চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

সুলতান অব সুইং-খ্যাত ওয়াসিম আকরামের জন্মদিন আজ

যে বোলার ব্যাটারদের পাঠাতেন ‘ডিপ্রেশনে’

তাসনীম হাসান

৩ জুন, ২০২৬ | ৯:৪৭ অপরাহ্ণ

দিলীপ বেঙ্গসরকার তখন বিশ্বের সেরা ব্যাটার| সুইং খেলায় উস্তাদ। পৃথিবীর সব প্রান্তেই রানের সোনা ফলাচ্ছেন| প্রতিভাটা এতটাই শিখরে-ক্রিকেটের মক্কাখ্যাত লর্ডসেই কিনা করে বসেছেন পরপর তিন সেঞ্চুরি। তখনকার ভারতীয় অধিনায়ক কপিল দেব তাই মজা করে বলতেন, ‘ম্যাচে আমার শুধু দুটা উইকেট টিকে থাকা চাই। সুনীল গাভাস্কার ও বেঙ্গসরকার।’ এতেই হয়তা কিছুটা বোঝা যায় বেঙ্গসরকারের শ্রেষ্ঠত্ব!

 

নিজের সেরা সময়ে, ১৯৮৭ সালে শারজাহ কাপে সেই বেঙ্গসরকারই কিনা ‘ডিপ্রেশনে’ চলে গিয়েছিলেন এক নবীশ বোলারের সামনে| নামটা ওয়াসিম আকরাম। অথচ তখনো স্বমহিমায় পৌঁছাননি বাঁহাতি পেসার। ক্যারিয়ার শুরুর প্রাক-যুগ চলছে কেবল।

 

বাকিটা শোনা যাক ভারতীয় কিংবদন্তীর মুখে। কয়েক বছর আগে কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে ওয়াসিম আকরামকে পাশে পেয়ে বেঙ্গসরকার খুলে দেন স্মৃতির সেই পুরোনো দরজাটা, ‘শারজায় একবার ৪৯ তম ওভারের মাথায় আমি ৯৪ রানে নট আউট। শেষ ওভারটা করেছিলেন আকরাম। আমার আর সেঞ্চুরি করা হয়নি। নট আউট থেকে যাই-৯৫ রানে।

 

পাশে বসে হাসছেন সুইং অব সুলতান। সেই হাসি দেখে মুখে এক চিলতে রাগ নিয়ে বেঙ্গসরকার বলে বসেন, ‘ভাই এতদিন পর তোমায় বলার মতো সুযোগ হলো বলে বলছি। তখনো তোমার ক্যারিয়ার মাত্রই শুরু। সেই তুমিই কিনা এক ওভারে চারটে বিষমাখানো ইনসুইং ইয়ার্কার দিয়েছিল। মারাত্মক বাড়াবাড়ি নয় কি? আসলে তুমি ডিপ্রেশনে পাঠিয়ে দিতে ব্যাটারদের।’ এবার কি বোঝা গেল-ওয়াসিম আকরামের শ্রেষ্ঠত্ব?

 

ওয়াসিম আকরামের সবচেয়ে ভালো সংজ্ঞাটা বোধহয় দিয়েছেন কার্টলি অ্যামব্রোস। ক্যারিবীয়ান কিংবদন্তী নিজেই জগৎবিখ্যাত পেসার। ব্যাটারদের গুঁড়িয়ে দিতেন ইচ্ছে হলেই। সেই অ্যামব্রোসই কিনা ওয়াসিম আকরামের প্রশংসা করে নিজের বইয়ে লিখেছিলেন, ‘ওয়াসিম আকরামকে আমরা বলতাম সুপার মার্কেট।

 

অ্যামব্রোস বোলিং দর্পের জন্য যতটা বিখ্যাত, একইভাবে কথা কম বলার জন্যও স্মরণীয়। সেই অ্যামব্রোস ওয়াসিমকে এতটাই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন যে, লিখলেন, ‘আকরাম একটা একটা দলকে শেষ করে দিতে পারত। এত রকম ভ্যারিয়েশন ছিল ওর বলে, যে ওকে আমরা বলতাম সুপার মার্কেট।

 

ওয়াসিম আকরামের আন্তর্জাতিক ময়দানে পথ চলা শুরু গত শতাব্দীর আশির দশকে, ১৯৮৪ সালে। ক্যারিয়ার শেষে তো নিজেকে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরাদের সেরায় নাম লিখিয়েছেন, শুরুর ওয়াসিমও এতটাই চিত্রকর্ষক ছিলেন যে দুই পাকিস্তানি গ্রেট ইমরান খান ও জাভেদ মিয়াদাঁদ ওয়াসিম আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিতে রীতিমতো যুদ্ধে নেমেছিলেন। ইমরান খান প্রায় সময় বলতেন, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস ও ইনজামাম উল হককে খুঁজে পেয়েছে তাঁরই জহুরি চোখ। অন্যদিকে মিয়াদাঁদও ছেড়ে দেবার পাত্র নন, বলতেন-তিনিই ওয়াসিমের আবিষ্কারক। শেষে অবশ্য ওয়াসিম নিজেই আবিষ্কারকর্তার সনদ দিয়েছিলেন মিয়াদাঁদকে। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশী এক সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়াসিম খোলাখুলিই বলে দেন, ‘আমাকে আবিষ্কার করেছিলেন জাভেদ মিয়াদাঁদ। ১৯৮৪ সালে একদিন জাভেদ লাহোরে আমাকে একটা নেটে বোলিং করতে দেখেন। তারপরই আমি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাই। জাভেদই তখন পাকিস্তানের অধিনায়ক| ইমরানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল আরও পরে, অস্ট্রেলিয়ায়।’

 

জাভেদ আবিষ্কারক হলেও ধীরে ধীরে ইমরান খানের দিকেই ঝুঁকেছিলেন আকরাম। সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব, নজরকাড়া অধিনায়কত্ব-ইমরান হয়ে উঠেছিলেন আকরামের আইডল। ইমরানও নিজের বাহুডোরে বেঁধেছিলেন আকরামকে। সেই প্রতিদান আকরাম দিয়েছিলেন ১৯৯২-এর বিশ্বকাপে। যে বিশ্বকাপ জয় ইমরানকে বানিয়ে দেয় পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর, তার পেছনে আকরামের অক্লান্ত পরিশ্রম-ঘাম মিশে আছে।

 

সেই বিশ্বকাপে ইমরানের প্রধান সেনাপতি ছিলেন ওয়াসিম আকরাম। চোটের কারণে ওই বিশ্বকাপের আগেই দলের বাইরে চলে যান ওয়াকার ইউনিস। বোলিং বিভাগের দায়িত্ব তাই নিজের কাঁধেই বেশি নিতে হয় আকরামকে। আবার ব্যাটিংটাও করেছিলেন দারুণ। ফাইনালের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া আকরামের সেই দুই ডেলিভারি তো আজও ক্রিকেট দুনিয়ার কাছে নিয়মিত পাঠ্যসূচি। প্রথমটা ছিল অ্যালান ল্যাম্ব, আর পরেরটা ক্রিস লুইস।

 

স্ব-নামে বিখ্যাত ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার রিচি বেনো সেই ফাইনালে কমেন্ট্রি করছিলেন| ল্যাম্ব আউট হওয়ার সময় ম্যাচের অনেক বাকি তখনো| খেলা তখনো দুলছিল দুদিকেই। রাউন্ড দ্য উইকেটে বোলিংয়ে এসে অপাঠ্য এক লেগ কাটারে ল্যাম্বের উইকেট ছিটকে দিতেই মাইক্রোফোনে বেজে উঠল বিনির অমর সেই বাক্যদ্বয়, ‘ল্যাম্বকে ধুয়ে দিল। ম্যাচ থেকে ইংল্যান্ডকেও।’ ইংল্যান্ডের হাতে তখনো পাঁচ উইকেট থাকলেও অন্যতম সেরা ক্রিকেট মস্তিষ্ক বেনো বুঝেই গিয়েছিলেন-এই বিধ্বস্ত পরিস্থিতি থেকে আহত ইংল্যান্ড আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছিল। ক্রিস লুইসকে আরও দুর্ধর্ষ এক ডেলিভারিতে ফিরিয়ে ইংল্যান্ডের কফিনে বলতে গেলে শেষ পেরেকটাই টুকে দিয়েছিলেন আকরাম।

 

ওয়াসিমই কি সর্বকালের সেরা বোলার:

অনেকেই, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া বরাবর ওয়াসিম আকরামের চেয়ে স্বদেশী গ্লেন ম্যাকগ্রাকে এগিয়ে রেখেছে। তারা ওয়াসিমের যেখানে একটা সেখানে ম্যাকগ্রার ঝুলিতে তিনটা বিশ্বকাপ, বোলিং গড় আর স্ট্রাইক রেটেও কিছুটা এগিয়ে থাকার পরিসংখ্যানকে বারবার সামনে এনেছে। কিন্তু এটাও তো মানতে হবে, ম্যাকগ্রা জীবনের আশিভাগ ম্যাচ খেলেছেন সুইংয়ের পরিবেশে, পেস বোলিংয়ের জন্য আদর্শ উইকেটে। সেখানে ওয়াসিম আকরামকে লড়তে হয়েছে নিজের দেশের এমন সব উইকেটে, যেটা যেন একপ্রকার রাস্তা! আর তার সঙ্গে সমর্থকের চাপ তো চিরকাল সঙ্গী ছিল ওয়াসিমের।

 

আর ওয়াসিমকে শুধুই বোলিং নিয়ে ভাবতে হয়নি, ব্যাটিংটাও করতে হবে ব্যাটারদের মতো দায়িত্ব নিয়েই। টেস্টে ২৫৭ অপরাজিতসহ তিনটা সেঞ্চুরি, সাতটা হাফ সেঞ্চুরি এবং ওয়ানডেতে ছয়টা ফিফটি তো সেই কথাই বলছে। সেখানে কবার ম্যাকগ্রার কাছে ব্যাটিংটা চেয়েছে দল? আর ম্যাকগ্রা খেলেছেন হিরে-আর জহরতদের সঙ্গে নিয়ে। অন্যদিকে বেশিরভাগ সময় ওয়াসিমকে খেলতে হয়েছে-ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে!

 

পরিসংখ্যানের হিসাব কষলে হয়তো ম্যাকগ্রাকে ওয়াসিমের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো যাবে| কিন্তু ছয়টা বল ছয় রকমভাবে করা, বাতাসে সুইং, ইনসুইং ইয়ার্কার, রিভার্স সুইং আর চোরা বাউন্সারে অনবরত মুগ্ধতা তো ছড়িয়েছেন একজনই-ওয়াসিম আকরাম।

একটা সময় বলা হতো, ব্যাটারটা ওয়াসিম আকরামকে খেলতে পারে, তার মানে তিনি ভালো ব্যাটার| করোনাকালে তামিম ইকবালের শো’টা বেশ আলোড়ন তুলেছিল। একেকদিন একেক সেরাকে নিজের পর্দায় হাজির করতেন বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। এক শোতে-তিনি নিয়ে আসেন আকরামকে। ওয়াসিমের হৃদয়ে বরাবরাই বাংলাদেশ নরম জায়গা। সেদিনও তিনি বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট, বাংলাদেশের খাবার, আতিথেয়তা বরাবরই আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ সেই শোতে ছিলেন আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু আর খালেদ মাসুদ পাইলট| বয়সের দিক দিয়ে তিনজনই ওয়াসিমের কাছেপিঠে। কিন্তু ওয়াসিমকে নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক তিন অধিনায়ক আজ এত বছর পরও এতটাই সম্মোহিত-বাধ্য ছাত্রের মতো গিলছিলেন তাঁকে। চিরবিনয়ী ওয়াসিমও অবশ্য ‘বড় ভাই’ সুলভ নয়, বিনয়ের সুরেই তিনি বাংলাদেশী গ্রেটের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম শুভাকাঙ্খীদেরও একজন বলা হয় ওয়াসিমকে। ১৯৯৫ সালে বিশ্বের সেরা পেসার থাকার সময়েই তখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শিশু বাংলাদেশের ঘরোয়া লিগে খেলতে এসেছিলেন ওয়াসিম। বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঠামোর আজকের অবস্থানের পেছনে ওয়াসিমের ভুমিকাও দেখেন অনেকে।

 

তবে আলোচনা সেটা নয়, আলোচনা হলো-ওয়াসিমকে লক্ষ্য করে সেদিন বলা তামিমের কথাটা। তর্কযোগ্যভাবে তামিম দেশের সেরা ব্যাটার তো বটেই, আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ওপেনারদের একজনও। সেই তামিমই কিনা অক্লেশে ওয়াসিমকে বলেন, ‘ওয়াসিম ভাই আমার ভাগ্য ভালো, আপনি এই সময়ে খেলেন না। আমাকে আপনার মুখোমুখি হতে হয় না। সৌভাগ্য বটে। ’ শুনে হাসি খেলে যায় ওয়াসিমের চোখে-মুখে। তামিমের কথাটা যে কেবলই কথার কথা নয়-সেটিও আঁচ করা যায় সহজেই।

 

তাই ওয়াসিম কি বিশ্বের সেরা বোলার-এই বিতর্কে না গিয়ে বরং আরও একটা উদাহরণের কাছে ঘুরে আসা যাক।

 

১৯৮৯ সালে করাচি টেস্টের প্রথম ইনিংস। সেদিন নিজের সর্বোচ্চটা ঢেলে বোলিং করছিলেন ওয়াসিম। বলা যায় নিজের অন্যতম সেরা স্পেল। এতটাই ভয়ংকর ছিলেন ওয়াসিম , ভারতীয় বোলাররা তাঁর মুখোমুখি হতেই চাচ্ছিলেন না। বিশেষ করে নভোজিৎ সিং সিধু। ভয়টা সিধুকে এতটাই পেয়ে বসেছিল-আকরামের আগের ওভারের শেষ বলে সিঙ্গেল নেয়ার সুযোগ থাকলেও নিচ্ছিলেন না তিনি। কে হায়-হৃদয় কুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে? ওয়াসিমের পুরো একটা দানবীয় ওভারের আগুনে পুড়তে চাইবে?

 

একদিন এ নিয়ে সিধু আর সঞ্জয় মাঞ্জারেকরের লড়াই বেঁধে যায়, স্বয়ং বাইশ গজেই। কেননা সিধু খালি ইমরান খান আর কাদিরকে খেলছেন। আর ওয়াসিমের পুরো ওভারটার সামনে ঠেলে দিচ্ছেন মাঞ্জারেকরকে। তাতেই প্রতিবাদ করে বসেন সঞ্জয়। বলেন, আমি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে সই করে আসিনি যে একাই আমি ওয়াসিমকে খেলব। শেষ পর্যন্ত দুই সতীর্থের লড়াই থামাতে মাঠে নামতে হয়-অধিনায়ক শ্রীকান্তকে।

 

মানুষ তো এই দৃশ্যগুলোই মনে রাখে, পরিসংখ্যান নয়। না হলে, তিনটা বিশ্বকাপ, হাজারো গোলের মালিক পেলেকে বাদ দিয়ে, দুটো বিশ্বকাপ জয় করা ডিওগো ম্যারাডোনাকে কেন বিশ্বসেরা মানবে পৃথিবী, এমনকি পেলের ঘর ব্রাজিলও! ওই যে পারফরম্যান্স আর ব্যক্তিত্বের মিশেলে চোখে লেগে থাকার মতো মুহূর্ত রচনার জন্য।

 

সেই দিক থেকে সুলতান অব সুইং-এর আগে-পিছে কাউকে দেখছি না! এই টি- টোয়েন্টির দুনিয়ায় কেউ আসবে এমনটা ভাবাও দুরূহ।

 

কেননা, ওয়াসিম আকরামের জীবনের স্ক্রিপ্ট যে পৃথিবীতে নয়, ওপর থেকেই কেউ লিখেছেন!

পূর্বকোণ/সিজান

শেয়ার করুন