রিয় হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকতে হবে, যারা নিয়মিতভাবে ওষুধের ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রোগীর অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতা এবং জরুরি বিভাগের অপেক্ষার সময় মূল্যায়ন করবে। চতুর্থত, বাজেট বাস্তব রোগীর চাপ অনুযায়ী বরাদ্দ করতে হবে। ৫০ শয্যার হাসপাতালে যদি প্রতিদিন ১৫০ রোগী ভর্তি থাকে, তাহলে ৫০ শয্যার বাজেটে মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। পঞ্চমত, প্রতিটি জেলা ও বড় উপজেলা হাসপাতালে বায়োমেডিক্যাল মেইনটেন্যান্স সেল গঠন করতে হবে, যাতে নষ্ট হওয়া যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত করা যায় এবং রোগীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে না হয়। ষষ্ঠত, রোগী ওস্বজনদের মৌলিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। পরিষ্কার টয়লেট, নিরাপদ পানি, তথ্যকেন্দ্র, বসার জায়গা, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, প্রার্থনার স্থান এবং অপেক্ষমাণ কক্ষ কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো একটি মানবিক হাসপাতালের অপরিহার্য অংশ। সপ্তমত, হাসপাতালের সৌন্দর্যায়ন ও পরিচ্ছন্নতাকে স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রোগীর মানসিক চাপ কমায়, কর্মীদের উৎসাহ বাড়ায় এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে—যা সাপাহার উপজেলা স্বস্থ্য কমপ্লেক্স বাস্তবে প্রমাণ করেছে। অষ্টমত, দালালচক্র ও অনিয়ম দমনে নাটকীয় অভিযান নয়; বরং ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থা,স্বচ্ছ বেড ম্যানেজমেন্ট, হাসপাতাল ফার্মেসি মনিটরিং, সিসিটিভিভিত্তিক জবাবদিহি এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে| নবমত, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জনবল সংকট, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং কর্মস্থলে সহিংসতার সমাধান ছাড়া উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সম্ভব নয়| দশমত, ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। যে হাসপাতাল রোগীকেন্দ্রিক পরিবর্তন আনছে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখছে বা সেবার মান উন্নত করছে, তাদের জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত করা উচিত। শুধুমাত্র শাস্তির সংস্কৃতি নয়, উৎকর্ষের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ হতে হবে মানবিক ও ধাপে ধাপে। কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে ভর্তি রোগী, আইসিইউ রোগী, ক্যান্সার রোগী বা ডায়ালাইসিস রোগীদের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।স্বাস্থ্যনীতি কখনো রোগীকে বিপদে ফেলে বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার কোনো এক দিনের কাজ নয়, কোনো ক্যামেরাকেন্দ্রিক অভিযানও নয়| এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মসূচি। সাপাহার আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে একটি উপজেলা হাসপাতাল মানুষের ভালোবাসার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। ঝিনাইদহ দেখিয়েছে দৃঢ় নেতৃত্বে জেলা হাসপাতাল বদলানো সম্ভব। ময়মনসিংহ প্রমাণ করেছে দক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে বৃহৎ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে|
এখন সময় এসেছে এই বিচ্ছিন্ন সফল অভিজ্ঞতাগুলোকে একত্র করে একটি বাংলাদেশি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তোলার। ব্যক্তিকে দোষারোপ নয়, ব্যবস্থার সংস্কারই হতে হবে আমাদের লক্ষ্য| কারণ স্বাস্থ্যসেবা শুধু একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা, অধিকার এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা|
পূর্বকোণ/আদর















