চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্বাস্থ্যের সামাজিকীকরণে লাঘব হবে কিডনি বিকল রোগীদের দুর্ভোগ

স্বাস্থ্যের সামাজিকীকরণে লাঘব হবে কিডনি বিকল রোগীদের দুর্ভোগ

অধ্যাপক ইমরান বিন ইউনুস

১২ মার্চ, ২০২৬ | ১:০৩ অপরাহ্ণ

১২ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস। বছর ঘুরে এই দিনটি আবার ফিরে আসে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিতে, কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। প্রতি বছরই নতুন প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সবার তরে: মানুষের যত্নে বাঁচাও ধরণীরে’।

 

কিডনি বিকল রোগের ব্যাপকতা, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, জটিল প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং দক্ষ চিকিৎসা কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কারণে এই রোগের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন একজন রোগী বা একটি পরিবারের পক্ষে একা বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায় সব ধরনের কিডনি ও মূত্রতন্ত্রের রোগ এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ সময়মতো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শেষ পর্যন্ত কিডনি বিকলে পরিণত হতে পারে। ফলে প্রায় প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনোভাবে কিডনি বিকলের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।

 

এ কারণে গোষ্ঠীগত ও সামষ্টিক সহায়তা ছাড়া কিডনি বিকল রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যত অসম্ভব। বিশেষ করে যেসব রোগীর ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, তাদের অনেকেই সীমাহীন কষ্টের শিকার হন। তাই একদিকে যেমন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, তেমনি সমান্তরালভাবে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিরোধের কথা বলতে বলতে আমরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষা করি।

 

বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ক্রনিক কিডনি রোগে ভুগছেন। প্রায় ২৬ লাখ মানুষ ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে জীবন ধারণ করছেন, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে প্রায় ৫৪ লাখে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আধুনিক জীবনযাপনের নানা ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে কিডনি বিকলের দিকে নিয়ে যায়।

 

বিভিন্ন সমীক্ষা, জরিপ ও মতবিনিময় থেকে জানা যায়, কয়েকটি কারণে কিডনি রোগীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হন। এর মধ্যে রয়েছে- সময়ে রোগ নির্ণয়ে সচেতনতার অভাব, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও ডায়ালাইসিস সুবিধার ঘাটতি, ডায়ালাইসিসের উচ্চ ব্যয়, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ, ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর দাম, দক্ষ চিকিৎসাকর্মীর অভাব, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, যথাযথ তদারকি ও পরিবীক্ষণের ঘাটতি এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর আরোপিত বিভিন্ন কর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবাকে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে রূপান্তরের প্রবণতা।

 

মূলত তিনটি কারণে কিডনি বিকল রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে- সচেতনতার অভাব, সুযোগের অভাব এবং সামর্থ্যরে অভাব। এই তিন কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করে দেন অথবা অনিয়মিতভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যান। এর পরিণতি হয় দীর্ঘ ভোগান্তি বা অকাল মৃত্যু। একজন রোগীর চিকিৎসা ব্যয় প্রায়শই পুরো পরিবারকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। ফলে এটি কেবল একটি রোগ নয়, বরং এক ধরনের নীরব আর্থ-সামাজিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।

 

কিডনি বিকলতাকে শুধু ব্যক্তি বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে একজন ভবিষ্যতে কিডনি বিকলের ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। এদের একটি অংশ আগামী দশ বছরের মধ্যে কিডনি বিকলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে- সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সময় কি এখনও আসেনি?

 

সমন্বিত উদ্যোগ হতে হবে তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক। সমস্যার কারণগুলো বিশ্লেষণ করে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ নির্ধারণ করতে হবে। জাতীয় অঙ্গীকারের ভিত্তিতে কিডনি বিকল রোগীদের জন্য একটি ‘চিকিৎসা-পুনর্বাসন নিরাপত্তা বলয়’ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এজন্য কিডনি বিকল রোগীদের অধিকার নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় নীতিমালা বা ‘বিল অব রাইটস’ প্রণয়ন করা যেতে পারে।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের উদ্যোগের নজির রয়েছে। যুক্তরাজ্যে ১৯৫০-এর দশকে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-এর দশকে কিডনি রোগীদের জন্য বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়। পরে অনেক দেশ তা অনুসরণ করেছে।

 

বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। আমাদের সমাজে প্রতিদিন নানা খাতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার সামান্য অংশ সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবহার করা গেলে একটি শক্তিশালী সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য প্রথমে প্রয়োজন একটি জাতীয় আইন এবং একটি জাতীয় কমিশন, যা কিডনি রোগীদের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে।

 

এই কমিশনের অধীনে দেশের ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা যেতে পারে। কিডনি বিকল রোগী শনাক্ত হওয়ার পর তাকে কমিশনের সঙ্গে নিবন্ধন করা হবে এবং তার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যয়ের অংশ নির্ধারণ করা হবে। বাকি অংশ সরকার বা তহবিল থেকে ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে। এতে রোগীরা নিবন্ধিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে পারবেন এবং স্বচ্ছতার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে।

 

এ ধরনের কর্মসূচির জন্য অর্থ সংগ্রহের বিভিন্ন পথ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দেশে প্রতিদিন কোটি কোটি মোবাইল কল হয়। যদি প্রতিটি কলে মাত্র এক পয়সা ‘কিডনি সহায়তা লেভি’ আরোপ করা যায়, তবে বছরে কয়েক দশ কোটি টাকা তহবিল গঠন সম্ভব। এছাড়া ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে অনুদান দিতে পারে।

 

দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে কিডনি বিকল রোগীদের জন্য একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন জনকল্যাণমুখী নীতি, সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যখাতকে সামগ্রিক সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার মানসিকতা।

 

আমাদের প্রত্যয় হওয়া উচিত- সচেতনতার অভাব, সুযোগের অভাব বা সামর্থ্যরে অভাবে যেন কোনো কিডনি রোগীর জীবনপ্রদীপ নিভে না যায়। আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পারি। কারণ আমাদের সম্পদ আছে, কিন্তু তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। প্রয়োজন কেবল সমন্বিত উদ্যোগ, দূরদৃষ্টি এবং স্বাস্থ্যের সামাজিকীকরণের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার।

 

লেখক: ইন্টারনিস্ট ও নেফ্রোলজিস্ট, প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, নেফ্রোলজি বিভাগ এবং অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, সহসভাপতি, চট্টগ্রাম কিডনি ফাউন্ডেশন।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন