চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দৌড়ের লড়াইয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর দৌড়ে ‘প্রথম’...

দৌড়ের লড়াইয়ে দ্বিতীয় মৃত্যুর দৌড়ে ‘প্রথম’…

তাসনীম হাসান

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল ইসলামের ফেসবুকে ঢুকলেই চোখের সামনে পড়ে কয়েকটি লাইন। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় এথলেটিক্সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) থেকে ৮০০ মিটার ইভেন্টে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের কথা। নিচে জ্বলজ্বল করছে গর্বের রৌপ্য পদক। জীবনে প্রথম কোনো বড় ইভেন্টে পদক জয়ের সেই আনন্দ যেন ছড়িয়ে পড়েছিল তার চোখেমুখে। শুভাকাক্সক্ষীদের শুভেচ্ছায় ভেসে গিয়েছিল পোস্টটি। হয়তো প্রথম হতে না পারার একটু আফসোসও মিশে ছিল সেই লেখায়। চার মাস আগের সেই দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে পারেনি আরিফুল। অথচ মৃত্যুর দৌড়ে ‘প্রথম হয়ে’ সবার আগেই চলে গেল ছেলেটা।

 

মঙ্গলবার রাতের এক মুহূর্তেই বিদ্যুৎ কেড়ে নিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীর প্রাণ। শহীদ আবদুর রব হলের মূল ফটকে একটি ব্যানার টাঙাতে গিয়েছিলেন আরিফুল। তখনই হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ছিটকে পড়েন তিনি। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও ফেরানো যায়নি এই সম্ভাবনাময় এথলেটকে। থেমে গেল তার দৌড়-চিরদিনের জন্য।

 

পাহাড়ে ঘেরা, সবুজে মোড়া খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চল মাটিরাঙ্গা থেকে বহু বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে একবুক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। শুধু পড়াশোনা নয়, এথলেটিক্সের ট্র্যাকেও নিজেকে মেলে ধরার স্বপ্ন ছিল তার। হয়তো একদিন দেশের সেরা এথলেটদের কাতারে দাঁড়াবেন- এমন কত শত স্বপ্নই না বুনেছিলেন আরিফুল। সেই স্বপ্নগুলো আজ আরিফুলের সঙ্গে নেই; পড়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে।

 

আরিফুলের দুর্ঘটনায় পড়ার সেই মুহূর্তের কথা উঠে আসে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়। তাদেরই একজন বলেন, ‘আমরা তখন হল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আরিফুল গেটের উপরে দাঁড়িয়ে ব্যানার টাঙাচ্ছিলো। আমরা সেটি দেখতেছিলাম। হঠাৎ সে একটু কাঁপাকাঁপি শুরু করলো। প্রথমে ডান হাতটা পড়ে গেছে, এরপর বাম হাতটাও। তারপর পাশের পিলারে সে ধাক্কা খেয়ে গেটের পাশেই একটা ছোট ঘরের উপর পড়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যেন সবকিছু হয়ে গেলো।’

 

দ্রুত হলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আরিফুলকে সেখান থেকে নামানো হয়। নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে। এরপর তাকে নিয়ে এম্বুলেন্স ছুঁটে অক্সিজেন এলাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে। তবে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়ে দেন, আরিফুল আগেই মারা গিয়েছেন। এরপর মধ্যরাতে তার নিথর দেহ নিয়ে যাওয়া হয় তারই প্রিয় ক্যাম্পাসে। সবাই শেষবারের মতো বিদায় জানায় এই তরুণকে। এরপর এম্বুলেন্সের ঠাণ্ডাশীতল রুমে বন্দি তার নিথর-নিস্তব্ধ দেহটা ফিরল মা-বাবার কাছে।

 

আবদুর রব হলের ২৩৬ নম্বর কক্ষে থাকতেন আরিফুল। গতকাল সেই কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, পড়ার টেবিলজুড়ে পড়ে আছে বই। পাশেই তারই অর্জন-স্বর্ণপদক ও বিভিন্ন স্মারক। বিছানার ওপরে একটি অ-খোলা চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে অবহেলায়। যেন একটু পরেই ফিরে এসে সেটি খুলে খাবেন আরিফুল।

 

আরিফুল ছিলেন তারই ব্যাচের সবার চোখের মণি। বিভাগের অনুষ্ঠান থেকে বন্ধুদের আড্ডা কিংবা খেলার মাঠ-সবখানেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। ব্যাচের ক্রিকেট ও ফুটবল দুই দলেরই অধিনায়ক ছিলেন তিনি। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় এথলেটিক্সে তার সাফল্যের কথা তো আগেই বলা হলো। চলতি বছর শহীদ আবদুর রব হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার দৌড়ে প্রথম ও ৫০০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন আরিফুল।

 

গতকাল সকালে আরিফুল শেষবারের মতো বাড়ি ফেরেন। দুরন্ত ছেলেকে এভাবে অচঞ্চল অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখে যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না বাবা মোহাম্মদ মনসুর আলীর। বিলাপ করতে থাকেন এই বলে, ‘আরে এহন আব্বা বলি কে ডাইকবো, বহুত কষ্ট করি আর পোলাডারে পড়ালেখা করাইছি। আই মনে কইচ্ছিলাম আর লাশ আর পোলা কান্দে নিবো, ওন আই আর পোলার লাশ কেমনে কান্দে নিমু।’

 

ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল আরিফুলের অসুস্থ মায়ের কান্নামেশানো কণ্ঠ-‘আর পোলারে ছাড়া আই এহন ক্যামনে থাকমু।’

 

তিন ভাই-বোনের মধ্যে আরিফুল ছিল সবার ছোট। সবার বড় আদরের সেই ভাইটা পরে এসে পৃথিবী থেকে চলে গেল সবার আগে। এই সত্য মেনে নিতে পারছিলেন না দুই ভাই-বোনও। গতকাল দুপুরে নিজ এলাকায় জানাজা শেষে চিরদিনের জন্য মাটির পৃথিবীতে শুইয়ে দেওয়া হয় আরিফুলকে।

 

আরিফুলের বাবা বাড়ির পাশের দেওয়ানবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি সারাবছর চাষ করতেন নানা সবজি। অভাবের সংসারে নানা কষ্টের মধ্যেও ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে বড় করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।

 

আরিফুলের মামা নূর ইসলাম ভাগনেকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আরিফুলের অনেক স্বপ্ন ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে এবং এক দিন সাংবাদিক এনে তার বাবার সবজি চাষের বিষয়গুলো গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরবেন।’

 

আরিফুলের মৃত্যুর পর গতকাল তার বাড়িতে ভিড় করেন সাংবাদিকেরা। তার বাবার কথা উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। আরিফুলের সেই স্বপ্ন যেন সত্যি হয়ে গেল, বড় নির্মমভাবে সত্যি হয়ে গেল।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট