বিশ্বে তরুণ ও কম বয়সিদের মধ্যে সাত ধরনের ক্যান্সারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে উঠে এসেছে এক নতুন গবেষণায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। ‘ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার রিসার্চ ফান্ড’ বা ডাব্লিউসিআরএফ-এর উদ্যোগে ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের ক্যান্সার ডেটা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য মিলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান। গবেষণায় দেখা গেছে, ইংল্যান্ডে সাত ধরনের, যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ ধরনের ও নেদারল্যান্ডসে চার ধরনের প্রাথমিক বা কম বয়সে হওয়ার মতো ক্যান্সার ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ বেড়েছে। বিশ্বজুড়ে সব বয়সি মানুষের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বাড়লেও পঞ্চাশ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে বৃদ্ধির হার অন্যান্য বয়সের তুলনায় বেশি। -।বিডিনিউজ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিসংখ্যানের পেছনে বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত স্থূলতা মহামারি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের মতো বিষয় দায়ী। ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ও এর একটি কারণ। গবেষকরা বলেছেন, পঞ্চাশ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে ক্যান্সার এখনও বিরল ও সাধারণত ৬০ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যেই এটা বেশি দেখা যায়। তবে এ নতুন প্রবণতা উদ্বেগজনক।
‘কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্ট’-এর ডিজিটাল হেলথ ও ট্রান্সলেশনাল ক্যান্সার জিনোমিকস বিভাগের অধ্যাপক মার্ক ললার বলেছেন, সমস্যাটি ‘একটি টাইম বোমার মতো, যা আমাদের যত দ্রুত সম্ভব নিষ্ক্রিয় করতে হবে। অন্যথায় এ সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই বাড়তে থাকবে। ‘সার্বিক এ প্রবণতা আশঙ্কাজনক। কারণ জীবনযাত্রার বিভিন্ন অভ্যাসের কারণে এরইমধ্যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।’
ইংল্যান্ডে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১২ ধরনের টিউমারের মধ্যে ২০০১ সাল থেকে ৫০ বছরের কম বয়সি পুরুষদের মধ্যে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্তের হার প্রায় চার গুণ হয়েছে। ২০০১ সালে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ১ জনের প্রোস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়লেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে তিন দশমিক ছয় জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে, ৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে অন্ত্রের ক্যান্সারের হার ২০০১ সালের প্রতি লাখে ৩ দশমিক ৯ জন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৮ দশমিক ৪ জনে পৌঁছেছে। এ ছাড়া, জরায়ু ও কিডনি ক্যান্সারের হারও দ্বিগুণ হয়ে যথাক্রমে প্রতি লাখে ৩ দশমিক ৯ ও ৩ জনে দাঁড়িয়েছে। ৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের হার কিছুটা ধীরগতিতে বাড়লেও তা ২০০১ সালের প্রতি লাখে ৪২ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৪৭ দশমিক ৫ জনে উন্নীত হয়েছে। কম বয়সে অগ্ন্যাশয় ও লিভার ক্যান্সারে আক্রান্তের হারও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সাল থেকে সংগৃহীত সরকারি উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫০ বছরের কম বয়সি রোগীদের মধ্যে কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্তের হার দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০০০ সালে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে এই হার ২ দশমিক ৫ জন থাকলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৩ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে অন্ত্র, জরায়ু ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার ৫০ শতাংশের বেশি এবং স্তন ক্যান্সার প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রে গবেষকরা অন্ত্র, কিডনি, লিভার ও জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ ও প্রকোপ বাড়তে দেখেছেন। এর বিপরীতে, তিনটি দেশেই ৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের হার কমেছে, যা ওই দেশগুলোতে ধূমপান হ্রাসের ধারাবাহিক প্রবণতারই প্রতিফলন।
‘ওয়ার্ল্ড ক্যান্সার রিসার্চ ফান্ড’-এর গবেষণা ও নীতি বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ডা. জিওতা মিত্রিউ এ পরিস্থিতির গতিপথকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে এমন একজন ব্যক্তি রয়েছেন যিনি নিজের, পরিবারের ও প্রায়শই চিকিৎসকদের ধারণার চেয়ে কম বয়সে ক্যান্সারের মুখে পড়ছেন। বয়স্কদের মধ্যে ক্যান্সার এখনও বেশি দেখা গেলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তিত ধরনগুলোকে গুরুতর গবেষণা ও ক্যান্সার প্রতিরোধমূলক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা উচিত।
ডাব্লিউসিআরএফ বলেছে, ক্রমাগত স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, অ্যালকোহল সেবন, ধূমপান ও পরিবেশগত দূষণ, যেমন দূষিত পদার্থ, রাসায়নিক, প্লাস্টিক, পানি ও বায়ু দূষণ এই প্রবণতার জন্য দায়ী হতে পারে। প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যান্সার এ ধরনের পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। তবে ক্যান্সার বা এর লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ার কারণেও মানুষ এখন আরও দ্রুত রোগ নির্ণয় করাতে পারছে।
পূর্বকোণ/মিফতা


















