চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬

কর্ণফুলীর তীরে কোটি টাকার মাছবাজার

ফিশারিঘাট

কর্ণফুলীর তীরে কোটি টাকার মাছবাজার

নাজিম মুহাম্মদ

৬ নভেম্বর, ২০২৬ | ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে নোঙর ফেলেছে ট্রলারের সারি। আবছা অন্ধকার চিরে নদীর তীর থেকে ভেসে আসছে মানুষের হাঁকডাক-‘এক শ, দেড় শ, দুই শ!’ বলছিলাম নগরীর ফিশারিঘাটের কথা। যেখানে নদীর ঢেউয়ের সাথে প্রতিদিন ওঠানামা করে কয়েক কোটি টাকার মৎস্য বাণিজ্য। দেশে একই সঙ্গে মিঠা ও নোনা পানির এমন মাছের বাজার এই একটিই। এ বাজারে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ কোটি টাকার লেনদেন হয় মাছ বেচা-কেনায়। ইলিশের মৌসুমে লেনদেন ছাড়িয়ে যায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা।
 
ফিশারীঘাট সোনালি যান্ত্রিক সমবয় সমিতির সহ সভাপতি নুর হোসাইন জানান, সাগরে মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। এখানকার মাছ ধরার ট্রলার গুলো এখনো সনাতন পদ্ধতিতে হাতে জাল টানে। বাঁশখালী ও সাতক্ষীরা এলাকার ট্রলারে জাল টানার জন্য আলদা মোটর বসানো হয়েছে। সেই সব ট্রলারে ভাল মাছ ধরা পড়ছে। ফিশরিঘাটে মাছের আড়ত আছে ১০৩টি। প্যাকিং আড়তসহ  (মাছ প্যাকেট করার আড়ত) মোট আড়তের সংখ্যা ১৫০টি।  ব্যবসায়ী নুর হোসাইন জানান, এবার ইলিশ মৌসুমে দেশি এক কেজি ওজনের ইলিশ ২৪০০/২৫০০ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। তবে দেশ স্বাধীনের পর এবারই প্রথম ভারত থেকে প্রচুর ইলিশ বাংলাদেশে ঢুকেছে। ভারতীয় ইলিশ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে। মৌসুমে ভারত থেকে অন্তত প্রতিদিন ১০০০ মণ ইলিশ দেশে ঢুকেছে।  
 
ফিশারিঘাটের ইতিহাস শতবর্ষের পুরোনো। জানাযায়, বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে পাথরঘাটা ও ফিরিঙ্গিবাজার সংলগ্ন কর্ণফুলী তীরে স্থানীয় জেলেরা সাম্পানে করে সাগর ও নদী থেকে ধরা মাছ নিয়ে আসতেন। ষাটের দশকে পাথরঘাটার ইকবাল রোডে গড়ে ওঠে ‘পুরাতন ফিশারিঘাট’। ব্যবসার পরিধি বাড়লে ২০১৪ সালে সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির উদ্যোগে চাক্তাই খালের মোহনায় রাজাখালী এলাকায় স্থানান্তরিত হয় বর্তমান ‘নতুন ফিশারিঘাট’। স্থান বদলালেও সেই চিরচেনা হাঁকডাক ও ঐতিহ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
 
ব্যবসায়ীরা জানান, ফিশারিঘাটের দিন শুরু হয় গভীর রাতে। ভোররাত তিনটা থেকেই বঙ্গোপসাগর ফেরত ফিশিং বোটগুলো নোঙর ফেলে ঘাটে। কক্সবাজার, টেকনাফ, ভোলা, বরিশাল, কাপ্তাই হ্রদ ও সাতক্ষীরা থেকে ট্রাকে করে আসে দেশি ও চাষের মাছ। ভোর পাঁচটা থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত চলে মূল পাইকারি বেচাকেনা ও প্রকাশ্য নিলাম বা ‘ডাক’। আড়তে ট্রলার থেকে মাছ তোলার পরপরই শুরু হয় উন্মুক্ত নিলাম। বেচাকেনা হয় নানা জাতের মাছ। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে ইলিশ, রূপচাঁদা, কালোচাঁদা, লাক্ষা, কোরাল, লইট্টা, ছুরি, পোয়া, সুরমা, মাইট্টা, টুনা, রাঙা চইক্কা, বাগদা ও টাইগার চিংড়ি থেকে শুরু করে অক্টোপাস, স্কুইড ও শাপলাপাতা মাছও নিয়মিত ওঠে। মিঠাপানির মাছের মধ্যে রয়েছে রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, বোয়াল, আইড়, পাবদা, শিং, মাগুর, গলদা চিংড়ি, তেলাপিয়া ও পাঙাশ।
 
মাছের আকার ও মৌসুম ভেদে দামের তারতম্য ঘটে। পাইকারি বাজারে এক কেজি বা তার চেয়ে বড় তাজা ইলিশ ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা এবং মাঝারি ইলিশ ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। লাক্ষা ও বড় কোরাল মেলে (আকারভেদে) ৮০০ থেকে ২০০ টাকা। আকারভেদে রূপচাঁদা ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা, রাঙা চইক্কা ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকা এবং বড় সামুদ্রিক চিংড়ি ৭০০ থেকে ১৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। সাধারণ ক্রেতাদের নাগালে থাকা লইট্টা, ছুরি ও পোয়া মাছ ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় পাওয়া যায়। এছাড়া দেশি বড় রুই-কাতলা ২৮০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং বোয়াল বা আইড় মাছ ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বেচাকেনা হয়।
 
আড়তদারদের মতে, স্বাভাবিক সময়ে ফিশারিঘাটে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১২০ টন মাছ কেনাবেচা হয়। যা ভরা মৌসুমে ১৫০ থেকে ২০০ টনে দাঁড়ায়। প্রতিদিন এখানে অন্তত পাঁচ কোটি এবং ভরা মৌসুমে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। নগরীর কাজীর দেউড়ি, রিয়াজউদ্দিন বাজার, চকবাজার ও বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন বাজারের পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা এ বাজারের মুল ক্রেতা। এছাড়াও   বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং ঢাকার ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে মাছ কেনেন। নগরীর লোকজনও তাজা মাছের খোঁজে আসেন।
 
কেবল বাণিজ্যই নয়, এই ফিশারিঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কর্মসংস্থান। প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ এই ঘাটে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। যেখানে রয়েছে আড়াই শতাধিক আড়তের মালিক-কর্মচারী, ট্রলারের মাঝিমাল্লা, মাছ ওঠানো-নামানোর শ্রমিক, বরফকলের শ্রমিক, মাছ কাটার কারিগর (বটিওয়ালা), পরিবহন শ্রমিক এবং ঘাটকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র দোকানিরা। 
 
কর্ণফুলীর তীরের এই ফিশারিঘাট। দুপুরের আগেই যে ঘাট কোটি টাকার লেনদেন শেষ করে নীরব হয়ে যায়, পরদিন ভোরে আবারও কর্ণফুলীর ঢেউয়ের তালে তা জেগে ওঠে নতুন আশায়, নতুন ভাবে।
 
পূর্বকোণ/এমএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট