চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

পাকিস্তানের আজানের গল্পটা যেন সিনেমা

পড়াশোনার জন্য ছেড়েছিলেন ক্রিকেট, ফিরেই অভিষেকে ইতিহাস

তাসনীম হাসান

১০ মে, ২০২৬ | ১:৩২ অপরাহ্ণ

ইনিংসের তখন মাত্র শুরু। সপ্তম ওভারের প্রথম বল। নাহিদ রানার বিষমাখানো শর্ট বলটা সোজা গিয়ে আঘাত করল আজান আওয়াইসের হেলমেটে। কপাল বরাবর। ১৪০ কিলোমিটার গতির এমন এক বাউন্সারে পোড়খাওয়া ব্যাটারও থমকে যেতে পারে। সেখানে জীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নামা এক তরুণ, প্রথমবার গায়ে জড়ানো জাতীয় দলের জার্সি-চাপটা তাকে গ্রাস করাই স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু আজান আওয়াইস থামলেন না।
হেলমেট খুলে মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে নিলেন। নিয়ম মেনে ফিজিও এলেন, পরীক্ষা করলেন। জীর্ণ হেলমেটটা বদলালেন। কিছুক্ষণ পর আবারও ক্রিজে দাঁড়িয়ে গেলেন শিয়ালকোটের ২১ বছরের তরুণ। যেন কিছুই হয়নি।

ইনিংসের মধ্যভাগে সেই নাহিদ রানার ওপর যেন ‘প্রতিশোধটা’ নিয়ে নিলেন আজান-এক ওভারে টানা তিনটি চার মারলেন। যার দুটিই আবার ওই বাউন্সারে। সেই ‘মারের’ পর সময়ের অন্যতম সেরা স্পিডস্টারকে আক্রমণ থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হলেন নাজমুল হোসেন শান্ত।

তারপর? অভিষেক টেস্টেই সেঞ্চুরি।
নিজের নামটা তুলে ফেললেন সেই ঝলমলে তালিকায়, যেখানে জায়গা পান কেবল বিশেষরাই।

পাকিস্তান ক্রিকেট বরাবরই প্রতিভা আবিষ্কারে দুর্দান্ত, আবার সেই প্রতিভা বিনষ্টেও প্রায় সমান দক্ষ। অপ্রস্তুত তরুণদের আচমকা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামিয়ে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলার ইতিহাস তাদের পুরোনো।

তাই, পাকিস্তান আবারও দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে নতুন এক রত্ন খুঁজে পেলো কিনা-আজানকে নিয়ে এখনই হয়তো এতো বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বেশ তাড়াহুড়ো হয়ে যায়। তবে দেখে মনে হলো, তিনি যেন প্রস্তুত হয়েই এসেছেন। নিজের প্রথম ইনিংসেই যেভাবে টেকনিক, ধৈর্য, চাপ সামলানোর ক্ষমতা আর উইকেটে পড়ে থাকার মানসিকতার প্রদর্শনী দেখালেন, তাতে আজানকে ঘিরে দীর্ঘ স্বপ্ন দেখতেই পারে ইমরান খানের দেশ।

আজানের এই গল্পটা অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। শিয়ালকোটের এক সাধারণ ঘরে। উপমহাদেশের আরো দশটা কিশোরের মতোই; একটা প্লাস্টিকের ব্যাট হাতে। আর সেই গল্পের প্রথম দর্শক ছিলেন তার মা। মা-ই প্রথম খেয়াল করেছিলেন, ছেলেটার ভেতরে ক্রিকেট লুকিয়ে আছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেয়ালে বল মেরে রিবাউন্ড হওয়া বল খেলত ছোট্ট আজান। বাবাকে, মা ছেলের ক্রিকেট প্রতিভার সেই হদিস দিতেই তিনি ইন্টারনেটে কোচিং ভিডিও দেখা শুরু করেন। তারপর নিজেই ছেলেকে শেখানো শুরু করলেন। বাসার ছাদটাই হয়ে উঠল বাইশগজ। বাবা বল করতেন, ছেলে শট খেলত। ছোট ভাইয়ের অবদানও কম না,বড় ভাইকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল করে যেতেন সেই অনুশীলনে। সবমিলিয়ে পুরো পরিবারটাই যেন হয়ে উঠেছিল আজানের প্রথম একাডেমি।

তারপর ধীরে ধীরে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট।
অনূর্ধ্ব-১৯ দলে জায়গা। আর ২০২৩ অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে সেই দুর্দান্ত অপরাজিত ১০৫ রানের ইনিংসে চিরশক্রুকে হারারো-যেটি প্রথমবার বড় মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেয় আজান আওয়াইস নামের এক ব্যাটার আসছে।

আজান ঘরোয়া ক্রিকেটেও ছিলেন দুর্দান্ত।
২০২৪-২৫ কায়েদ-ই-আজম ট্রফিতে ৮৪৪ রান করে হন সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। গড় ৭৬.৭। সেই মৌসুমেই অপরাজিত ২০৩ রানের ম্যারাথন ইনিংস খেলে জেতান শেয়ালকোটকে। ২০২৪ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন আজান। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটেই চাপের মুহূর্ত সামলানোর ক্ষমতা ও ধৈর্যশীল মানসিকতা দিয়ে আজান মুগ্ধ করেছিলেন সবাইকে।

জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার আগেই মাত্র ৩৩টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে করে ফেলেছিলেন ১০টি সেঞ্চুরি। গড় ছিল পঞ্চাশের আশপাশেই।

সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের আগেই আজান দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট করতে পারা একজন নির্ভরযোগ্য ব্যাটার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার সেই শান্ত স্বভাব আর মানসিক দৃঢ়তার প্রভাব যেনো দেখা গেলো প্রথম টেস্টেই।

আবিদ আলীর বয়স হয়ে যাওয়া, আব্দুল্লাহ শফিকের ধারাবাহিকতা হারানো, সায়েম আইয়ুবের ফর্ম হারিয়ে ফেলা, ইমাম উল হকের আশা-যাওয়া-সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্ভরযোগ্য টেস্ট ওপেনারের খোঁজে ছিল পাকিস্তান ক্রিকেট। আজান আওয়াইস যদি এভাবেই এগিয়ে যেতে পারেন, তবে হয়তো তারা এমন একজন ওপেনারকে খুঁজে পাবে, যার মধ্যে ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা ও নির্ভীকতা-সবকিছুরই অসাধারণ মিশেল আছে।

তবে আবারও বলছি-চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় এখনো অনেক পরে। ইয়াসির হামিদকে মনে আছে নিশ্চয়। ২০০৩ সালের পাকিস্তান সফরে করাচি টেস্টে বাংলাদেশকে একাই হারিয়ে দিয়েছিলেন জীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নামা এই ব্যাটার। গড়েছিলেন অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করার অনন্য কীর্তি। কিন্তু এমন এক দুর্দান্ত ব্যাটারের টেস্টযাত্রা কিনা থেমে গিয়েছিল মাত্র ২৫ টেস্টেই।

বাংলাদেশের কোটি কোটি সমর্থকের ‘অভিশাপটা’ ইয়াসিরের ব্যাটে এতোটাই সওয়ার হয়েছিল বেচেরা প্রথম টেস্টের পর লাল বলের ক্রিকেটে আর কোনোদিন সেঞ্চুরিই করতে পারেননি! পাকিস্তানের টেস্ট ক্যাপ নম্বর ২৬১ (আজান) ও কি সেদিকে হাঁটবেন, না ছুঁটবেন অমরত্বের পথে-বলে দেবে সময়। রানা-তাসকিন-ইবাদত-মিরাজ-তাইজুলদের মতো টেস্টের সেরা পারফর্মারদের সামলে যেভাবে সেঞ্চুরি তুলে নিলেন আজান, সামনের দিনগুলো এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে দারুণ কিছুই হবে।

তবে আজানের গল্পটা এত দূর পর্যন্ত আসার কথা ছিল না। এই প্রতিভাও হারিয়ে যেত অকালেই। কারণ একসময় ক্রিকেটই ছেড়ে দিয়েছিলেন আজান। কেননা স্কুলে আজান ছিলেন সেরা ছাত্রদের একজন।

মধ্যবিত্ত পরিবারের চিরকালীন প্রশ্ন-‘ছেলে পড়াশোনা করবে, নাকি খেলাধুলা?’-সেই দ্বন্দ্বে পড়ে আজান বেছে নিয়েছিলেন পড়াশোনাকে। তিন-চার বছর দূরে ছিলেন ক্রিকেট থেকে।

তারপর ২০১৬ সালে একদিন স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাবাকে বলে ওঠেন, ‘বাবা অনেক দিন হয়ে গেছে, আমি স্টেডিয়ামে যাই না। আজ যেতে চাই।’
ছেলের আবদারে বাবা না করলেন না, নিয়ে গেলেন মাঠে।

সেখানে এক কোচ আজানকে দেখে অবাক হয়ে বাবাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘ছেলেটা তো ভালো খেলত! ওর ক্রিকেট বন্ধ করে দিলেন কেন?’

তার পরদিন থেকেই আবার ব্যাট হাতে শুরু। সেই ফিরে আসাই তাকে পৌঁছে দিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।

বছরের পর বছর ধরে টুর্নামেন্ট আর ঘরোয়া ক্রিকেটে দারুণ পারফর্ম করেও পিসিএলের দরজা খুলছিল না। মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল আজানের। কীভাবে পিসিএলে ঢোকা যায়, সেই পথ খুঁজছিলেন। অথচ ভাগ্য তাকে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল আরও বড় দরজায়-সরাসরি পাকিস্তান জাতীয় দলে।

মিরপুরে যখন এক তরুণ নিজের নাম লিখছিলেন ইতিহাসে, তখন বহু দূরের শিয়ালকোটে বসে হয়তো দারুণ সময় কাটছিল এক নারীও। তিনি হয়তো টিভির সামনে বসে দেখছিলেন আজানের কীর্তি। যে নারীর জহুরী চোখ প্রথম আবিষ্কার করেছিল, প্লাস্টিকের ব্যাট হাতে দেয়ালে বলের পর বল মারা ছোট্ট ছেলেটার ভেতরে লুকিয়ে আছে অজস্র ক্রিকেট।
নাম না জানা এই নারী আজানেরই মা।

আজ বিশ্ব মা দিবসে পুরো পাকিস্তান চাইলে এই-মাকে একটা বড়সড় ধন্যবাদ জানাতেই পারে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট