ইতিহাস-ঐতিহ্যের চারণভূমি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলা। এখানে রয়েছে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অনেক সাহসী পুরুষ ও পীর আউলিয়ার আগমনের ইতিহাস। কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরের এই উপজেলায় মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান এই চার ধর্মের লোকের বসবাস। এই উপজেলার কড়লডেঙ্গা ইউনিয়নে রয়েছে সন্ন্যাসীর পাহাড়।
ঐতিহ্যবাহী সন্ন্যাসীর পাহাড়ে রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান শ্রীশ্রী মেধস মুনি আশ্রম। যেখান থেকে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বে দুর্গাপূজার উৎপত্তি হয়েছিল। সপ্তসতী চণ্ডী গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে মেধস মুনি আশ্রমের কথা উল্লেখ আছে। এই তীর্থভূমিতে হাজার হাজার বছর আগে দেবী ভগবতীর আবির্ভাব ঘটে। রাজ্যহারা সুরথ রাজা ও স্বজন পরিত্যক্ত বণিক সমাধি বৈশ্য উপস্থিত হয়েছিলেন মেধস মুনির আশ্রমে।
মেধস ঋষি তাদের দুঃখের কথা শুনে তাদেরকে মধুময়ী চণ্ডী শোনান। ঋষির উপদেশ শুনে সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য অরণ্য অভ্যন্তরে ঋষি মেধসের আশ্রমে মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে সর্বপ্রথম মর্ত্যলোকে দশভূজা দুর্গাদেবীর পূজা শুরু করেছিলেন। এ আশ্রম নিয়ে রচিত গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মেধস আশ্রম আবিষ্কার ছিল এক দৈব ঘটনা। বরিশালের গৈলা অঞ্চলের পণ্ডিত জগবন্ধু চক্রবর্তীর ঘরে ১২৬৬ বঙ্গাব্দের ২৫ অগ্রহায়ণ জন্ম নেন চন্দ্রশেখর।
জন্মের দুই বছর পর তিনি পিতাকে হারান। মায়ের অনুরোধে বিয়ে করেন মাদারীপুরের রাম নারায়ণ পাঠকের কন্যা বিধূমুখীকে। বিয়ের ছয় মাস পার না হতেই স্ত্রী ও মাকে হারিয়ে চন্দ্রশেখর চলে আসেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। সেখানে বৈরাগী ধর্ম গ্রহণ করে
চন্দ্রশেখর হয়ে উঠেন বেদানন্দ স্বামী। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যোগবলে বেদানন্দ স্বামী চন্দ্রনাথের দর্শন লাভ করেন।
চন্দ্রনাথ বেদানন্দকে পাহাড়ের অগ্নিকোণে অবস্থিত পৌরাণিক হাজার হাজার বছরের তীর্থভূমি দেবীর আবির্ভাব স্থান মেধস মুনির আশ্রম আবিষ্কার করে এর উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে বলেন। প্রভূ চন্দ্রনাথের আদেশে বেদানন্দ স্বামী পাহাড়-পর্বত পরিভ্রমণ করে মেধস মুনির আশ্রম আবিষ্কার করেন।
মেধস মুনির আশ্রমে রয়েছে ভগবতীর মূল মন্দির। আরো আছে শিব, সীতা, কালী, তারা ও কামাখ্যা মন্দির। সীতা মন্দিরের পাশেই রয়েছে সীতার পুকুর। যে পুকুরে পুণ্যার্থীরা পুণ্যস্নান করেন। বর্তমানে বোয়ালখালীর মেধস মুনির আশ্রম সনাতন ধর্মের মানুষের কাছে অন্যতম তীর্থভূমির মর্যাদা লাভ করেছে। হিন্দু ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ছুটে আসেন আশ্রমের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।
তবে আজ মহালয়ার দিনে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মেধস মুনির আশ্রমে হবে নানা অনুষ্ঠান। মহালয়ার অনুষ্ঠান উপভোগ করতে চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বোয়ালখালীর কড়লডেঙ্গার সন্ন্যাসীর পাহাড়ে সমবেত হবেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। দেবী দশভ‚জার মন্দির দর্শনের পাশাপাশি তারা পাহাড়ের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কালী, শিব, কামাখ্যা, তারা মন্দির দর্শন করবেন।
এছাড়া মহালয়া, বিভিন্ন পূজা-পার্বণে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে এই তীর্থস্থানটি। প্রতিবছর পৌষের ২৯ তারিখ এখানে বিশাল মেলা হয়। এ মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় নামে।
পূর্বকোণ/নুসরাত


















