একটা সময় মোহরা শিল্প এলাকায় ঢুকলেই চোখে পড়ত সারি সারি গাছ। কারখানার চারপাশে কোথাও নারিকেল গাছ দাঁড়িয়ে থাকত মাথা উঁচু করে, কোথাও আবার বিস্তত ছায়া মেলে থাকত শিরীষ। শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া, ধুলা আর দূষণের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল এই ‘গ্রিন বেল্ট’। কিন্তু সেই সবুজ বেষ্টনীই আজ মৃতপ্রায়।
শিল্পাঞ্চলের সবুজ বেষ্টনীর জন্য নির্ধারিত জায়গার একাংশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। আবার যেসব স্থানে এখনও গাছ রয়েছে, সেখানকার বেশিরভাগই প্রাণশক্তি হারিয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কেবল দাঁড়িয়ে আছে মৃত কাণ্ড, কোথাও সবুজ পাতার বদলে দেখা মিলছে বিবর্ণ ডালপালার। সব মিলিয়ে মোহরা শিল্পাঞ্চলের গ্রিন বেল্ট এখন যেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার শেষ লড়াইয়ে।
নগরের উত্তর চান্দগাঁওয়ে অবস্থিত মোহরা শিল্প এলাকা ৭৬ দশমিক ৮৪ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে। ৩১টি প্লট নিয়ে গঠিত এই ভারী ও মিশ্র শিল্প জোনে রয়েছে বিভিন্ন রপ্তানিমুখী পোশাক, টেক্সটাইল ও উৎপাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলগুলোর চারপাশে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ বেষ্টনী বা বাফার জোন রাখার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান ভৌত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এ বাফার জোনের প্রস্থ ৫০ থেকে ১৫০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। একইসঙ্গে শিল্প প্লটের মালিকদের প্রয়োজনীয় জমি সরবরাহের নির্দেশও দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোহরা শিল্পাঞ্চলেও গ্রিন বেল্টের জন্য জমি বরাদ্দ ছিল। সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী গাছও লাগানো হয়েছিল। একসময় সেই এলাকা সবুজে ভরে উঠেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে দূষণের প্রভাবে সেই চিত্র পাল্টে যেতে শুরু করে। গত দুই বছরে পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে।
একটা ‘মরা’ নালাই দায়ী:
বাহির সিগন্যাল মোড় থেকে পশ্চিমে কিছুদূর এগিয়ে জন এন্ডারসন সড়কে ঢুকলেই চোখে পড়ে বড় একটি নালা। সড়কের পশ্চিম পাশে আবাসিক এলাকা, আর পূর্ব পাশে শিল্পকারখানা। এই নালার পাড় ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে মোহরা শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানা।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, একসময় নালাটি ছোট ছিল। প্রায় এক দশক আগে সেটিকে প্রশস্ত করে খালসদৃশ করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে জমতে থাকে শিল্পকারখানার বর্জ্য, রাসায়নিক, গৃহস্থালি আবর্জনা এবং পয়োবর্জ্য। তারপরও প্রবাহমান থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।
কিন্তু গত দুই বছর ধরে নালাটির ম্যাপ শো লিমিটেড থেকে মেঘনা সি ফুডস লিমিটেড পর্যন্ত অংশ কার্যত একটি স্থির জলাধারে পরিণত হয়েছে। ম্যাপ শো লিমিটেড অংশে বামনশাহী খালের মুখ সংস্কারকাজের কারণে বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কৃষ্ণখালও ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নালার পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সেখানে জমে থাকছে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ও অন্যান্য দূষিত পদার্থ। ফলে দূষণের মাত্রা বেড়েছে কয়েকগুণ। এর প্রভাব পড়ছে নালার দুই পাশের গ্রিন বেল্টেও। একের পর এক গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।
মরে যাচ্ছে গাছ:
নালার পূর্বপাশে কারখানাগুলোর চারপাশে একসময় ছিল সারি সারি নারিকেল ও শিরীষ গাছ। আকাশছোঁয়া সেই গাছগুলোর অনেকই এখন মৃত। গত রবিবার সরেজমিনে দেখা যায়, নালার একটি অংশে দুটি কারখানার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ৩৩টি নারিকেল গাছের প্রায় অর্ধেকই মারা গেছে। একইভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে কয়েকটি বড় শিরীষ গাছও।
নালার অপর পাশে রয়েছে আবাসিক এলাকা। আশপাশের বসতিগুলো বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত দূষিত পানির কবলে পড়ে। সামান্য বৃষ্টি হলেই নালার পানি উপচে পুকুর ও বসতিতে ঢুকে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর ফলে এলাকার বেশিরভাগ পুকুরই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে মারা যাচ্ছে পুকুরপাড়ের গাছপালাও।
পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘মোহরা শিল্প এলাকার সঙ্গে যুক্ত দুটি খালের মধ্যে কৃষ্ণখাল ভরাট হয়ে গেছে। অন্যদিকে বামনশাহী খাল সংস্কারকাজের কারণে বন্ধ রয়েছে। একইসঙ্গে শিল্পকারখানার বর্জ্য, রাসায়নিক ও গৃহস্থালি বর্জ্য মিশে জন এন্ডারসন সড়কের পাশের নালাটিও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। দূষিত পানির কারণে গ্রিন বেল্টের অধিকাংশ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নালাটি সচল করা গেলে দূষণের মাত্রা কমবে এবং গাছপালাও টিকে থাকার সুযোগ পাবে।’
জন এন্ডারসন সড়কের প্রবেশমুখে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা হাজী মোহাম্মদ হোসেনের সঙ্গে। সত্তর ছুঁইছুঁই বয়সী এই প্রবীণ বলেন, ‘নালাটি অচল থাকায় একটু বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়। দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। আমরা যেমন কষ্ট পাচ্ছি, তেমনি গাছগুলোও ধুঁকে ধুঁকে মরছে। আর কিছুদিন পর হয়তো এখানে সবুজ বলে আর কিছুই থাকবে না।’
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, গ্রিন বেল্ট সংকুচিত হওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে মোহরা শিল্পাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য আরও নষ্ট হবে। শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া, ধুলা ও দূষণের বিরুদ্ধে যে সবুজ বেষ্টনী প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করার কথা, সেটি হারিয়ে গেলে দূষণের প্রভাব আরও সরাসরি আঘাত হানবে মানুষ ও প্রকৃতির ওপর।
পূর্বকোণ/পিবিরা















