চট্টগ্রাম সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

সপ্তাহে একদিন রান্নাঘরে যান, কমে যাবে বার্ধক্যের ভয়ংকর রোগের ঝুঁকি!

সপ্তাহে একদিন রান্নাঘরে যান, কমে যাবে বার্ধক্যের ভয়ংকর রোগের ঝুঁকি!

স্বাস্থ্য ডেস্ক

১২ অক্টোবর, ২০২৬ | ১২:১৩ অপরাহ্ণ

বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি ধরে রাখবেন কী করে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে জাপানের একটি গবেষণা নজর দিল এমন এক দৈনন্দিন কাজের দিকে, যা আমরা প্রায়ই গুরুত্বই দিই না, রান্না।

 

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে যারা সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়িতে রান্না করতেন, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম। জার্নাল অব এপিডেমিওলজি এন্ড কমিউনিটি হেলথ-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ১০,৯৭৮ জন প্রবীণকে প্রায় ৬ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের মধ্যে ১১৯৫ জনের এমন ডিমেনশিয়া ধরা পড়ে, যার জন্য তাদের পরিচর্যার প্রয়োজন ছিল।

 

গবেষণায় কী মিলল?
গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের রান্নার অভ্যাস ও রান্নার দক্ষতার তথ্য নেন। পরে জাপানের স্বাস্থ্যবিমার নথি থেকে ডিমেনশিয়ার ঘটনাগুলি চিহ্নিত করা হয়। বয়স, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যের মতো বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণের পর দেখা যায়, সপ্তাহে অন্তত একবার রান্না করা পুরুষদের মধ্যে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি সপ্তাহে একবারেরও কম রান্না করা পুরুষদের তুলনায় ২৩ শতাংশ কম। মহিলাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি ২৭ শতাংশ কম ছিল। আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। যারা নিজেদের রান্নায় খুব একটা দক্ষ মনে করতেন না, তাদের মধ্যেও যারা বেশি বার রান্না করতেন, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীতে ঝুঁকি কমার হার ছিল প্রায় ৬৭ শতাংশ। তবে এর অর্থ এই নয় যে ডিমেনশিয়া ঠেকাতে রান্নায় পটু হওয়া জরুরি।

 

রান্না মস্তিষ্ককে কীভাবে সক্রিয় রাখে?
রান্না মানে শুধু খাবার তৈরি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মস্তিষ্কের একাধিক কাজ। কী রান্না হবে ঠিক করা, বাজারের তালিকা তৈরি, উপকরণ মনে রাখা, একাধিক ধাপের পরিকল্পনা, মাপ নেওয়া, সময়ের হিসাব রাখা এবং রান্নার মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বদলানো, সবই মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।

 

রেসিপি পড়তে মনোযোগ ও বোঝার ক্ষমতা লাগে। কাটাকাটি বা কড়াইয়ে নাড়াচাড়ায় হাত-চোখের সমন্বয় প্রয়োজন হয়। আবার রান্নার সময় খাবারের গন্ধ, রং, তাপমাত্রা ও সময়ের দিকে নজর রাখতে হয়। রান্নার সঙ্গে খাবারের মানেরও সম্পর্ক থাকতে পারে। বাড়িতে রান্না করলে কী খাচ্ছেন, তার উপর নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকে। ফলে শাকসবজি, ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত নুন, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো সহজ হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রান্না বা একসঙ্গে বসে খাওয়ার ফলে সামাজিক যোগাযোগও বাড়ে।

 

তবে কি রান্না করলেই ডিমেনশিয়া ঠেকানো যাবে?
না, এমন দাবি করার মতো প্রমাণ এই গবেষণায় নেই। কারণ এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। অর্থাৎ, রান্নার অভ্যাস ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু রান্না করাই যে ঝুঁকি কমিয়েছে, তা প্রমাণিত হয়নি। সম্পর্কটি উল্টোদিক থেকেও হতে পারে। ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা কোনো ব্যক্তি হয়তো উপকরণ ভুলে যাচ্ছেন, রান্নার একাধিক ধাপ অনুসরণ করতে অসুবিধা হচ্ছে বা গ্যাস ওভেন ব্যবহারে ভয় পাচ্ছেন। ফলে তিনি ধীরে ধীরে রান্না বন্ধ করে দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে রান্নায় অনীহা ডিমেনশিয়ার কারণ নয়, বরং প্রাথমিক পরিবর্তনের একটি লক্ষণ হতে পারে।

 

এ ছাড়া গবেষণার শুরুতে একবারই রান্নার অভ্যাসের তথ্য নেওয়া হয়েছিল। ৬ বছর ধরে সেই অভ্যাস একই ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। তাই তুলনামূলক মৃদু স্মৃতিশক্তির সমস্যা এতে ধরা না-ও পড়তে পারে। রান্নাকে ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের কোনো ‘ওষুধ’ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক ভাবে সক্রিয় থাকা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকে রান্না হতে পারে একটি সহজ ও আনন্দদায়ক দৈনন্দিন অভ্যাস।

 

বাজারের তালিকা তৈরি, উপকরণ বাছাই, রান্না এবং পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া, একটি সাধারণ রান্নার মধ্যেই মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা, কিছুটা শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগ, তিনটিই একসঙ্গে হতে পারে। সপ্তাহে একদিন রান্না করলেই ডিমেনশিয়া থেকে সুরক্ষা মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে গবেষণাটি দেখাচ্ছে, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার কিছু সুযোগ হয়তো আমাদের একেবারে ঘরোয়া, প্রতিদিনের কাজের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে।

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন