পবিত্র কাবা ঘর হলো সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে মসজিদুল হারামের মধ্যস্থলে অবস্থিত ইসলামের সবচেয়ে পবিত্রতম স্থাপনা ও সারা বিশ্বের মুসলমানদের কিবলা।
আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’আলার এ ঘর মুসলিম উম্মাহর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগর প্রতীক। পৃথিবীর যে প্রান্তেই মুসলমানরা থাকুক না কেন, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সময় তারা এই কাবার দিকে মুখ করেই দাঁড়ায়। এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমানের আধ্যাত্মিক এবং ভৌগোলিক ঐক্যেরও প্রতীক। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ এঘর তাওয়াফের মাধ্যমে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম পবিত্র হজ ও উমরাহ পালন করেন। অথচ মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র এ স্থানটি যুগে যুগে রক্তাক্ত হামলা, অবরোধ ও ধ্বংসের সাক্ষী হয়েছে। তাওয়াফরত ও নামাজরত নিরীহ হাজিদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে কাবা চত্বর ও জমজম কূপের পানি।
ইতিহাসজুড়ে পবিত্র হজ ও মক্কা নগরীতে বেশ কিছু বড় হামলা, আক্রমণ ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে (৩১৭ হিজরি) মক্কায় কারামাতিদের (Qarmatians) আক্রমণ ও হাজি হত্যাকাণ্ড ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস এবং কলঙ্কজনক অধ্যায়গুলোর একটি। বাহরাইন ভিত্তিক চরমপন্থী ইসমাইলি শিয়া উপদল ‘কারামাতি’ (বা কারমাতিয়ান)-দের নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবির নেতৃত্বে এই ভয়াবহ গণহত্যা ও পবিত্র কাবা ঘর লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটে। মাত্র কয়েকদিনের হামলায় প্রায় ৩০ হাজার হাজীকে হত্যা করা হয় এবং তাদের লাশ জমজম কূপে ফেলে দেওয়া হয়। তারা পবিত্র ‘হাজরে আসওয়াদ’ (কালো পাথর) খুলে তাদের রাজ্যে নিয়ে যায়, যা প্রায় ২২ বছর পর পুনরায় স্থাপন করা হয়। এই ভয়াবহ ঘটনার পর নিরাপত্তার চরম অভাব এবং লুণ্ঠনের কারণে পরবর্তী ১০ বছর (৯৩০-৯৪০ খৃষ্টাব্দ ) মক্কায় হজ পালন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ বা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত ছিল।
আক্রমণের পটভূমি ও কারণ : কারামাতিরা প্রচলিত ইসলামি শরিয়তের নিয়ম-কানুন, বিশেষ করে নামাজ ও হজের বিধানকে অস্বীকার করত। তারা হজকে ‘জাহেলি যুগের মূর্তিপূজার অবশিষ্টাংশ’ বলে মনে করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, তাদের প্রতিশ্রুত ‘মাহদি’ বা মসিহ-এর আগমন ঘটেছে, যার ফলে পুরোনো ধর্মীয় আইনের অবসান হয়েছে। এই চরমপন্থী মতাদর্শ থেকেই তারা ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থানে আঘাত হানার পরিকল্পনা করে।
ছদ্মবেশে প্রবেশ : ৯৩০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে (হজের অষ্টম দিন বা জিলহজ মাসে) আবু তাহির আল-জান্নাবি তার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। তারা মক্কায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বা হজযাত্রীর ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছিলেন। কাবার চত্বরে হাজিরা যখন হজের আনুষ্ঠানিকতায় মগ্ন, তখন কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই কারামাতিরা তলোয়ার নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আবু তাহির কাবার সামনে দাঁড়িয়ে উপহাস করে হাজিদের হত্যা করার নির্দেশ দেন।
মৃতদেহের সংখ্যা ও জমজম কূপ অপবিত্রকরণ: ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে মক্কা এবং তার আশপাশে প্রায় ৩০,০০০ হাজিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কারামাতিরা নিহত হাজিদের লাশ এবং ছিন্নভিন্ন দেহগুলো পবিত্র জমজম কূপের ভেতরে ছুড়ে ফেলে কূপটিকে কলঙ্কিত করে। বাকি লাশগুলোকে দাফন ছাড়াই মক্কার অলিতে-গলিতে ফেলে রাখা হয়।
হাজরে আসওয়াদ চুরি: হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর কারামাতিরা কাবা শরিফের গিলাফ পুড়িয়ে দেয় এবং কুড়াল দিয়ে আঘাত করে কাবার পবিত্র হাজরে আসওয়াদ উপড়ে ফেলে। তারা এই পবিত্র পাথরটি চুরি করে বাহরাইনের আল-আহসা (বা হাজার) অঞ্চলে তাদের রাজধানীতে নিয়ে যায়। সেখানে একটি বিশাল মসজিদ নির্মাণ করে এবং চেয়েছিল মক্কার পরিবর্তে মানুষ যেন বাহরাইনের এই স্থানে এসে হজ পালন করে। তবে মুসলিম বিশ্ব এই আদেশ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে এবং কাবার শূন্য স্থানটিতেই হজ জারি রাখে।
হাজরে আসওয়াদ উদ্ধার : আব্বাসীয় খিলাফত এবং মুসলিম বিশ্বের তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক আলোচনার পর, দীর্ঘ ২২ বছর পর (৯৫১ খ্রিস্টাব্দে) কারামাতিরা ১ লাখ ২০ হাজার দিনারের বিনিময়ে হাজরে আসওয়াদ মক্কায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।
কারামাতিদের পতন : মক্কায় এই বর্বরতার কিছুদিন পরই তাদের তথাকথিত ‘মাহদি’ এক অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয় এবং কারামাতিদের ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির পতন ত্বরান্বিত হয়।
ইসলামের ইতিহাসে মক্কা নগরীর ওপর যতগুলো বিপর্যয় এসেছে, তার মধ্যে ৯৩০ সালের কারামাতিদের এই আক্রমণকে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও পবিত্রতা হরণকারী ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয়।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক
পূর্বকোণ/এএইচ


















