চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

চবিতে দেশের প্রথম স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র, উদ্বোধন আজ

চবিতে দেশের প্রথম স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র, উদ্বোধন আজ

বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা  চবি

৯ জুন, ২০২৬ | ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চীন-বাংলাদেশ ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন ফর মেরিন রিমোট সেন্সিং’ বা ‘স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডেটা ইনোভেশন সেন্টার’-এর উদ্বোধন হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। এটি দেশের প্রথম স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র গবেষণা কেন্দ্র। এর মাধ্যমে স্যাটেলাইটভিত্তিক সমুদ্র ও আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা এবং দুর্যোগ পূর্বাভাসে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।

গতকাল সোমবার দুপুরে ক্যাম্পাসে উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পের সমন্বয়ক ও ডেটা সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর নিয়ে উচ্চমানের গবেষণার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেশের নিজস্ব রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহের সক্ষমতার অভাব ছিল। বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে তথ্য পেতে দেরি, সীমিত রেজল্যুশন ও তথ্যপ্রাপ্তির নানা সীমাবদ্ধতা ছিল।’ সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকান, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়ে, ২০১৯ সালে চীনের জাতীয় সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফির (এসআইও) সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি বিভাগের যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০২৫ সালের মার্চে অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়ে বর্তমানে ডেটা সংগ্রহের জন্য কেন্দ্রটি প্রস্তুত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এক্স ও এল ব্যান্ডের এই স্যাটেলাইট ডেটা রিসিভিং সিস্টেমের মাধ্যমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের বিভিন্ন সমুদ্র এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তথ্য ব্যবহার করে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, জলবায়ু অভিযোজন এবং সুনীল অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। এর মাধ্যমে সমুদ্রে মাছের সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ, উপক‚লীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও নির্ভুল দুর্যোগ সতর্কতা এবং সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা মিলবে। বিজ্ঞান ক‚টনীতি, জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময় এবং যৌথ জলবায়ু ও সামুদ্রিক গবেষণার অংশ হিসেবে চীন এ প্রকল্পে সহযোগিতা করছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশি গবেষক ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে।

 

তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেন, এটি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোগ। কেন্দ্রটিতে কোনো আপলিংক সুবিধা নেই এবং এটি শুধু ডাউনলিংক গ্রাউন্ড স্টেশন হিসেবে কাজ করবে। ব্যবহৃত ফ্রিকোয়েন্সিও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদিত। এই কেন্দ্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- সমুদ্রে বয়া স্থাপন, গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত ডেটা পোর্টাল চালু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল তৈরি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও ভিশন রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হবে। ‘আমরা শুধু চীনের সঙ্গেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চাই, যাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়।’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘প্রকল্পটির সঙ্গে অংশীদার প্রতিষ্ঠানের কোনো আর্থিক লেনদেনভিত্তিক চুক্তি হয়নি। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপনা নির্মাণ, যন্ত্রাংশ স্থানান্তর এবং স্যাটেলাইট ডেটা সংগ্রহ ও নিবন্ধন ফিসহ অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা হতে পারে। ‘অন্যদিকে, জমি, সীমানা প্রাচীর, ইন্টারনেট সুবিধা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার আনুমানিক মূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি। তবে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি নগদ ব্যয় নয় বরং উভয় পক্ষের সম্ভাব্য অবদান ও ব্যয়ের একটি ধারণামূলক হিসাব, যা কোনো চুক্তিবদ্ধ বাজেট নয়।’

প্রায় ৪২০ টেরাবাইট ডেটা সংরক্ষণ সক্ষমতাসম্পন্ন এই ডাটা সেন্টারটি মোট ১১টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। গ্রাউন্ড স্টেশনটি চালু হলে দেশের আবহাওয়া পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, নদীভাঙন, বন উজাড়সহ পরিবেশ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করা সম্ভব হবে।

 

বর্তমানে এসব তথ্য সংগ্রহে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেখানে তথ্য পেতে সময় লাগে ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা। তবে এই স্টেশন চালু হলে সেই সময় কমে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে নেমে আসবে। ফলে সাইক্লোন ট্র্যাকিং, উপক‚লীয় বন্যা মডেলিং, জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্লেষণসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

পূর্বকোণ/রাকিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট