জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ বাংলা সাহিত্যে কেবল একটি কবিতা নয়, বাংলা কাব্যের এই অবিস্মরণীয় শিল্পকীর্তি এক স্বপ্নিল অন্তর্জগতের দ্বার উন্মোচন করেছে। যেখানে ইতিহাসের ধূসরতা, স্মৃতির আলোছায়া, বিষাদের সুর এবং নান্দনিকতা মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে অস্তিত্বের গভীরতম ব্যঞ্জনা। সেই কাব্যিক উপাখ্যানই সিলুয়েটের পর্দায় রূপ নিয়েছে এক মায়াময় দৃশ্যকাব্যে, আর এর শিল্পিত নির্মাণে পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতা।
আত্মহারা শিল্পের নিবিড় ঘোরে, কাব্যচেতনার অন্তর্লীন আলো ও হৃদয়ের লীলাক্ষেত্র থেকে তিনি নির্মাণ করেছেন এমন এক ‘বনলতা সেন’, যা কেবল চলচ্চিত্রই নয়, কবিতা ও দৃশ্যভাষার এক অপূর্ব শৈল্পিক সম্মিলন। জীবনানন্দ দাশকে কোনো প্রচলিত জীবনীমূলক কাঠামোয় আবদ্ধ না রেখে পরিচালক তাঁকে নতুন এক অনুভবের ভেতর পুনরাবিষ্কার করেছেন। যেন কবি জীবনানন্দ দাশ ও তাঁর সৃষ্ট চরিত্র পরস্পরের প্রতিফলন হয়ে আবার জন্ম নিয়েছে নতুন শিল্পমাধ্যমে। জীবনানন্দ-পাঠের দীর্ঘ নান্দনিক অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করে পরিচালক বাংলাদেশের নাট্যচলচ্চিত্রৈ এমন এক সংবেদনশীল বোধের অবতারণা করেছেন, যা সমকালীন চলচ্চিত্র ভাবনায় অভিনব। কবির জীবনবেদনা, নিঃসঙ্গতার অনিবার্য নিয়তি এবং তাঁর সৃজনের গুঢ় রহস্যকে চলচ্চিত্রের বিভাব, ব্যঞ্জনা ও তাৎপর্যের ভেতর এমনভাবে বিন্যস্ত হয়েছে, যা দর্শকের চেতনাকে প্রভাবিত করে।
‘বনলতা সেন’ হচ্ছেন কবিতার সেই রহস্যময়ী নারী, যিনি কখনো আশ্রয়, কখনো স্মৃতি, কখনো বা চিরঅধরা মুক্তির প্রতীক- তাঁকেই কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রের কাহিনী। চিত্রনাট্য ও সংলাপ যেন শব্দের সুগন্ধে, ভাষার ছায়ায় এবং রূপকের আবহে বোনা এক কাব্যবয়ন। সংলাপের প্রবাহ দর্শকের অনুভবের গভীরে যে অনুরণন তোলে, সেখানে ধ্বনিত হয় অবিরাম কাব্যিকতা, প্রতীকের গূঢ়তা এবং মানবমনের নীরব আর্তি। চলচ্চিত্রজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে এক আবহমান জীবনানন্দীয় মায়াজাল। প্রকৃতি, নির্জনতা, বিষণ্ণতার ধূসর আভা, অস্তিত্বের ক্লান্তি এবং পরাবাস্তব নিমগ্নতার মধ্য দিয়ে প্রতিটি দৃশ্য ধীরে ধীরে উন্মোচন করেছে এক স্বপ্নসঞ্চারী জগৎ। দৃশ্যগুলো কখনো স্মৃতির মতো ক্ষণস্থায়ী, কখনো কবিতার মতো রহস্যময়, কখনো বা নিঃশব্দ বিষাদের মতো দীর্ঘস্থায়ী। সিলুয়েটের এই শিল্পিত নির্মাণে দৃশ্যের প্রতিটি পালক কেঁপে ওঠে জীবনানন্দীয় সৌন্দর্যের মৃদু বাতাসে, আর দর্শক প্রবেশ করেন এমন এক জগতে, যেখানে চলচ্চিত্র আর কবিতা পরস্পরের সীমানা বিলীন করে একাকার হয়ে গেছে। ‘বনলতা সেন’ কোনো প্রচলিত জীবনচরিতভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়, সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে এক কবিমানসের অন্তর্লোক অনুসন্ধানের নন্দনযাত্রায়।
জীবনের ঘটনাপুঞ্জকে সরলরৈখিক দৃশ্যে-অদৃশ্যে আবদ্ধ না রেখে পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁর শিল্পবোধের অনন্য উচ্চতায়, নির্মাণ করেছেন এক মনস্তাত্ত্বিক ও কাব্যিক ভূদৃশ্য। যেখানে কবি জীবনানন্দ দাশের অস্তিত্বসংকট, নিঃসঙ্গতা এবং সৃজনের রহস্যময় উৎস একাকার হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রটি কবির জীবনের একটি বিশেষ সময়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, এর ভেতরে প্রবাহিত হয়েছে সমগ্র জীবনানন্দীয় অনুভবের নদী। কবি জীবনানন্দ দাশের ভূমিকায় খায়রুল বাসার সংযমী ও অন্তর্মুখী অভিনয় দর্শককে পৌঁছে দিয়েছেন এক নিভৃত সৃজনলোকের কাছে। ব্যক্তিগত জীবনের অনটন, সামাজিক অপ্রাসঙ্গিকতার বোধ এবং অন্তর্গত কবিসত্তার অস্থির টানাপোড়েন এখানে হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রের প্রধান অনুষঙ্গ। বাস্তবতা ও কল্পনার যৌথতার সংমিশ্রণে চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে- কীভাবে জীবনানন্দ দাশ তাঁর চারপাশের দৃশ্যমান পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করেছেন অনির্বচনীয় উপাদান, আর সেই উপাদানই ক্রমশ রূপ নিয়েছে তাঁর কাব্যের চিররহস্যময়ী নারী, বনলতা সেনে। নাম ভূমিকায় মাসুমা রহমান নাবিলা যেন কেবল একটি চরিত্র নন, তিনি হয়ে উঠেছেন জীবনানন্দের অস্থির বোধ, আকাঙ্ক্ষা, টলমল অবস্থা ও অধরার এক কাব্যিক প্রতিরূপ। একইসঙ্গে চলচ্চিত্রে উপস্থিত আধুনিক সময়ের- ‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে’ ঘোড়া নিয়ে মহীনকে (সোহেল মণ্ডল)।
এই মহীন নগরজীবনের ব্যস্ততা ও বাস্তবতার ভিড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হারিয়ে যাওয়া শব্দ, পুরোনো বই এবং কল্পনার ভেতর খুঁজে ফেরেন বনলতা সেনকে। মহীনের অনুসন্ধান যেন সময় অতিক্রম করে জীবনানন্দের আত্মার সঙ্গেই এক নীরব সংলাপ রচনা করে। জীবনানন্দের প্রতিভাকে যিনি প্রথম গভীরভাবে চিনতে পেরেছিলেন, সেই বুদ্ধদেব বসুর চরিত্রে শরীফ সিরাজের অভিনয় চলচ্চিত্রে যোগ করেছে সাহিত্যিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘বনলতা সেন’ প্রকাশের প্রেক্ষাপট, সমকালীন সাহিত্যিক আড্ডা এবং সৃষ্টিশীল বৌদ্ধিক আবহ এখানে বিশ্বস্ততায় পুনর্নির্মিত হয়েছে। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’- এই চিরস্মরণীয় পংক্তির অন্তর্নিহিত এই যাত্রাবোধ চলচ্চিত্রের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত থেকেছে। চরিত্রগুলোকে দেখা যায় দীর্ঘ, ক্লান্তিকর অথচ অর্থসন্ধানী এক অভিযাত্রায়। যেখানে ইতিহাস, স্মৃতি, স্বপ্ন ও কল্পনা পরস্পরের ভেতর হাহাকারে বিলীন হয়ে যায়। সিংহল সমুদ্র, মালয় সাগর কিংবা বিদিশার নিশার মতো কবিতার রূপকগুলোকে পরিচালক পরাবাস্তব ও সুররিয়াল চিত্রভাষায় এমনভাবে পর্দায় রূপ দিয়েছেন, যেন দর্শক কোনো চলচ্চিত্র নয়, বরং জীবনানন্দের কাব্যচেতনার অন্তহীন স্বপ্নভূমির মধ্য দিয়েই হেঁটে চলেছেন।
পূর্বকোণ/পিআর


















