নগরের চান্দগাঁও বাহির সিগন্যাল এলাকায় প্রবেশ করলে ডানেই জন এন্ডারসন সড়ক। সেখানে বাতাসে ঝাঁঝালো উৎকট গন্ধ। পুরো এলাকা ময়লা-আবজর্নায় ভরা। গন্ধে শ্বাস নেওয়া দায়। নালায় পড়ছে গৃহস্থালি ও কলকারখানার দূষিত বর্জ্য। নালা উপচে ময়লা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাদাযুক্ত সড়কে। মরে যাচ্ছে আশেপাশের গাছপালা। শহরের ভেতরে এলাকাটি দেখে মনে হবে অবহেলিত অনুন্নত অজপাড়া-গাঁ। অথচ সেখানকার মানুষ সিটি কর্পোরেশনের সবধরনের রাজস্ব প্রদান করছে। কিন্তু পাচ্ছে না নাগরিক সুবিধা। বিষয়টি নিয়ে গত ৮ এপ্রিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ে বৈঠকও হয়েছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে বৈঠকে দশটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো এখনও কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ।
সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে স্থানীয়রা জানান, কলকারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্য নালায় ফেলা হচ্ছে। নালার দূষিত পানি স্থানীয় হলিয়া, ব্রাহ্মণ ও কুয়াইশ বিলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে। এতে আবাদি ফসল নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হারুন বলেন, শিল্প কারখানার ময়লা বর্জ্য সব পড়ছে জন এন্ডারসন রোডের পাশের এ নালায়। এক পশলা বৃষ্টি হলে নালার ময়লা পানি উপচে মানুষের বাসায় প্রবেশ করে। সড়কের কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমর পরিমাণ ময়লা পানিতে ডুবে যায়। নালা আর রাস্তা একাকার হয়ে যায়। এতে উত্তর চান্দগাঁও চৌধুরীপাড়া, বণিকপাড়া, বেপারিপাড়া আর নাথ পাড়ার প্রায় ৬০ হাজার বাসিন্দা দুই বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের (মেট্রো) পরিচালক সোনিয়া সোলতানা জানান, স্থানীয় বামনশাহী ও কৃষ্ণখাল ভরাট হয়ে গেছে। নালাগুলোও ভরাট হয়ে গেছে। তবে ওই এলাকা নিয়ে আমরা বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করছি। সিডিএ, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা নিয়ে সমন্বিত বৈঠকও হয়েছে। খাল আর নালা খননের ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নালার পানি বের হবার কোনো পথ নেই। নালার পানি চলাচল করতে না পারলে ওই এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক হবে না।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, বর্তমানে যে খাল খনন কর্মসূচি চলছে সেখানে কৃষ্ণখালও রয়েছে। তাছাড়া ৩৬ খালের বাইরে নতুন করে ৪০টি খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সে তালিকায়ও খালটি রয়েছে।
বাহির সিগন্যাল এলাকার মিল কারখানার শিল্পদূষণ ও কৃষকের বীজতলা সুরক্ষায় নিয়ে গত ৮ এপ্রিল পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের পরিবশে দূষণ নিয়ন্ত্রণ শাখা একটি জুম বৈঠক করেছে।
বৈঠকের শুরুতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সাইদুর রহমান বলেন, মোহরা শিল্প এলাকায় দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে ওই এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বামনসাহী ও কৃষ্ণখাল ভরাট হয়ে গেছে। সেখানে বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্য, আবাসিক এলাকার পয়ঃবর্জ্য, পানি, শিল্প বর্জ্য ইত্যাদি ফেলা হয়েছে। এতে সামান্য বৃষ্টি হলে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। পুকুর, ঘরবাড়ি ও বিলে দূষিত তরল বর্জ্য প্রবেশ করছে। এতে জনজীবন বিপন্ন ও বিলে কৃষকের লাগানো আবাদি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সভায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল বলেন, সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট চাইলে জেলা প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে এনফোর্সমেন্ট এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সমস্যাটি সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে।
বৈঠকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সিদ্ধার্থ শংকর কুন্ডু বলেন, বাহির সিগন্যাল এলাকার ভরাট হওয়া কারণে খালগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি কর্পোরেশনকে আন্তরিক হতে হবে। সভায় দশটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেগুলো হল, বামনসাহী ও কৃষ্ণখাল এলাকাসহ বর্ণিত শিল্প এলাকার শিল্প কারখানা নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। শিল্প কারখানার বর্জ্য দূষণের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চালাতে হবে। বামনসাহী ও কৃষ্ণখাল যাতে ভরাট না হয় এবং খাল দুটি নিয়মিত পরিষ্কারে উদ্যোগ নিতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে। বিসিক শিল্প এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার পদক্ষেপ নেবে বিসিক। বামনসাহী ও কৃষ্ণখাল খননের উদ্যোগ নেবে সিডিএ/এলজিইডি/ সিটি কর্পোরেশন। ফসল উৎপাদনে কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং প্রতিকারের ব্যবস্থা ও সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেবেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম। মিল কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি জমির সুরক্ষা নিশ্চিতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নেবে। পরিবেশ অধিদপ্তর সার্বিক বিষয়ে কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে।
দূষিত এলাকাটি গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৪ মার্চ পর্যন্ত কয়েক দফায় পরিদর্শন করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের (মেট্রো) একটি দল। দপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে চারজনের একটি দল পুরো এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকারী দলের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই এলাকার বামনশাহী ও কৃষ্ণখালে বিভিন্ন গৃহস্থালি বর্র্জ্য, প্লাস্টিক বর্জ্য, আবাসিক এলাকার পয়ঃবর্জ্যরে পানি এবং শিল্পবর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে ওই এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে দূষিত পানি ওই এলাকার পুকুর ও মানুষের ঘরে প্রবেশ করে। এতে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। বামনশাহী ও কৃষ্ণখাল খনন না করলে জলাবদ্ধতা কমবে না। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয় এলাকার আওতাধীন ৯৩৭টি শিল্প কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে তরল বর্জ্য পরিশোধানাগার (ইটিপি) প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩০৮টি। ইটিপি চালু রয়েছে ২৯০টি প্রতিষ্ঠানে। আর চান্দগাঁও-কালুরঘাট শিল্প এলাকায় ১৯১টি শিল্প কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে ইটিপি প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪৫টি। ৪২টি প্রতিষ্ঠানের ইটিপি রয়েছে। বাকী তিনটি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই।
সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, সিডিএ মোহরা শিল্প এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় যেমন-প্যাসিফিক সি ফুডস, ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো, রীফ লেদার, কেডিএস টেক্সটাইলস লিমিটেড, ম্যাফ সুজ লি. ওয়েল কম্পোজিট লি. ও এশিয়া প্যাসিফিক পেপার মিলস লি.। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে শুনানির জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়। সব প্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্যরে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনা নির্ধারিত মান মাত্রার বাইরে হওয়ায় প্যাসিফিক সি ফুডসকে ৩০ হাজার, রীফ লেদারকে ৩০ হাজার, ওয়েল কম্পোজিটকে তিন লাখ ৩৬ হাজার টাকার জরিমানা করা হয়।
পূর্বকোণ/পিবিরা
















