চট্টগ্রাম সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

ব্যথার ওষুধে লুকিয়ে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতেক্রিয়া

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

ব্যথার ওষুধে লুকিয়ে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

স্বাস্থ্য ডেস্ক

১২ অক্টোবর, ২০২৬ | ১২:২৮ অপরাহ্ণ

সম্ভবত ৬-৭ মিলিয়ন বছর আগে মানুষের সৃষ্টি, আর সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের অনুভূতিগুলো একে একে প্রকাশ পেতে থাকে। তারই মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকা নিয়ে রয়েছে ব্যথা। খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে পায়ে কিংবা হাঁটুতে ব্যথা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে মারামারিতে চোট লাগা কিংবা অন্য কোনো কারণে আঘাত লাগা, যাই হোক না কেন এর উৎপত্তি কিন্তু বহু বছর আগেই।

 

পুরনো দিনের বিভিন্ন বই ঘেঁটে জানা যায় শরীরের ব্যথা কমানোর জন্য বিভিন্ন ওষুধ গাছগাছড়া বা জড়িবুটি থেকে তৈরি হতো। পিরামিডের যুগেও পেট এবং শরীরের অন্যান্য অংশের ব্যথার চিকিৎসার নানা খবরাখবর পাওয়া যায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী এলোপ্যাথি বিজ্ঞানে ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে সফলতা আসে ১৭৬৪ সালের পরে, যে সময় এডওয়ার্ড স্টোন উইলো গাছের ছাল থেকে ম্যালেরিয়ার ওষুধ আবিষ্কার করেন। এই স্যালিসাইলিক এসিডই সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যবহার করা হয় ব্যথা কমানোর জন্য। এ জন্য জার্মানিতে সর্বপ্রথম এসপিরিন ওষুধের ব্যবহার শুরু হয়। আর এখনকার সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য ওষুধ হলো ননস্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস (এনএসএআইডি), যা কিনা এল ১৯৭০-৮০-র মধ্যে। এই এনএসএআইডি-এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি রিউম্যাটয়েড আর্থরাইটিস এবং অস্টিও-আর্থরাইটিসে। এই ওষুধ যদি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ব্যবহার করা হয় তাহলে জয়েন্টের বিভিন্ন রোগে বিশেষ উপকার মেলে।

 

ব্যথার ওষুধে ক্ষতি
প্রথম ও প্রধান ক্ষতি হলো এই ওষুধগুলো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টের মিউকোসায় (ঝিল্লিতে) ইরোশন, আলসার, ব্লিডিং, স্ট্রিকচার এবং পারফোরেশন করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এসব ওষুধ লিভারের ইনজুরি করে হেপাটাইটিস ঘটাতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি করে প্যানক্রিয়টাইটিস বাধাতে পারে। কিডনির ক্ষেত্রে ক্ষতিটা আরও মারাত্মক। হঠাৎ করে রোগীর রেনাল ফেলিউর হতে পারে।

 

কীভাবে পেটের ক্ষতি করে?
এরা সরাসরি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টের মিউকোসার স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জিআই মিউকোসার সেলের মধ্যে থাকা সাইক্লোঅক্সিজিনেজ এনজাইমকে প্রভাবিত করে প্রস্টাগ্লান্ডিন তৈরি বন্ধ করে দেয়। ফলে জিআই মিউকোসার রক্ত সঞ্চালনে গণ্ডগোল, মিউকোসার ক্ষত ইত্যাদি তৈরি হয়।

 

কাদের বেশি ক্ষতি?
প্রবীণ মানুষ: এদের বিভিন্ন ধরনের রোগ লেগেই থাকে। এই বয়সে জয়েন্টে ব্যথা বাড়ে, তার জন্য ওষুধও বেশি খান। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাও এই বয়সে কমে যায় আর এর ফলে ক্ষতি আরও বেশি হয়।

মহিলা: মহিলাদের বিভিন্ন সন্ধিস্থলে ব্যথা-বেদনা বেশি হয়। মাথাব্যথা এবং পিরিয়ডের সময় ব্যথা বেশি হয় বলে ব্যথার ওষুধ সেবনের পরিমাণও বেড়ে যায়। যার ফলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়ে।

 

এনএসএআইডি-এর উচ্চ বা অতিরিক্ত মাত্রা: অনেকেই আছেন কোনো কারণ ছাড়াই মুড়ি-মুড়কির মতো ব্যথার ওষুধ খান, যা কিনা খুবই সহজলভ্য। যার আগে থেকেই পেপটিক আলসার আছে: তারা ব্যথার ওষুধ খেলে এই আলসার আরও বেড়ে যায়। এর ফলে অনেক সময় ব্লিডিং পর্যন্ত হয়। যাদের আলসারের পুরনো ইতিহাস আছে: ব্যথার ওষুধ খেলে তাদের আলসার আরও বেড়ে যায়।

 

অন্যান্য ওষুধ সেবনকারী: যারা অন্য কোনো কারণে স্টেরয়েড খাচ্ছেন কিংবা এন্টিকোয়াগুলেন্ট ওষুধ খাচ্ছেন, তারা একই সঙ্গে ব্যথার ওষুধ খেলে আলসার হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

 

ধূমপায়ী ও মদ্যপায়ী: যারা ধূমপান বা মদ্যপান করেন, তারা যদি ব্যথার ওষুধ খান, তাহলে তাদের আলসার হয়ে থাকলে তা আরও বেড়ে যায়।

 

এইচ পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত: যাদের পাকস্থলীতে এইচ পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে, তাদের ব্যথার ওষুধ খেলে পরিণাম হয় মারাত্মক।

 

কোন ওষুধে কতটা বিপদ?
সাধারণ জ্বরের ওষুধ প্যারাসিটামলও ব্যথা কমায়, তবে হালকা ব্যথায় কাজ করে। এটা খেলে পেটের অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা তেমন থাকে না। এনএসএআইডি গ্রুপের মধ্যে যে ওষুধ সবচেয়ে কম আলসারের কষ্ট দেয় তা হলো আইবুপ্রফেন এবং ডাইক্লোফেনাক। এই দুটো ওষুধ খেলেও ক্ষতির মাত্রা তেমন নয়। সরাসরি ক্ষতি করে ইন্ডোমেথাসিন। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে কেটোপ্রোফেন। কয়েক বছর আগে কিছু ব্যথার ওষুধ বাজারে এসেছিল যা পাকস্থলীর খুব কম ক্ষতি করে, অর্থাৎ আইবুপ্রফেনের থেকেও ভালো মনে করা হতো। কিন্তু কিছু ওষুধ খাওয়ার ফলে দেখা গেল হার্টের ক্ষতি হচ্ছে, তাই সারা পৃথিবীতে এদের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং, সমস্যাটা কোথায় জানতে পারলেন এবং বুঝতেও পারলেন, তাই ওষুধ কিনুন অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে।

 

তাহলে ব্যথা হলে কী করবেন?
সময়ের অপেক্ষা না করে রোগটাকে না বাড়তে দিয়ে নিকটবর্তী ডাক্তারবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দরকার পুরনো অর্থাৎ মান্ধাতা আমলের ধ্যান-ধারণার আমূল পরিবর্তন। সহজলভ্য স্টেশনারি দোকান থেকে ডাক্তারবাবুর পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ না কেনা। আবার ব্যথা কমছে না বলে অনেক ধরনের ব্যথার ওষুধ একসঙ্গে খাওয়াও একেবারেই চলবে না। ধূমপান ও মদ্যপান একেবারেই বন্ধ, যদি বাঁচতে চান। আর খালি পেটে ব্যথার ওষুধ না খাওয়াই ভালো। ব্যথার ওষুধ খাওয়ার সঙ্গে আমরা অ্যান্টাসিড জাতীয় যেসব ওষুধ খাই সেগুলোর তেমন কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। পেটের ব্যথা কমানোর জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিয়ে তবেই ব্যথার ওষুধ খেতে হবে। যখন মানব-মানবীর জন্ম তখন থেকেই পেট সঙ্গে ছিল অর্থাৎ ৬ মিলিয়ন বছর আগে থেকে পেট আমাদের দেহের সঙ্গী। আর ব্যথার ওষুধের জন্ম মাত্র ২৬০ বছর। তাই পেটও থাকবে, ব্যথাও থাকবে। সেই ব্যথাকে কমাতে হবে বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনেই।

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন