একজন রোগী যখন হাসপাতালের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন, আমরা সাধারণত ধরে নিই—এখন থেকেই তার চিকিৎসাযাত্রা শুরু হলো। কিন্তু বাস্তবতা এখন অনেকটাই ভিন্ন। চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করার মুহূর্ত থেকেই একজন মানুষের চিকিৎসাযাত্রা শুরু হয়। তিনি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন, পরিচিত কারও পরামর্শ নেন, গুগলে রোগের নাম খোঁজেন, চিকিৎসকের ভিডিও দেখেন, হাসপাতালের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য খোঁজেন, ফোন করে জানতে চান—কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন, কোথায় পরীক্ষা হবে, কখন সাক্ষাতের সময় পাওয়া যাবে।
অর্থাৎ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই একজন রোগী একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাসপাতালের সঙ্গে রোগীর প্রথম যোগাযোগ এখন সবসময় হাসপাতালের ভেতরে হয় না। অনেক সময় সেই প্রথম যোগাযোগ হয় একটি মুঠোফোনের পর্দায়।
হাসপাতালের প্রথম দরজা কি এখন ডিজিটাল? আমার কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, একজন রোগী হাসপাতালকে যে মুহূর্তে প্রথমবার বিচার করেন, সেটি অনেক সময় অভ্যর্থনাকেন্দ্রে নয়—অনলাইনে। তিনি হয়তো একজন চিকিৎসকের নাম লিখে খুঁজছেন। হয়তো নির্দিষ্ট কোনো রোগের চিকিৎসা কোথায় হয়, তা জানতে চাইছেন। হয়তো হাসপাতালের জরুরি সেবা, চিকিৎসকের সময়সূচি, যোগাযোগ নম্বর কিংবা সাক্ষাতের পদ্ধতি জানতে চাইছেন।
সেই মুহূর্তে হাসপাতালের ওয়েবসাইট, গুগলের তথ্যভান্ডার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা একটি ফোনকল—সবকিছুই হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিচয়ের অংশ। এখানে ডিজিটাল যোগাযোগ আর প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কারণ একজন রোগীর কাছে ডিজিটাল অভিজ্ঞতাই অনেক সময় হাসপাতালের সঙ্গে সম্পর্কের প্রথম অভিজ্ঞতা। একটি ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হলে, ফোন করে সন্তোষজনক উত্তর না পেলে কিংবা চিকিৎসকের তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে রোগীর মনে হাসপাতাল সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হয়।
অন্যদিকে সঠিক তথ্য, সহজ যোগাযোগ ও পরিষ্কার নির্দেশনা তৈরি করতে পারে আস্থার ভিত্তি। মানুষ হাসপাতালের বিজ্ঞাপন দেখতে আসে না, নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আসে স্বাস্থ্যসেবার যোগাযোগ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয়কে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিই—আমরা কী বলতে চাই, তার চেয়ে রোগী কী জানতে চাইছেন সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ গুগলে ‘হৃদরোগের চিকিৎসা’ লিখে খুঁজলে এর পেছনে হয়তো আরও অনেক প্রশ্ন থাকে—বুকব্যথাকে কখন গুরুত্ব দিতে হবে? কখন জরুরি বিভাগে যেতে হবে? কোন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন? কী ধরনের পরীক্ষা হতে পারে? কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যায়? একইভাবে একজন কিডনি রোগী শুধু ‘ডায়ালাইসিস’ শব্দটি খুঁজছেন না। তিনি হয়তো জানতে চাইছেন—কখন ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়, কী ধরনের ডায়ালাইসিস আছে এবং কোথায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পাওয়া যায়।
একজন ক্যানসার রোগী হয়তো চিকিৎসার নামই জানেন না। তার প্রশ্ন হতে পারে—‘আমার জন্য কী করা যায়?’এখানেই স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের গুরুত্ব। আমার কাছে ভালো স্বাস্থ্যসেবা যোগাযোগের কাজ মানুষের ভয় বাড়ানো নয়; বরং তাঁর প্রশ্নগুলোকে সহজ ও পরিষ্কার করা। তথ্যের সহজলভ্যটাও রোগীর যত্নের অংশ। একটি হাসপাতালের চিকিৎসা সক্ষমতা যতই উন্নত হোক, মানুষ যদি প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে না পান, তাহলে সেই সক্ষমতার একটি অংশ তাঁর কাছে অদৃশ্য থেকে যায়।
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামে হৃদরোগ, ক্যানসার, স্নায়ুরোগ, কিডনি ও ডায়ালাইসিস, পরিপাকতন্ত্রের রোগ, শিশুদের হৃদরোগসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা রয়েছে। রয়েছে ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবাও। কিন্তু একজন রোগীর কাছে হাসপাতালের সক্ষমতার দীর্ঘ তালিকা সবসময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার প্রশ্ন অনেক ছোট— ‘আমার সমস্যার জন্য আমি কোথায় যাব?’
এই প্রশ্নের উত্তর যদি সহজভাবে দেওয়া যায়, সেটিই তাঁর জন্য বড় সেবা। তাই স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল যোগাযোগকে আমি শুধু প্রচার বা বিপণনের কাজ হিসেবে দেখি না। এটি রোগীর সেবার অভিজ্ঞতারও অংশ। একটি ফোনকলও হাসপাতালের প্রথম পরিচয় হতে পারে। ডিজিটাল যুগে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট কিংবা অনলাইনে তথ্য খোঁজার দিকে বেশি তাকাই। কিন্তু রোগীর জন্য একটি ফোনকল এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন তিনি নিজে অসুস্থ, উদ্বিগ্ন অথবা পরিবারের কোনো সদস্যকে নিয়ে চিন্তিত।
সেই সময়ে তিনি হয়তো জানতে চাইছেন—কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন, কখন দেখা যাবে, জরুরি অবস্থায় কোথায় যোগাযোগ করবেন। সেখানে একটি পরিষ্কার উত্তর শুধু তথ্য দেয় না; তৈরি করে মানসিক নিশ্চয়তাও। এ কারণেই হাসপাতালের ভাবমূর্তি শুধু বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার মাধ্যমে তৈরি হয় না। একটি বিজ্ঞাপন একটি প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। কিন্তু একটি ফোনকল, সাক্ষাতের সময় নেওয়ার অভিজ্ঞতা, অভ্যর্থনাকেন্দ্রের আচরণ কিংবা একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথোপকথন সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেয়।
পরিসংখ্যান বলে কী হচ্ছে, মানুষ বলে কেন হচ্ছে। আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বিপণনে পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কতজন ওয়েবসাইটে এলেন, কতজন ফোন করলেন, কতজন সাক্ষাতের সময় নিলেন, কোন ধরনের স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখা বা ভিডিও বেশি দেখা হলো—এসব তথ্য সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কিন্তু শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বাদ পড়ে যায়—
মানুষ কেন একটি নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজল? কেন একজন রোগী একটি জায়গায় গিয়ে থেমে গেলেন? কেন কেউ ফোন করলেন কিন্তু সাক্ষাতের সময় নিলেন না? কেন একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক ভিডিও অনেক মানুষ দেখলেন? পরিসংখ্যান আমাদের বলে কী ঘটছে। কিন্তু মানুষের আচরণ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন ঘটছে। স্বাস্থ্যসেবার কার্যকর ডিজিটাল পরিকল্পনা তৈরিতে এই দুইয়ের সমন্বয় জরুরি। রোগীর যাত্রা কোনো এক বিভাগের দায়িত্ব নয়। রোগীর চিকিৎসাযাত্রা কোনো একটি বিভাগের দায়িত্ব নয়।
প্রচার ও যোগাযোগ বিভাগ একটি বার্তা তৈরি করতে পারে। ডিজিটাল মাধ্যম সেই বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। চিকিৎসক চিকিৎসা দিতে পারেন। ফোনকেন্দ্র তথ্য দিতে পারে। অভ্যর্থনাকেন্দ্র রোগীকে স্বাগত জানাতে পারে। ব্যবস্থাপনা পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ করতে পারে। কিন্তু রোগী এগুলোকে আলাদা বিভাগ হিসেবে দেখেন না। তিনি দেখেন—হাসপাতাল তাঁকে কীভাবে সেবা দিল। এখানেই হাসপাতালের ভাবমূর্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ, জনসংযোগ, চিকিৎসাসেবা এবং রোগীর অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। তাই একটি ভালো হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—‘রোগীর জন্য আমরা আর কী সহজ করতে পারি?’ প্রশ্নটি ছোট। কিন্তু এর উত্তর খুঁজতে গেলে পুরো চিকিৎসাযাত্রা নিয়ে ভাবতে হয়।
আগামী দিনের হাসপাতাল আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে, কিন্তু আরও মানবিকও হতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, অনলাইনে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক যোগাযোগ—স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কিন্তু প্রযুক্তির সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেটি মানুষের কাজ সহজ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যোগাযোগ দ্রুত করতে পারবে। ডিজিটাল মাধ্যম রোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্য মুহূর্তে দিতে পারবে। কিন্তু একজন রোগীর ভয়, পরিবারের উদ্বেগ কিংবা কঠিন সময়ে একজন মানুষের পাশে থাকার প্রয়োজন—এসবের জায়গা প্রযুক্তি একা নিতে পারবে না। বরং প্রযুক্তি আমাদের মানুষের জন্য আরও বেশি সময় তৈরি করে দিতে পারে। এটাই ভবিষ্যতের বড় সুযোগ।
চিকিৎসাযাত্রার প্রথম ধাপ হয়তো হাসপাতাল নয় স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি হলো—রোগী হাসপাতালের দরজা দিয়ে আসার অনেক আগেই হাসপাতালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হতে শুরু করে। একটি অনলাইন অনুসন্ধান দিয়ে। একটি ওয়েবসাইট দেখা দিয়ে। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লেখা দিয়ে। একটি ফোনকল দিয়ে। অথবা কোনো একজন চিকিৎসকের সম্পর্কে পাওয়া একটি তথ্য দিয়ে। সেই প্রথম মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় আস্থার সম্পর্ক।
তাই আগামী দিনের হাসপাতালের সক্ষমতা শুধু কে কত আধুনিক চিকিৎসা দিতে পারে, তা দিয়ে বিবেচিত হবে না। গুরুত্বপূর্ণ হবে—কে রোগীকে সবচেয়ে সহজভাবে সঠিক তথ্য দিতে পারে, কে তাঁর চিকিৎসাযাত্রাকে কম জটিল করতে পারে এবং কে প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার কার্যকর সমন্বয় করতে পারে।
কারণ শেষ পর্যন্ত রোগী শুধু চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন না। তিনি আসেন ভরসা নিয়ে। আর সেই ভরসার যাত্রা অনেক সময় হাসপাতালের দরজায় নয়—তারও অনেক আগে শুরু হয়ে যায়।
লেখক: প্রধান, ডিজিটাল, ব্র্যান্ড ও জনসংযোগ বিভাগ, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম
পূর্বকোণ/ইবনুর

















