চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্তন ক্যানসার: অক্টোবরের সচেতনতা থেকে জাতীয় কর্মসূচিতে যেতে হবে

স্তন ক্যানসার: অক্টোবরের সচেতনতা থেকে জাতীয় কর্মসূচিতে যেতে হবে

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

৯ অক্টোবর, ২০২৬ | ৩:৪০ অপরাহ্ণ

অক্টোবর এলেই স্তন ক্যানসার নিয়ে আলোচনা বাড়ে। গোলাপি রঙে সাজানো হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আয়োজন করা হয় সভা, শোভাযাত্রা ও সেমিনার। চিকিৎসকেরা গণমাধ্যমে কথা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু অক্টোবর শেষ হওয়ার পর একজন নারী তাঁর স্তনে চাকা অনুভব করলে কোথায় যাবেন, কত দিনে পরীক্ষা করাতে পারবেন এবং চিকিৎসার খরচ কীভাবে বহন করবেন-এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও আমাদের দিতে হবে।
 
স্তন ক্যানসার কেবল অক্টোবরের বিষয় নয়। তাই সচেতনতার সাফল্য বিচার করতে হবে বছরজুড়ে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগ দিয়ে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একজন নারী তাঁর আর্থিক অবস্থা বা বাসস্থানের কারণে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল ব্রেস্ট ক্যানসার ইনিশিয়েটিভ তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়: প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণের জন্য সচেতনতা, সময়মতো রোগনির্ণয় এবং সমন্বিত চিকিৎসা। বাংলাদেশের কর্মপরিকল্পনাতেও এই ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। সচেতন হয়ে চিকিৎসকের কাছে আসার পর পরীক্ষা ও চিকিৎসার পথ বন্ধ থাকলে প্রচারের সুফল সীমিত হয়ে যায়।
 
সচেতনতার সঙ্গে সেবার ঠিকানা দিন : প্রতিটি সচেতনতামূলক আয়োজনে স্থানীয় সেবার তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। কোথায় চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়া যাবে, কোথায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা হয়, কীভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে এবং খরচ কত-এসব তথ্য সহজ বাংলায় জানাতে হবে। শুধু “দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান” বললে দায়িত্ব শেষ হয় না; রোগীর পক্ষে সেই পরামর্শ অনুসরণ করা সম্ভব কি না, তা দেখতে হবে। এখানে স্ক্রিনিং ও উপসর্গের মূল্যায়নের পার্থক্য বোঝানো জরুরি। স্ক্রিনিং হলো উপসর্গহীন মানুষের মধ্যে নির্ধারিত নিয়মে পরীক্ষা করা। অন্যদিকে স্তনে নতুন চাকা বা সন্দেহজনক পরিবর্তন দেখা দিলে প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন। বয়সভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের সময় হয়নি বলে উপসর্গের পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
 
ম্যামোগ্রাম কখন শুরু হবে এবং কত দিন পরপর করা হবে, সে বিষয়ে বয়স, ব্যক্তিগত ঝুঁকি ও দেশের সক্ষমতা বিবেচনায় একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নির্দেশিকা প্রয়োজন। সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় উপসর্গযুক্ত নারীদের দ্রুত রোগনির্ণয়ের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধাপে ধাপে মানসম্মত স্ক্রিনিং কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও নিজেদের এবং পরিবারের নারীদের স্তনস্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে। অন্যকে সচেতন করার সঙ্গে নিজের বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
 
উপজেলা পর্যায়ে সেবার পথ তৈরি করুন : আমার প্রস্তাব, ভৌগোলিক দূরত্ব, জনসংখ্যা ও যাতায়াতব্যবস্থা বিবেচনায় প্রতি চারটি উপজেলা নিয়ে একটি স্তনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক রোগনির্ণয় কেন্দ্র পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী কেন্দ্রের আওতা ছোট বা বড় হবে। উদ্দেশ্য হলো নারীদের কাছাকাছি একটি নির্ভরযোগ্য সেবার ঠিকানা তৈরি করা। এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মূল্যায়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসনোগ্রাম ও ম্যামোগ্রামের ব্যবস্থা অথবা নির্ধারিত কেন্দ্রে দ্রুত পাঠানোর সুযোগ থাকতে হবে। সন্দেহজনক ক্ষেত্রে বায়োপসি ও প্যাথলজি পরীক্ষার সঙ্গে সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় পাঠানো হলো, রোগী সেখানে পৌঁছালেন কি না এবং ফলাফল পেলেন কি না-তা অনুসরণের দায়িত্বও নির্দিষ্ট করতে হবে।
 
শুধু একটি ম্যামোগ্রাম যন্ত্র কিনলেই পূর্ণাঙ্গ সেবা তৈরি হয় না। প্রশিক্ষিত জনবল, মানসম্মত ছবি, নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরবর্তী পরীক্ষার ব্যবস্থা একই পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। রোগীর স্বাচ্ছন্দ্য ও গোপনীয়তার জন্য প্রশিক্ষিত নারী রেডিওগ্রাফার ও নার্সের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি স্তনরোগে দক্ষ সার্জন এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ ও পদায়নের পরিকল্পনা নিতে হবে। ডিজিটাল ম্যামোগ্রামের ছবি সংরক্ষণ ও দূরবর্তী বিশেষজ্ঞের মতামতের জন্য PACS-ডিজিটাল মেডিকেল ছবি সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের ব্যবস্থা-ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এর সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তা, রিপোর্ট দেওয়ার সময়সীমা এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
 
রোগনির্ণয়ের পর চিকিৎসা নিশ্চিত করুন : রোগ শনাক্ত হওয়ার পর একজন নারী যেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে না থাকেন। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বিশেষায়িত হাসপাতালের নির্ধারিত রেফারেলব্যবস্থা প্রয়োজন। রোগীকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, পরীক্ষার ফল ও চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী রাখা যেতে পারে।
 
স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি এবং ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত সিদ্ধান্ত ও চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়াকে কর্মসূচির শেষ ধাপ হিসেবে ধরা যাবে না। রোগী চিকিৎসা শুরু করতে পারলেন কি না, মাঝপথে বন্ধ করতে হলো কি না এবং চিকিৎসার পর প্রয়োজনীয় অনুসরণ পাচ্ছেন কি না-এসবও দেখতে হবে।
 
অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হওয়া ঠেকান : স্তন ক্যানসারের আর্থিক বোঝায় পরীক্ষার বিলের পাশাপাশি যাতায়াত, থাকা, আয় হারানো এবং পরিবারের পরিচর্যার ব্যয়ও যুক্ত হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় একটি নির্দিষ্ট স্তনস্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি বা “ব্রেস্ট হেলথ বেনিফিট” চালুর প্রস্তাব করছি। এর আওতায় দরিদ্র ও অসচ্ছল নারীদের প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা বিনা মূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। অন্যদের জন্য আয়ভিত্তিক সহায়তা বিবেচনা করা যেতে পারে। যোগ্যতা নির্ধারণ ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ এবং সময়বদ্ধ হতে হবে। সহায়তা পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক দৌড়ঝাঁপ করতে হলে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি দাতব্য সংস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার তহবিলকে সমন্বিত কাঠামোয় যুক্ত করা যেতে পারে। তবে অনুদাননির্ভর বিচ্ছিন্ন আয়োজনের পরিবর্তে নিয়মিত অর্থায়ন এবং প্রকাশ্য হিসাবের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
 
ঘোষণার সঙ্গে জবাবদিহি চাই : একটি জাতীয় স্তন ক্যানসার সেবা কর্মসূচির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন, নারীদের সংগঠন এবং রোগী প্রতিনিধিদের নিয়ে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা করতে হবে। কোথায় কী সেবা আছে, কোথায় ঘাটতি, কত জনবল ও অর্থ প্রয়োজন-তার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। প্রথমে কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়ে ফলাফল মূল্যায়ন করা যেতে পারে। একজন রোগীর প্রথম যোগাযোগ থেকে রোগনির্ণয় পর্যন্ত সময়, চিকিৎসা শুরু হওয়ার সময়, চিকিৎসা সম্পন্ন করার হার এবং রোগীর নিজস্ব ব্যয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ফলাফল প্রকাশ করতে হবে, যাতে অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা দুটিই বোঝা যায়। রাজনৈতিক অঙ্গীকারেও নির্দিষ্ট বরাদ্দ, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও দায়িত্ব থাকতে হবে। একই সঙ্গে রোগীদের অভিজ্ঞতা শুনতে হবে। সেবার কোন ধাপে তাঁরা আটকে যাচ্ছেন, তার উত্তর অনেক সময় তাঁদের কাছেই পাওয়া যায়।
 
এই অক্টোবরের প্রতিটি আলোচনা থেকে অন্তত একটি বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হোক-একটি সচল রোগনির্ণয় সেবা, একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, একটি কার্যকর রেফারেলপথ অথবা অসচ্ছল রোগীদের জন্য নিশ্চিত চিকিৎসা সহায়তা। সচেতনতার বার্তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন একজন নারী সেই বার্তা শুনে সেবা চাইতে এসে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাবেন। অক্টোবরের সচেতনতা থেকে তাই আমাদের পরবর্তী যাত্রা হওয়া উচিত একটি জাতীয় স্তন ক্যানসার সেবা কর্মসূচির দিকে।
 
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেন্ট জন রিজিওনাল হাসপাতাল, কানাডা; সহকারী অধ্যাপক, ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়।
 
পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট