বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনে ব্যবহৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম বাড়ানোর একটি প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা।
রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তাদের প্রস্তাবে বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতে গ্যাসের নতুন মূল্যও তুলে ধরা হয়েছে।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নানের ভাষ্য, মন্ত্রণালয়ে যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, সেটি সিএনজি স্টেশন মালিকদের মার্জিন বাড়ানোর দাবি।
পেট্রোবাংলার প্রস্তাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির দাম প্রায় ৬৫ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ২ জুলাইয়ের সর্বশেষ আদেশ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের বর্তমান দাম প্রতি ঘনমিটার ১৫ টাকা ৫০ পয়সা।
সে হিসাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গ্যাসের দাম ২৫ টাকা করা হলে প্রতি ঘনমিটারে ৯ টাকা ৫০ পয়সা বা প্রায় ৬১ শতাংশ বাড়বে।
বিইআরসির আদেশ অনুযায়ী, সিএনজি গ্রাহকশ্রেণিতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩৮ টাকা। স্টেশন মালিকদের মার্জিনসহ যানবাহনের সিএনজির বর্তমান পাম্পমূল্য ৪৩ টাকা। সেই দাম ৬৫ টাকা করা হলে প্রতি ঘনমিটারে ২২ টাকা বা প্রায় ৫১ শতাংশ বাড়বে।
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ও কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার মধ্যে দাম বাড়ানোর এই প্রস্তাব সামনে এল।
সরবরাহ সংকটে বাসাবাড়িতে রান্না ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পেয়ে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
চেয়ারম্যান যা বললেন
শুক্রবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিষয়টি সাধারণভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়ে নয়।
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে মার্জিন না বাড়ায় লাভ কমে যাওয়ার কথা জানিয়ে সিএনজি স্টেশন মালিকরা পেট্রোবাংলায় এসেছিলেন। তারা ধর্মঘটের কথাও বলেছিলেন।
আব্দুল মান্নান বলেন, “তাদের প্রস্তাবটা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব।”
সিএনজির পাশাপাশি বাসাবাড়ি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো বিষয় আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সিএনজিরই বাড়বে, এটাও আমি বলছি না।”
স্টেশন মালিকদের দাবি বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “উনারা তো দাবি করছে, এখন তো দাবি করলে মানুষকে কী করতে হয়? এটা বিবেচনার ইয়ে করা হইছে, এরকম কিছু না।”
তিনি বলেন, “এটা বোধহয় পাঠানো হইছে। দেখি আমি একটু আলাপ করে দেখব, না হলে আমরা লিখে দেব, সিএনজির দাম বাড়াব না আমরা।”
তবে পেট্রোবাংলার আরেক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহন খাতে সিএনজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
কোন খাতে এখন দাম কত
বিইআরসির গত ২ জুলাইয়ের আদেশ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৫ টাকা ৫০ পয়সা।
ক্যাপটিভ বিদ্যুতের পুরোনো গ্রাহকদের অনুমোদিত লোডের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম ৩১ টাকা ৫০ পয়সা। এর বেশি ব্যবহার এবং নতুন গ্রাহকদের জন্য দাম ৪২ টাকা।
সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২৯ টাকা ২৫ পয়সা। পুরোনো শিল্প গ্রাহকদের অনুমোদিত লোডের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম ৩০ টাকা। এর বেশি ব্যবহার এবং নতুন শিল্প গ্রাহকদের জন্য দাম ৪০ টাকা।
চা শিল্পে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১১ টাকা ৯৩ পয়সা, বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৩০ টাকা ৫০ পয়সা এবং মিটারযুক্ত আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ১৮ টাকা।
সিএনজি গ্রাহকশ্রেণিতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩৮ টাকা। স্টেশন মালিকদের মার্জিনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে যানবাহনের জন্য পাম্পমূল্য রাখা হয়েছে ৪৩ টাকা।
বিতরণ মাশুলও বাড়াতে চায় কোম্পানিগুলো
তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলী, জালালাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল ও সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি বিতরণ মাশুল বাড়ানোর যেসব আবেদন পেট্রোবাংলায় করেছে, সেগুলোও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি প্রতি ঘনমিটারে বিতরণ মাশুল ৩৭ পয়সা থেকে ১ টাকা ২১ পয়সা এবং বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ৩০ পয়সা থেকে ৯০ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম ১৮ পয়সা থেকে ৬৩ পয়সা এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি ২৪ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫ পয়সা করার আবেদন করেছে।
তিতাস গ্যাস দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে। অনুমোদিত সিস্টেম লস ৫ শতাংশ ধরে প্রতি ঘনমিটারে ৩৫ পয়সা এবং সিস্টেম লস ২ শতাংশ হলে ১ টাকা ৪ পয়সা বিতরণ মাশুল চেয়েছে কোম্পানিটি।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, বর্তমান মাশুল দিয়ে তাদের পরিচালন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না।
দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে যা বলছে পেট্রোবাংলা
পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশীয় ও আমদানি করা গ্যাস মিলিয়ে প্রতি ঘনমিটারের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ৩১ টাকা ৬৫ পয়সা। বিপরীতে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২৩ টাকা ৬৩ পয়সা। এতে প্রতি ঘনমিটারে ৮ টাকা ২ পয়সা ঘাটতি হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর এলএনজির আমদানি ব্যয় আরও বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল ২৭ টাকা ৬৪ পয়সা, যা এপ্রিল থেকে জুনে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫ টাকা ৭৯ পয়সা। ওই সময়ে আগের দামে গ্যাস বিক্রি করায় প্রতি ঘনমিটারে লোকসান হয় ২১ টাকা ৮২ পয়সা।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির মোট আর্থিক ঘাটতি প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
আমদানিনির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। গত অর্থবছরে মোট গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় উৎপাদনের অংশ কমে ৩০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তখন মোট সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানিনির্ভর হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগের নীতিগত সম্মতি পেলেও পেট্রোবাংলার প্রস্তাব সরাসরি কার্যকর হবে না। গ্যাসের দাম পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। কমিশন আবেদন যাচাই, আর্থিক বিশ্লেষণ ও গণশুনানি শেষে সিদ্ধান্ত দেবে।
পূর্বকোণ/আরআর/পারভেজ















