অধ্যাপক (ডা.) মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী ইদানীং অল্প ও মাঝারি বয়সী, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। কোনো তরতাজা তরুণ হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কিংবা স্ট্রোকে মারা গেলে কয়েক দিনের জন্য আমরা শোকাহত হই।
কিন্তু এরপর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। প্রশ্ন হলো- এসব অকালমৃত্যুর পেছনে থাকা কারণগুলো নিয়ে আমরা কতটা ভাবছি? বিশেষ করে রক্ত জমাট বাঁধার একটি জটিল অবস্থা থ্রোম্বসিস সম্পর্কে আমরা কতটা সচেতন?
থ্রোম্বসিস হলো রক্তনালির ভেতরে অস্বাভাবিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধার অবস্থা। রক্ত জমাট বাঁধা শরীরের স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় একটি প্রক্রিয়া। কোথাও কেটে গেলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে প্লেটলেট ও প্লাজমায় থাকা বিভিন্ন ক্লটিং ফ্যাক্টর কাজ করে। কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে রক্তনালির ভেতরে জমাট বাঁধলে তা মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে। হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও ব্রেন স্ট্রোকসহ আকস্মিক মৃত্যুর সঙ্গে থ্রোম্বসিসের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রতি চারজনের একজনের মৃত্যুর সঙ্গে থ্রোম্বসিস-সম্পর্কিত রোগের যোগসূত্র রয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। পারিবারিক ইতিহাসের পাশাপাশি স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা, ঘন ঘন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, সাম্প্রতিক বড় ধরনের অস্ত্রোপচার এবং নারীদের ক্ষেত্রে কিছু হরমোনাল চিকিৎসা বা জন্মনিরোধক বড়ি ব্যবহারের মতো বিষয় থ্রোম্বসিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
থ্রোম্বসিস দুই ধরনের : থ্রোম্বসিস প্রধানত দুই ধরনের। শিরাসংশ্লিষ্ট এবং ধমনীসংশ্লিষ্ট। শিরাসংশ্লিষ্ট থ্রোম্বসিসের মধ্যে রয়েছে ডিপ ভেইন থ্রোম্বসিস (ডিভিটি) এবং পালমোনারি এম্বোলিজম। ডিভিটিতে সাধারণত পা বা শরীরের কোনো অংশের গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধে। আক্রান্ত পা বা অঙ্গ অকারণে ফুলে যাওয়া, ব্যথা, লালচে হয়ে যাওয়া, খিঁচ ধরে থাকা কিংবা ওই অংশে অস্বাভাবিক তাপ অনুভূত হওয়া এর সম্ভাব্য লক্ষণ। ডিভিটির সবচেয়ে ভয়াবহ জটিলতাগুলোর একটি হলো পালমোনারি এম্বোলিজম।
ডিপ ভেইন থেকে রক্তের জমাট অংশ ছুটে গিয়ে ফুসফুসের রক্তনালিতে আটকে গেলে এ অবস্থা তৈরি হতে পারে। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা এবং হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এটি একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে ধমনীসংশ্লিষ্ট থ্রোম্বসিসের সঙ্গে করোনারি আর্টারি ডিজিজ ও হার্ট অ্যাটাক, ব্রেন স্ট্রোক এবং পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজের মতো গুরুতর রোগের সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা এসব রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। তবে সব ক্ষেত্রে একটি মাত্র কারণ দায়ী থাকে না।
কীভাবে শনাক্ত করা হয় : থ্রোম্বসিস শনাক্ত করতে রোগীর বর্তমান ও অতীত রোগের ইতিহাস, পারিবারিক ইতিহাস এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের সাধারণ পরীক্ষা, সিবিসি, পিটি, এপিটিটি ও ডি-ডাইমার পরীক্ষা করা হতে পারে। আক্রান্ত অঙ্গের ডুপ্লেক্স আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন ইমেজিং পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। পালমোনারি এম্বোলিজমের ক্ষেত্রে সিটি পালমোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাম, ভি/কিউ স্ক্যান, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রামসহ অন্যান্য পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করা হয়।
চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ : থ্রোম্বসিসের চিকিৎসায় প্রথমেই সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে রক্ত জমাট প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট বা ‘ব্লাড থিনার’ ব্যবহার করা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কম্প্রেশন ইলাস্টিক স্টকিংস, যান্ত্রিকভাবে থ্রম্বাস অপসারণ বা বিশেষ পদ্ধতিতে রক্ত জমাট সরানোর চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে। তবে থ্রোম্বসিস শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল এবং সব জায়গায় সহজলভ্য নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এর চিকিৎসা আরও কঠিন। তাই ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সুখবর হলো- অনেক ক্ষেত্রেই থ্রোম্বসিস প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম, দীর্ঘ সময় একটানা বসে বা স্থির অবস্থায় না থাকা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং ধূমপান পরিহার করা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি। বিশেষ করে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সময় রক্ত জমাট প্রতিরোধের প্রয়োজন আছে কি না, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সচেতনতা প্রয়োজন : নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে থ্রোম্বসিসের ঝুঁকি পরিবর্তিত হতে পারে। গর্ভাবস্থা, সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়, কিছু হরমোনাল চিকিৎসা এবং জন্মনিরোধক বড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এসব পরিস্থিতিতে নিজের ব্যক্তিগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
থ্রোম্বসিস সম্পর্কে সচেতনতা কোনো একটি দিবসের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে হবে, সম্ভাব্য লক্ষণগুলো চিনতে হবে, দীর্ঘ সময় স্থির থাকা এড়িয়ে চলতে হবে এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি বা বড় অস্ত্রোপচারের সময় রক্ত জমাট প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং ভেনাস থ্রোম্বো-এম্বোলিজমের মতো গুরুতর অবস্থার সঙ্গে থ্রোম্বসিসের সম্পর্ক আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কারণ থ্রোম্বসিস সম্পর্কে জানা মানে শুধু একটি রোগ সম্পর্কে জানা নয়; এটি নিজের এবং প্রিয়জনের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় একটি সচেতনতা।
থ্রোম্বসিসকে জানুন, ঝুঁকি চিনুন, সচেতন থাকুন- প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
অধ্যাপক (ডা.) মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, হেমাটোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
পূর্বকোণ/পল্লবী



















