চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

নববর্ষ : মননের একাল সেকাল

সাজিদুল হক

১৪ এপ্রিল, ২০২৬ | ২:০৫ অপরাহ্ণ

বাঙালি যে নববর্ষ উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে, সে কী কোন বাধ্যবাধকতায়। এক্ষেত্রে কী সাংবিধান এদেশের নাগরিকদের বাধ্য করে! যেভাবে একুশের প্রভাত ফেরিতে যায়, পহেলা বৈশাখের র্যালিতেও যায়, এর পেছনের তাগিদটা কেন?
পহেলা বৈশাখের র্যালি বা শোভাযাত্রায় মানুষ কেন যায়, এর পেছনের তাগিদটা আসলে অনেক স্তরের, যেন একসঙ্গে ইতিহাস, আবেগ, প্রতিবাদ আর উৎসবের নদী এসে মিশে যায়।
নতুন শুরুর মানসিক তাগিদ
মানুষ স্বভাবতই, নতুনকে ভালোবাসে। পুরোনো বছরের ক্লান্তি, ব্যর্থতা, দুঃখ, সামাজিক অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলে নতুন বছরে প্রবেশ করার এক প্রতীকী দরজা হলো এই র্যালি সম্মিলিত পরিচয়ের খোঁজ এটি শুধু আনন্দ নয়, আমি বাঙালি – এই পরিচয়কে দৃশ্যমান করারও এক সামাজিক ভাষা। গ্রাম থেকে শহর, শিশু থেকে প্রবীণ, সবাই একই রঙে, একই গানে, সমন্বিত সুরে হাঁটে। এই সমবেত চলা মানুষকে একা থেকে “আমরা”-তে রূপান্তর করে। র্যালি তাই এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের মিছিল।সৌন্দর্যের ভিতরে প্রতীকী প্রতিবাদ।
এই উৎসবের মনস্তত্ত্ব হলো, মানুষ উৎসবে নিজেকে পুনর্গঠন করার সুযোগ পায়। ধর্ম নয়, সম্প্রদায়ের কেউ নয়, জাতীয় বোধে প্রাণিত বাঙালি মাত্রেই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হয়।
বিষয়টি কেবলমাত্র রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক নাগরিকতাও। অনেকেই র্যালিতে যান কারণ এটি নাগরিক অংশগ্রহণের এক কোমল রূপ। এখানে বক্তব্য আছে, কিন্তু তা স্লোগানের চেয়ে বেশি শিল্পে বলা হয়। একেকটি মুখোশ যেন একেকটি বাক্য, একেকটি ব্যানার যেন একেকটি কবিতা।
এক কথায়, পহেলা বৈশাখের র্যালিতে যাওয়ার তাগিদ হলো মানুষ নিজের শিকড়, সমাজ, আশা ও নতুন ভবিষ্যতের সঙ্গে একদিনের জন্য হলেও দৃশ্যমানভাবে যুক্ত হতে চায়।
এটি কেবল হাঁটা নয়, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মঘোষণা: আমরা এখনো একসঙ্গে স্বপ্ন দেখতে পারি।
মহামিলনের এই দিনে আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, কেমন ছিলো বাহাত্তর সালের পহেলা বৈশাখ। সদ্য স্বাধীন দেশের বুকের প্রথম গভীর শ্বাস। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের পহেলা বৈশাখ কেবল বাংলা সনের প্রথম দিন নয়, রাষ্ট্রজন্মের পর জাতিসত্তার প্রথম সাংস্কৃতিক উচ্চারণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কেবল রাস্তা, সেতু, প্রশাসনই গড়ে তুলছিল না; গড়ে তুলছিল নিজের আত্মপরিচয়ের ঘরও। সেই ঘরের প্রথম জানালায় যে আলো এসে পড়েছিল, তার একটি নাম পহেলা বৈশাখ। বাহাত্তরের বৈশাখ তাই উৎসবের চেয়ে বড়, ছিল এক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ঘোষণা: এই রাষ্ট্রের আত্মা বাঙালি, এর ভাষা বাংলা, এর চেতনা অসাম্প্রদায়িক।
পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘদিন বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। রবীন্দ্রসংগীত থেকে লোকজ ঐতিহ্য, উৎসব থেকে পোশাক, সবকিছুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল একরৈখিক সাংস্কৃতিক কাঠামো। মুক্তিযুদ্ধ সেই কাঠামো ভেঙে দেয় অস্ত্রের শক্তিতে; আর ১৯৭২-এর বৈশাখ তা ভেঙে দেয় উৎসবের শক্তিতে। তাই সে বছরের বৈশাখে লোকগান, কবিতা, গ্রামীণ মেলা, রমনার বটমূল, পান্তা-ভাত, হালখাতা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের মিলন ছিল নিছক রীতি নয়, ছিল সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পুনর্দখল। যে জাতি রক্ত দিয়ে রাষ্ট্র উদ্ধারকরেছে, সে জাতি গান দিয়ে নিজের আত্মাকে ফিরিয়ে আনছিল।
আজকের পহেলা বৈশাখ সেই ঐতিহাসিক শিকড় বহন করলেও এর রূপ অনেকটাই বদলেছে। এখন এটি শুধু সাংস্কৃতিক নয়, নান্দনিক, ভিজ্যুয়াল এবং নগর-সমাজকেন্দ্রিক এক বৃহৎ জনউৎসব। চারুকলার শোভাযাত্রা, মুখোশ, বাঘ, মাছ, পাখি, লোকমোটিফ, শিল্পিত প্রতীক, লাল-সাদা পোশাক, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি-বন্যা, কর্পোরেট আয়োজন, রেস্তোরাঁর বিশেষ মেনু, সব মিলিয়ে বৈশাখ আজ অনেক বেশি দৃশ্যমান এবং প্রদর্শনমুখী। এটি খারাপ নয়; বরং সংস্কৃতির বিস্তার। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন জাগে: উৎসবের শরীর যত বড় হয়েছে, তার আত্মাও কি সমানভাবে গভীর থেকেছে?
০১. সেই বৈশাখের সাংস্কৃতিক চরিত্র কেমন ছিলো?
সেই সময়ের বৈশাখে আজকের মতো বাণিজ্যিক চাকচিক্য কম ছিল, কিন্তু প্রতীকী শক্তি ছিল অনেক বেশি।
পাকিস্তানি সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে বাঙালিত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা
লোকগান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, কবিতা ও আবৃত্তি, গ্রামীণ মেলা, হালখাতা, পান্তা, আত্মীয়-স্বজনের মিলন, শহীদদের স্মৃতির সঙ্গে নববর্ষের যোগ, বিশেষ করে ছায়ানটের রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান স্বাধীনতার পর আরও গভীর অর্থ পায়। ১৯৬৭ সালে যে আয়োজন ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, ১৯৭২-এ তা হয়ে ওঠে স্বাধীন জাতির আত্মঘোষণা।
০২. এই সময়ের বৈশাখের বিবর্তিত সাংস্কৃতিক রূপ যা দাঁড়ায়।
আজ পহেলা বৈশাখ অনেক বেশি নগরায়িত, দৃশ্যনির্ভর ও জনউৎসবমুখী। একটা সময় এমন রঙিন ছিলো না বৈশাখের আয়োজন।
১৯৮৯ সালে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা যুক্ত হওয়ার পর উৎসবের ভিজ্যুয়াল ভাষা পাল্টে যায়। মুখোশ, পাখি, বাঘ, মাছ, লোকমোটিফ, প্রতীকী শিল্পকর্ম বৈশাখকে নতুন এক জন-নন্দন রূপ দেয়। পরে এটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতিও পায়।
আমরা বৈশাখের বদলগুলো এভাবে দেখতে পারি:
ক) রাষ্ট্রীয় থেকে গণ-সাংস্কৃতিক।
আগে এটি ছিল স্বাধীনতার আবেগঘন জাতিসত্তার উৎসব, এখন তা সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে বৃহৎ জনমেলা। ব্যক্তিগত ভালোলাগা প্রাণের স্পন্দনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধান উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা ক্রমান্বয়ে গণ চরিত্র ধারণ করেছে।
খ) লোকায়ত থেকে নান্দনিক।
আগে পান্তা, মেলা, হালখাতা ছিল কেন্দ্রের আয়োজনে। এখন চারুকলার শোভাযাত্রা, ফ্যাশন, থিম-ভিত্তিক সাজসজ্জা বড় উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়েছে। শুধু রঙের ফানুস নয়, ঐতিহাসিক বাস্তবতায় নতুন পথের দিকে ধাবমান মানুষের বাধাগ্রস্ত স্বপ্নগুলো।
গ) প্রতিবাদী সুরের সম্প্রসারণ।
স্বৈরাচারবিরোধী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা এখনো আছে, তবে এখন এর সঙ্গে পরিবেশ, মানবতা, সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী বার্তাও যুক্ত হয়।
ঘ) বৈশাখের বাণিজ্যিকীকরণ।
টিভি অনুষ্ঠান, কর্পোরেট স্পনসর, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, রেস্তোরাঁর পান্তা-ইলিশ অফার বৈশাখকে বাজারেরও উৎসবে পরিণত করেছে।
যে প্রশ্নটি জরুরি, কতটা বদলেছে?
যদিও মূল আত্মা খুব বেশি বদলায়নি। এখনো বৈশাখের কেন্দ্রবিন্দু বাঙালির সম্মিলিত পরিচয়, নতুনের আহ্বান, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জাগরণ। বদলেছে এর প্রকাশভঙ্গি।
বাহাত্তরের বৈশাখ ছিল মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর ধ্বংসস্তূপে ফুটে ওঠা শিমুলফুল; আজকের বৈশাখ সেই ফুলের চারপাশে তৈরি এক বিশাল রঙিন বনভূমি।
অর্থাৎ, চরিত্রের শিকড় একই, কিন্তু শাখা-প্রশাখা অনেক বিস্তৃত ও বহুরূপী হয়েছে।
বলা যায়, পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক চরিত্র বদলেছে মূলত প্রকাশভঙ্গিতে, আত্মায় নয়। বাহাত্তরের বৈশাখ ছিল মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর জাতির অন্তর্গত পুনর্জাগরণের আগুন; আজকের বৈশাখ সেই আগুনের চারপাশে গড়ে ওঠা রঙিন আলোর মেলা। শিকড় একই, কিন্তু বৃক্ষের ডালপালা বিস্তৃত হয়েছে সময়, সমাজ ও শিল্পের নতুন পরিসরে। এই বিবর্তনই প্রমাণ করে, বাঙালির সংস্কৃতি নদীর মতো, উৎস এক হলেও প্রবাহে যুগে যুগে নতুন বাঁক জন্ম নেয়।

 

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

 

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট