মোহাম্মদ ইছহাক একজন তুখোড় মেধাবী ও সৎ বিসিএস কর্মকর্তা। তাঁর স্ত্রী সরকারি কলেজের শিক্ষিকা। এক মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তাঁদের সাজানো সংসার। দুজনের নিয়মিত আয় আছে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন আছে। কিন্তু হঠাৎ একটি অসুখ সেই পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। একদিন তাঁর স্ত্রী বাম স্তনে একটি ছোট চাকা অনুভব করলেন। পরিচিত একজন সাধারণ চিকিৎসকের পরামর্শে গেলেন সার্জনের কাছে। এরপর ম্যামোগ্রাম, আল্ট্রাসাউন্ড ও বায়োপসি। পরীক্ষায় ধরা পড়ল স্তন ক্যানসার। শুরু হলো চিকিৎসার পরিকল্পনা-অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও প্রয়োজন অনুযায়ী রেডিয়েশন। এক চিকিৎসক থেকে অন্য চিকিৎসক, এক পরীক্ষা থেকে আরেক পরীক্ষা-পরিবারটির জীবন হয়ে উঠল উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় ভরা এক যাত্রা।
মোহাম্মদ ইছহাক একটি কল্পিত নাম। কিন্তু তাঁর পরিবারের এই গল্প বাংলাদেশের হাজার হাজার ক্যানসার আক্রান্ত পরিবারের বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। রোগের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে অসহায় হয়ে পড়া এ দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিটি ধাপে বাড়তে থাকল খরচের পারদ। রোগের ভয় যতটা, চিকিৎসার টাকা জোগাড়ের ভয়ও ততটাই। মোহাম্মদ ইছহাক এর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, রিপোর্ট দেখে মেডিকেল অনকোলজিস্ট জানালেন, তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসায় পেমব্রোলিজুম্যাব নামে একটি ওষুধ প্রয়োজন হবে, তিন সপ্তাহ পরপর। পরিবারকে জানানো আনুমানিক খরচ লাখ টাকার কাছাকাছি। প্রকৃত ব্যয় প্রস্তুতকারক, ডোজ ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। এই ওষুধ সব স্তন ক্যানসারের রোগীর জন্য প্রয়োজন হয় না; নির্দিষ্ট ধরন ও পর্যায়ের রোগে এর ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু যে রোগীর জন্য এটি উপযুক্ত, তাঁর পরিবারের কাছে চিকিৎসার প্রয়োজনের সঙ্গে সামর্থ্যের প্রশ্নটিও এসে দাঁড়ায়। একজন বিসিএস কর্মকর্তা এবং একজন সরকারি কলেজের শিক্ষিকার পক্ষেও যদি এই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়, তাহলে একজন কৃষক, পোশাকশ্রমিক, রিকশাচালক কিংবা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীর পরিবার কোথায় দাঁড়াবে? মোহাম্মদ ইছহাক এর পরিবারের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: ক্যানসার একজনের শরীরে হলেও তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ আর্থিক দায় কি শুধু সেই পরিবারকেই বহন করতে হবে?
এক পরিবারের অসুখ, সবার দায়িত্ব : ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় শুধু ওষুধ বা হাসপাতালের বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরীক্ষা, যাতায়াত, থাকার ব্যবস্থা, খাবার এবং রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনের কর্মবিরতি-সব মিলিয়ে সংসারের স্বাভাবিক হিসাব ভেঙে পড়ে। চিকিৎসার জন্য সঞ্চয় খরচ হয়, ঋণ নিতে হয়, কখনো সম্পদ বিক্রি করতে হয়। সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজনও চাপের মধ্যে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত সহায়তা মূল্যবান, কিন্তু একটি দেশের ক্যানসার চিকিৎসা শুধু অনুদানের আবেদন আর আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে পারে না। প্রয়োজন একটি স্থায়ী, নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে অসুস্থ হওয়ার আগেই সবাই মিলে চিকিৎসার আর্থিক সুরক্ষা তৈরি করবে। এই লক্ষ্যেই গঠন করা যেতে পারে জাতীয় ক্যানসার কেয়ার ফান্ড। এর জনসম্পৃক্ত উদ্যোগের নাম হতে পারে- ‘১০ টাকায় ক্যানসারের চিকিৎসা’। নামটির অর্থ এই নয় যে একজন রোগীর পুরো চিকিৎসা দশ টাকায় হয়ে যাবে। এর অর্থ হলো, প্রত্যেকের নিয়মিত ছোট অবদান একত্র হয়ে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। আজ যিনি সুস্থ অবস্থায় অবদান রাখছেন, আগামীকাল তাঁর নিজের পরিবারও এই সুরক্ষার প্রয়োজন অনুভব করতে পারে।
ছোট অবদান, বড় সম্ভাবনা : ধরা যাক, পাঁচ কোটি মানুষ মাসে দশ টাকা করে জমা দিলেন। তাহলে মাসে সংগ্রহ হবে পঞ্চাশ কোটি টাকা, বছরে ছয়শ কোটি টাকা। দশ কোটি মানুষ অংশ নিলে বছরে সংগ্রহ হবে এক হাজার দুইশ কোটি টাকা। এগুলো সম্ভাব্য অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সরল হিসাব; সংগ্রহ ও পরিচালনার খরচ বাদ দেওয়ার আগের অঙ্ক। এই অর্থ দেশের সব ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট হবে কি না, তা নির্ধারণে রোগীর সংখ্যা, চিকিৎসার প্রয়োজন ও প্রকৃত খরচের বিস্তারিত হিসাব করতে হবে। তবে এটি একটি অর্থবহ সূচনা হতে পারে-বিশেষত এর সঙ্গে নিয়মিত সরকারি বরাদ্দ যুক্ত হলে। সচ্ছল নাগরিকদের অতিরিক্ত অনুদান, প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ এবং অন্যান্য স্বচ্ছ অনুদানও তহবিলে যুক্ত হতে পারে। কিন্তু তহবিলের স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জনগণের নিয়মিত অংশগ্রহণ ও সরকারের নিশ্চিত আর্থিক দায়িত্ব।
সরকারের দায়িত্ব কমবে না : জনগণের কাছ থেকে দশ টাকা সংগ্রহের প্রস্তাব দিয়ে সরকারকে চিকিৎসার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া যাবে না। সরকারি হাসপাতাল, জনবল, যন্ত্রপাতি, মানসম্মত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। সরকার চাইলে জনগণের সংগৃহীত অর্থের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ যোগ করার নীতি গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অবদান সরকারের পক্ষ থেকে বহন করা যেতে পারে। শিশু, কর্মহীন ব্যক্তি কিংবা অবদান দিতে অক্ষম কেউ যেন চিকিৎসার অধিকার থেকে বাদ না পড়েন।
এই ব্যবস্থার নীতি হওয়া উচিত: সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান, চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা। অর্থ সংগ্রহের জন্য মোবাইল আর্থিক সেবা, ব্যাংক বা মোবাইল বিলের ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে স্বেচ্ছা অবদানে স্পষ্ট সম্মতি থাকতে হবে। বাধ্যতামূলক অবদান চালু করতে হলে প্রয়োজন হবে আইন, জনপরামর্শ ও জবাবদিহি। একজনের একাধিক সিম থাকলে যেন একাধিকবার টাকা কাটা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
তহবিল থেকে রোগীর চিকিৎসা পর্যন্ত শুধু অর্থ জমা করলেই হবে না; রোগী কীভাবে সহায়তা পাবেন, তা সহজ ও পরিষ্কার করতে হবে। রোগ নির্ণয়, পরিবারের আর্থিক অবস্থা এবং চিকিৎসার প্রয়োজন যাচাই করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। সহায়তা পেতে রোগীকে বারবার দপ্তরে ঘুরতে হলে উদ্যোগটির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। প্রথম পর্যায়ে দরিদ্র ও আর্থিকভাবে বিপন্ন পরিবারকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন ও উপশমমূলক চিকিৎসার নির্ধারিত ব্যয় বহন করা যেতে পারে। সক্ষমতা বাড়লে সুরক্ষার পরিধিও বাড়াতে হবে।
ব্যয়বহুল ওষুধের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন জরুরি। রোগীর জন্য প্রমাণিত উপকার, নিরাপত্তা ও খরচ বিবেচনা করে তহবিলের আওতাভুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে ওষুধ কেনা ও প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে মূল্য নিয়ে আলোচনা করলে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রতিটি ক্রয়ে মান যাচাই ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রোগীকে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের মধ্যে নিজে নিজে পথ খুঁজতে না দিয়ে সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে সেবা বাড়ালে দূরের রোগীদের যাতায়াত ও থাকার বোঝা কমানো সম্ভব হবে।
বিশ্বাস ছাড়া তহবিল টিকবে না : মানুষ দশ টাকা দিতে আপত্তি নাও করতে পারেন; তাঁদের প্রশ্ন হবে, সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে? তাই শুরু থেকেই তহবিলের আয়-ব্যয়, সহায়তাপ্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা এবং সেবার ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রেখে নিয়মিত প্রতিবেদন দিতে হবে। প্রতিবছর স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনার তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত।
তহবিল পরিচালনায় চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং রোগীদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের বদলে প্রকাশিত নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা দিতে হবে। প্রয়োজনে একটি জবাবদিহিমূলক ‘বাংলাদেশ ক্যানসার কেয়ার এজেন্সি’ গঠন করে তহবিল, চিকিৎসাসেবা ও জাতীয় পরিকল্পনার সমন্বয় করা যেতে পারে। তবে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির সাফল্য বিচার করতে হবে রোগী কত দ্রুত, কত ভালো এবং কত কম ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসা পাচ্ছেনÑতার ভিত্তিতে।
মোহাম্মদ ইছহাক এর পরিবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিয়মিত আয় থাকলেই বড় অসুখের বিরুদ্ধে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। ক্যানসারের সামনে একটি পরিবারের সারা জীবনের সঞ্চয়ও অপ্রতুল হয়ে যেতে পারে। সরকারকে তাই এগিয়ে আসতে হবে নিশ্চিত বরাদ্দ ও কার্যকর সেবা নিয়ে। জনগণ এগিয়ে আসবেন নিয়মিত ছোট অবদান নিয়ে। এই যৌথ দায়িত্বই ‘১০ টাকায় ক্যানসারের চিকিৎসা’ উদ্যোগকে একটি স্লোগান থেকে বাস্তব সুরক্ষায় পরিণত করতে পারে।
আমাদের লক্ষ্য হোক-ক্যানসার ধরা পড়ার পর একটি পরিবার প্রথমে চিকিৎসার কথা ভাববে; চিকিৎসার টাকা কোথায় পাবে, সেই আতঙ্কে ভেঙে পড়বে না।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর


















