চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

সিলভার এ-প্লাস এবং কোচিং বাণিজ্যের কথা

লিটন দাশ গুপ্ত

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২:১৭ অপরাহ্ণ

কিছুদিন আগে জনৈক ব্যক্তি আমার মোবাইলে রিং দেয়। অর্ধপরিচিত ঐ ব্যক্তির মোবাইল নম্বর সেটে সংরক্ষিত না থাকায়, অপরিচিত নম্বর হিসাবে প্রথমে রিসিভ করিনি। মোবাইলে একাধিক রিং আসার পর রিসিভ করলে পরিচয় দেন তিনি ‘চিপি ধর’ বলছেন। ‘চিপি ধর’ মানে আমাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী অন্য এক গ্রামের জনৈক পল্লী চিকিৎসক, যার পুরো নাম ডা. চিন্ময় পিয়াস ধর। কুশল বিনিময়ের পর হঠাৎ মোবাইল করার কারণ জানতে চাইলে অপর প্রান্ত থেকে বলেন,’তার মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করেছে’। রেজাল্ট কেমন হয়েছে আমি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিলভার এ-প্লাস পেয়েছে।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘সিলভার এ-প্লাস! আমরা গোল্ডেন এ-প্লাসের কথা শুনেছি, কিন্তু সিলভার এ-প্লাস; এটা কি আবার?’ তিনি বলেন, ‘মানুষকে এ-প্লাস বললে গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়েছে কিনা জানতে চায়। তাই আমি কথা সংক্ষেপ করার জন্য জিজ্ঞেস করার আগেই সিলভার এ-প্লাস পেয়েছে বলে ফেলি। মানে ৪র্থ বিষয় বা ঐচ্ছিক বিষয়ের সহায়তায় এ-প্লাস পেয়েছে।’ লোকটির এমন কথা শুনে মনে মনে হালকা হাসলাম আর ভাবলাম, মানুষটা দেখি জটিল প্রকৃতির। আগে কোনদিন তেমন কথা হয়নি বলে বুঝতে পারিনি কেমন প্রকৃতির লোক। যতটুকু মনে পড়ে, প্রায় ২৫/৩০ বছর আগে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল। তবে পাড়ার প্রতিবেশীরা বলত ‘প্যাঁচালো লোক’।

যাহোক, কথার প্রসঙ্গে একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম- কলেজ ভর্তি, প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ চাইতে মোবাইল করেছে। কোথায় কোন কোচিং-এ ভর্তি হবে, কোন স্যারের কাছে কিভাবে পড়বে ইত্যাদি জানতে চায়। আমি বললাম, ‘চকবাজারে শত শত কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর রয়েছে। সেখানে স্যারের অভাব নাই। নামের সামনে স্যার পিছনেও স্যার, এমন হরেক রকম আছে। সেখানে দুয়েকদিন ফ্রি ক্লাস করিয়ে প্রিয়ামনি’র যেটাতে ভালো লাগে সেটাতে ভর্তি করিয়ে দাও।’ প্রিয়ামনি মানে তার মেয়ের নাম। এভাবে নানান কিছু বলে সেইদিনের মত কথা শেষ করলাম।

পরের দিন বিকালে দেখি তিনি আবারও রিং দেন। মোবাইলে বলেন, তিনি চকবাজারে এসেছেন। এখানে পথে ঘাটে মাঠে ভবনে যে দিকে তাকাচ্ছেন শুধু নাকি পোস্টার ব্যানার লিফলেট ফেস্টুনে ভরা। আমি পরামর্শ প্রদান করলাম, সেখানে দুয়েক জায়গায় ফ্রি ক্লাসের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করিয়ে মেয়ের যেটাতে ভালো লাগে সেটাতে ভর্তি করিয়ে দিতে। তিনি বলেন, ‘এখানে তো কোন কোচিং সেন্টার দেখছিনা, কোথায় ভর্তি করাব?’ আমি বললাম, ‘এইমাত্র বললেন না, অনেক পোস্টার ব্যানারে ভরা বিজ্ঞাপন!’ তিনি বলেন, ‘এইগুলো তো কোচিং সেন্টার নয়, সব ডাক্তারের ক্লিনিক। গলায় স্টেথিস্কোপ ঝুলানো ডাক্তারের ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। ডাক্তার অমুক স্যার, ডা. তমুক স্যার ইত্যাদি লেখা আছে।’

এইদিকে যেহেতু চকবাজার এলাকায় মেডিক্যাল অবস্থিত, তাই গ্রাম থেকে আগত গ্রাম্য ডাক্তার সত্যিই মনে করেছেন নামের আগে পরে ডাক্তার মানে ক্লিনিক চেম্বারের পরিচিতি! পরে আমি বুঝিয়ে দিয়েছি এই ডাক্তারগুলোই কোচিং এর মালিক বা কোচিং এর শিক্ষক। আমি আরো বললাম, ‘এখানে নামের আগে-পরে, ডানে-বামে, উপরে-নীচে যেসব স্যার রয়েছে, অধিকাংশ স্যারই কোন স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নয়, বেশীর ভাগ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার।’ এরা কোচিং নামে একপ্রকার বাণিজ্য বিতানই পরিচালনা করে থাকে!

এই তো গেল এই পর্যন্ত সেই দিন তার সাথে কিছু কথাবার্তা। এখন কথা হচ্ছে দেশে একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়তে সবমিলে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় হয়। অথচ সেই বিপুল অর্থ সরকার বহন করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ার ক্ষেত্রে। সরকারি অর্থে তাদেরকে পড়ার সুযোগ দিচ্ছে জনগণের সেবা করার প্রত্যাশায়। এখানে টাকা সরকার বহন করছে মানে জনগণের টেক্সের টাকা সরকারের মাধ্যমে খরচ করা হচ্ছে জনগণের আশা প্রত্যাশা পূরণের জন্য। অথচ তারা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে নিজ নিজ পেশার চাকুরি করেনা। পেশাগত চাকুরিতে না গিয়ে গর্বের সাথে প্রাক্তন ছাত্র হিসাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রদর্শন করে কোচিং বাণিজ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ রয়েছে। কোচিং বন্ধ নাই। ১৯৮০ সালের নোট গাইড নিষিদ্ধকরণ আইন রয়েছে। কিন্তু বাজারে দোকানে যত্রতত্র নোট গাইড বইয়ের অভাব নাই। কথায় আছে ‘কাজীর গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নাই’ আইনেরও একই রকম অবস্থা আরকি! কাগজে কলমে আছে বাস্তবে প্রয়োগে নাই। তারপরেও আশা করব, নতুনভাবে প্রণয়ন করতে যাওয়া শিক্ষা আইন-২০২৬ পাশ করতে পারলে এর অবসান ঘটবে। উল্লেখ্য শিক্ষা আইন-২০২৬ নীতিমালার খসড়ার রূপরেখা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই আইনে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার এবং নোট গাইড বইয়ের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের কঠোর বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

যাহোক, সবশেষে আজ যাকে নিয়ে লেখা শুরু সেই ‘চিপি ধর’ নামে ঐ পল্লী চিকিৎসকের কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। তিনি কোচিং সেন্টারে ভর্তির কার্যক্রম সমাপ্ত করে গ্রামের বাড়িতে ফেরার সময় মন্তব্য করে গেছেন, ‘লেখাপড়ার জায়গা তো দেখছি স্কুলে কলেজে নয়। লেখাপড়া তো এখন হাটবাজারে মানে চক-বাজারে!’ আমিও মনে করি কথাটি অবাস্তব কিছু নয়।

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট