সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন ‘সরকার এর পক্ষথেকে একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তুলতে ইচ্ছুক। কিন্তু সিস্টেমটা ডাক্তারদের পক্ষ থেকে তৈরী করতে হবে।
বাংলাদেশে College of Family Medicine প্রতিষ্ঠা: কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার পূর্বশর্ত। কানাডা, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি জাতীয় প্রস্তাব আজকের লেখায় তুলে ধরছি। বাংলাদেশে একটি কার্যকর ও সুশৃঙ্খল রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনী য়তা এখন বারবার আলোচিত হচ্ছে। নীতিনির্ধারকেরা চান, রোগী প্রথমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাবেন; প্রয়োজন হলে সেখান থেকে উপজেলা, জেলা, মেডিকেল কলেজ বা বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হবে। ধারণাটি সঠিক। কিন্তু শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে রেফারেল ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব নয়।
কারণ একটি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেন প্রশিক্ষিত জেনারেল প্রাকটিশনার (Family Physician) বা পারিবারিক চিকিৎসক। প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশে সেই কাঠামোবদ্ধভাবে প্রশিক্ষিত জেনারেল প্রাকটিশনার বা Family Physician কোথায়?
আমাদের দেশে এমবিবিএস ও এক বছরের ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর অধিকাংশ চিকিৎসকের লক্ষ্য থাকে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, শিশু, অর্থোপেডিকস, কার্ডিওলজি বা অন্য কোনো পরি চিত বিশেষজ্ঞ শাখায় যাওয়া। বাংলাদেশে খুবই কমসংখ্যক ডাক্তার আছেন যারা শুরুতেই জেনারেল প্রাকটিশনার/ Family Physician হিসাবে জীবন শুরু করতে চায়। কিন্তু Family Medicine নিজেই যে একটি পূর্ণাঙ্গ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সম্মানজনক বিশেষজ্ঞ শাখা, সে ধারণা চিকিৎসক- সমাজ, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ফলে প্রাথমিক চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই খণ্ডিত, ব্যক্তি-নির্ভর এবং অনিয়ন্ত্রিত থেকে যাচ্ছে। রোগীরা সামান্য জ্বর, মাথাব্যথা, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোমরব্যথা বা দীর্ঘদিনের সাধারণ অসুস্থতার জন্যও সরাসরি বিশেষজ্ঞ কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। এতে তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলো রোগীর চাপে বিপর্যস্ত হচ্ছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মূল্যবান সময় সাধারণ রোগের পেছনে ব্যয় হচ্ছে এবং প্রকৃত জটিল রোগীরা যথাসময়ে প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না।
Family Physician কেবল একজন ‘সাধারণ ডাক্তার’ নন। তিনি এমন একজন উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ, যিনি বয়স, লিঙ্গ বা অঙ্গভিত্তিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যসমস্যা মূল্যায়ন করেন। তিনি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, মানসিক স্বাস্থ্য, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রবীণদের সমস্যা, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, প্যালিয়েটিভ কেয়ার এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা সমন্বিতভাবে পরিচালনা করেন। প্রয়োজন হলে তিনি সঠিক সময়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে রোগীকে পাঠান এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার পর আবার দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপের দায়িত্ব নেন। এটিই একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি।
বাংলাদেশে Family Medicine নিয়ে ইতোমধ্যে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ রয়েছে এবং BCPS বর্তমানে FCPS Family Medicine পরিচালনা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই শাখাটি এখনো খুব সীমিত পরিসরে রয়েছে; অল্পসংখ্যক চিকিৎসক এই পথে এসেছেন এবং এটি জাতীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়নি। অতএব, এখন প্রয়োজন একটি স্বতন্ত্র, শক্তিশালী এবং জাতীয় দায়িত্বসম্পন্ন College of Family Med- icine Bangladesh প্রতিষ্ঠা করা।
কানাডার শিক্ষা: আলাদা কলেজ, শক্তিশালী পরিচয়- কানাডা ১৯৫৪ সালে College of General Practice of Canada প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তীতে College of Family Physicians of Canada নামে পরিচিত হয়। এই প্রতিষ্ঠান Family Medicine-কে একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ও পেশাগত পরিচয় দেয়। কানাডায় Family Medicine-এর প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা, সার্টিফিকেশন, Continuing Professional Devel- opment এবং পেশাগত মান আলাদা কলেজের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেখানে Family Physi- cian-ই সাধারণত রোগীর প্রথম যোগাযোগের চি- কিৎসক। তিনি অধিকাংশ সাধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা করেন এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠান। এর ফলে মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো তুলনামূলকভাবে জটিল রোগে বেশি মনোযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে রোগীর চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। কানাডার অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়: Family Medicine- কে অন্য বহু হাসপাতালভিত্তিক শাখার মধ্যে ছোট একটি বিভাগ হিসেবে রেখে দিলে এর পূর্ণ বিকাশ হয় না। আলাদা একাডেমিক পরিচয়, প্রশিক্ষণমান এবং কলেজ Family Medicine-কে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত করে।
নাইজেরিয়ার শিক্ষা: উন্নয়নশীল দেশেও সম্ভব- নাইজেরিয়ায় Family Medicine প্রথমে সাধারণ বহির্বিভাগীয় সেবা হিসেবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে National Postgraduate Medical Col- lege of Nigeria Ges West African College of Physicians-এর অধীনে Family Medicine-এর পূর্ণাঙ্গ পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণ চালু হয়। সেখানে Family Medicine বিশেষজ্ঞরা শুধু ক্লিনিকে রোগী দেখেন না; তাঁরা জেলা হাসপাতাল, কমিউনিটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, জরুরি সেবা, জনস্বাস্থ্য, ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নাইজেরিয়ার শিক্ষা হলো-সীমিত সম্পদেও যদি সরকার, মেডিকেল কাউন্সিল এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করে, তবে Family Medi- cine-কে শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ শাখায় উন্নীত করা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো বৃহৎ জনসংখ্যা, গ্রাম- শহর বৈষম্য এবং সীমিত বিশেষজ্ঞ জনবলসম্পন্ন দেশের জন্য নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
দক্ষিণ আফ্রিকার গল্প: স্বীকৃতি এসেছে, কিন্তু সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য আরও গভীর শিক্ষা বহন করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় Family Medicine-কে ২০০৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষজ্ঞ শাখা হিসেবে স্বীকৃ তি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতি সহজে আসেনি; এর পেছনে ছিল বহু বছরের পেশাগত আন্দোলন, নীতিগত আলোচনা এবং ধারাবাহিক অ্যাডভোকেসি। বর্তমানে দেশটির Health Pro- fessions Council-এর রেজিস্টারে এক হাজারেরও বেশি Family Physician রয়েছেন। আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ Family Physician গোষ্ঠী। তবুও প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যায় Family Physician-এর সংখ্যা মাত্র প্রায় ০.১৬ এবং বিভিন্ন প্রদেশে তাঁদের বণ্টন অসম।
দক্ষিণ আফ্রিকায় নয়টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে বছরে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ জন নতুন Fam- ily Physician তৈরি হন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৩৪ শতাংশ সরকারি খাতে বিশেষজ্ঞ পদে, ১২ শতাংশ সরকারি খাতে Medical Officer পদে এবং ১৫ শতাংশ বেসরকারি খাতে কাজ করছেন। অন্যদের কেউ বিদেশে চলে গেছেন, কেউ চি- কিৎসা পেশা ছেড়েছেন, আবার কেউ ব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারণ বা একাডেমিক দায়িত্ব নিয়েছেন। সংখ্যা দেখে এটিকে একটি সফলতার গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার Family Medicine dicine বিশেষজ্ঞদের এখনো সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে তাঁদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে হয়।
সরকারি খাতে কখনো কখনো তাঁদের বিশেষজ্ঞ মর্যাদা এবং Internal Medicine-এর মতো শাখার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিভিন্ন প্রদেশে তাঁদের নিয়োগ ও পদায়নের প্রতিশ্রুতিও সমান নয়। বাজেট সংকোচন ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় কমার সময়ে Family Medicine পদগুলো সহজেই অবহেলিত হতে পারে। বেসরকারি খাতেও সমস্যা রয়েছে। Family Physician-কে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কতটা স্বীকৃতি দেওয়া হবে, তাঁদের পারিশ্রমিক কী হবে এবং তাঁদের কর্মক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত হবে-এসব প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। এমনকি স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এবং সহকর্মীদের কাছেও অনেক সময় Family Physi- cian-এর ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়: শুধু বিশেষজ্ঞ স্বীকৃতি দিলেই কাজ শেষ হয় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন- স্পষ্ট সরকারি পদ, যথাযথ বেতন ও মর্যাদা, জাতীয় মানবসম্পদ নীতি, প্রাদেশিক বা জেলা পর্যায়ে সমান নিয়োগ, বেসরকারি খাতে বিশেষজ্ঞ স্বীকৃতি, সহকর্মী ও জনগণের কাছে ভূমিকা পরিষ্কার করা, এবং নিয়মিত পেশাগত অ্যাডভোকেসি। অর্থাৎ Family Medicine প্রতিষ্ঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় প্রকল্প; এটি কেবল একটি ডিগ্রি চালুর বিষয় নয়।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি ভারতে Family Medicine এখন জাতীয় পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত। National Board of Ex- aminations in Medical Sciences-এর অধীনে DNB Family Medicine পরিচালিত হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে MD বা অন্যান্য কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণও চালু হয়েছে। ভারতে Family Medicine প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো এমন চিকিৎসক তৈরি করা, যিনি রোগীর প্রথম যোগাযোগের চিকিৎসক হিসেবে কাজ করবেন এবং সাধারণ ও অনির্দিষ্ট উপসর্গ, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রবীণস্বাস্থ্য এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল পরিচালনা করবেন। তবে ভারতের মতো বৃহৎ দেশে এখনো Family Medicine সব অঞ্চলে সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক রোগী সরাসরি বিশেষজ্ঞ বা বড় হাসপাতালে যান এবং বহু সাধারণ চিকিৎসক আনুষ্ঠানিক Family Medicine প্রশিক্ষণ ছাড়াই প্রাথমিক সেবা দেন। ভারত দেখিয়েছে, জাতীয় প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করা সম্ভব; কিন্তু সেই প্রশিক্ষণের সঙ্গে চাকরি, সামাজিক স্বীকৃতি এবং বাস্তব রেফারেল ব্যবস্থা যুক্ত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। (চলবে)
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর















