ডা. জেড রহমান-নামটি ছদ্মনাম। তিনি দেশের একজন পরিচিত রেডিওলজিস্ট। জীবনের বড় অংশ কেটেছে হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে। হাজার হাজার এক্স-রে ও সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে গিয়ে ভেবেছিলেন, এবার কিছুটা নিশ্চিন্তে সময় কাটাবেন। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই শরীর দুর্বল লাগতে শুরু করল। পরিচিত এক চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করালেন। আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল, তিনি লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত।
আরেকটি উদাহরণ ধরা যাক। কুতুব সাহেব একটি বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৩০ বছর রেডিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন। অবসরের পর তাঁর শরীরে ধরা পড়ল মাল্টিপল মাইলোমা। এই দুই ব্যক্তির ক্যানসারের কারণ যে তাঁদের পেশাগত রেডিয়েশন এক্সপোজার-এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না। ক্যানসারের কারণ বহুবিধ। একজন ব্যক্তি রেডিয়েশন বিভাগে কাজ করেছেন বলেই তাঁর ক্যানসার রেডিয়েশনের কারণে হয়েছে-এমন সরল সিদ্ধান্ত দায়িত্বশীল নয়। তবে এখানেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। ৩০ বা ৪০ বছর রেডিয়েশন নিয়ে কাজ করার পর একজন কর্মী কি জানতে পারবেন, তাঁর পুরো কর্মজীবনে মোট কত রেডিয়েশন ডোজ তিনি পেয়েছেন? বাংলাদেশের রেডিয়েশন সুরক্ষা ব্যবস্থার এই প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর দিতে পারা উচিত।
রেডিয়েশন প্রয়োজনীয়, কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত নয়: আধুনিক চিকিৎসা এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, ফ্লুরোস্কোপি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও রেডিয়েশন থেরাপি ছাড়া কল্পনা করা কঠিন। এসব প্রযুক্তি প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ionising radiation মানুষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দীর্ঘ সময়ে cumulative radiation dose বাড়লে কিছু ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এর অর্থ আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়। বরং এর অর্থ হলো-রেডিয়েশন কর্মীদের এক্সপোজার নিয়মিত মাপতে হবে, অপ্রয়োজ- নীয় ডোজ কমাতে হবে এবং প্রতিটি কর্মীর সারাজীবনের ডোজ রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী occupationally exposed worker-এর কার্যকর ডােজসীমা সাধারণত পাঁচ বছরে গড়ে বছরে ২০ মিলিসিভার্ট। তবে এই সীমা কোনো লক্ষ্য নয়; প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো exposure যতটা সম্ভব কম রাখা।
বাংলাদেশে কারা রেডিয়েশন কর্মী? বাংলাদেশে কয়েক হাজার মানুষ সরাসরি ionising radiation-এর সঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে আছেন রেডিওলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, সংশ্লিষ্ট রেসিডেন্ট চিকিৎসক, রেডিওগ্রাফার, রেডিয়েশন থেরাপি টেকনোলজিস্ট, নিউক্লিয়ার মেডিসিন টেকনোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং কিছু যন্ত্র প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান। রেডিওগ্রাফারদের সংখ্যা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি; বিভিন্ন স্বাস্থ্য জনবল তথ্যে দেশে চার হাজারের বেশি radiology and imaging technologist-এর কথা পাওয়া যায়। এখানে একটি পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। MRI ionising radiation ব্যবহার করে না। তাই শুধুমাত্র MRI-তে কাজ করলেই কাউকে occupational ionis- ing-radiation worker বলা যাবে না।
TLD ব্যাজ থাকলেই দায়িত্ব শেষ নয় : রেডিয়েশন কর্মীদের ব্যক্তিগত ডোেজ পর্যবেক্ষণে সাধারণত TLD বা Thermoluminescent Dosimeter ব্যাজ ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট সময় ব্যবহারের পর ব্যাজ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয় এবং সেই সময়ের radiation dose পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের Health Physics Division TLD-ভিত্তিক individual monitoring service দিয়ে থাকে। অর্থাৎ দেশে কোনো মনিটরিংই নেই-এ কথা বলা সঠিক হবে না। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো- দেশের সব যোগ্য রেডিয়েশন কর্মী কি নিয়মিত এই ব্যবস্থার আওতায় আছেন? সবাই কি সময়মতো TLD পাচ্ছেন? ব্যাজ কি নিয়মিত ফেরত যাচ্ছে? ডোজ কি কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে? একজন কর্মী হাসপাতাল পরিবর্তন করলে তাঁর আগের dose history কি নতুন রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পরিষ্কার ও সর্বজনবিদিত নয়।
প্রয়োজন National Occupational Radiation Dose Registry: বাংলাদেশের এখন একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় occupational radiation dose registry প্রয়োজন। প্রতিটি রেডিয়েশন কর্মীর একটি unique identification num- ber থাকবে। তিনি সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে যান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বদলি হন অথবা কর্মজীবনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন-তাঁর dose history যেন কখনো হারিয়ে না যায়। রেকর্ডটি হওয়া উচিত ব্যক্তির, প্রতিষ্ঠানের নয়। একজন কর্মী নিজেই অনলাইনে দেখতে পারবেন তাঁর current dose, annual cumulative dose, পাঁচ বছরের cumulative dose এবং lifetime occupational dose কোনো অস্বাভাবিক dose পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মী, প্রতিষ্ঠানের Radiation Control Officer এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্ক করা উচিত। ২০২৬ সালে এই তথ্য শুধু কাগজের চিঠি বা কোনো হাস: পাতালের ফাইলে পড়ে থাকা গ্রহণযোগ্য নয়।
এখন প্রয়োজন জাতীয় অডিট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, Bangladesh Atomic Energy Regulatory Authority এবং Bangladesh Atomic Energy Commission যৌথভাবে একটি জাতীয় অডিট করতে পারে। জানা দরকার-দেশে মোট কতজন occupational radiation worker আছেন, তাঁদের মধ্যে কতজন নিয়মিত personal dosimeter ব্যবহার করেন, কতজনের uninterrupted dose history আছে এবং কতটি হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে monitoring নিয়মিত হচ্ছে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি খুব সহজ: আজ একজন রেডিওগ্রাফার তাঁর ৩০ বছরের কর্মজীবনের মোট radiation dose জানতে চাইলে আমরা কি তাঁকে সেই তথ্য দিতে পারব? যদি না পারি, তাহলে আমাদের radiation protection system এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়। বাংলাদেশ আধুনিক CT, nuclear medicine, LINAC ও sophisticated imaging technology-তে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সঙ্গে যাঁরা প্রতিদিন কাজ করছেন, তাঁদের নিরাপত্তাতেও সমান বিনিয়োগ প্রয়োজন।
একজন রেডিওগ্রাফার যদি জীবনের ৩০ বছর রোগীর এক্স-রে করেন, একজন medical physicist যদি সারাজীবন radiotherapy-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, অথবা একজন nuclear medicine technologist যদি প্রতিদিন radioactive material নিয়ে কাজ করেন-তাহলে তাঁদের নিজের occupational exposure জানার অধিকার রয়েছে। সমাধানটি জটিল নয়। একজন রেডিয়েশন কর্মী, একটি ইউনিক আইডি,
প্রয়োজন অনুযায়ী একটি personal dosimeter এবং সারাজীবনের একটি digital radiation dose record |
যাঁরা সারাজীবন অন্য মানুষের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় রেডিয়েশন ব্যবহার করেন, তাঁদের নিজেদের রেডিয়েশন এক্সপোজারের হিসাব জানার অধিকার অন্তত নিশ্চিত করা উচিত।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক: এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর


















