চট্টগ্রাম সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

বাংলাদেশে অনকোলজি প্রশিক্ষণের ভবিষ্যৎ: পৃথক বিশেষায়ন, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১:৩০ অপরাহ্ণ

ক্যানসার চিকিৎসা গত দুই-তিন দশকে আমূল বদলে গেছে। একসময় সার্জারি, কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপি— এই তিনটি প্রধান চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্যেই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত সীমাবদ্ধ ছিল। এখন ক্যানসার চিকিৎসা ক্রমেই আরও বিশেষায়িত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। একদিকে কেমোথেরাপির পাশাপাশি এসেছে immunotherapy, targeted therapy, hormonal therapy, biomarker-based treatment এবং molecular oncology। অন্যদিকে radiation oncology-তে এসেছে IMRT, VMAT, image-guided radiotherapy, stereotactic radiosurgery, stereotactic body radiotherapy, adaptive radiotherapy, brachytherapy এবং sophisticated treatment planning। ফলে Medical Oncology এবং Radiation Oncology এখন এমন দুটি বিস্তৃত শাখায় পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং clinical evidence যুক্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে তাই এই দুটি শাখাকে কীভাবে প্রশিক্ষণ ও সেবাব্যবস্থার মধ্যে সংগঠিত করা হবে— সে বিষয়ে এখন থেকেই চিন্তা করা প্রয়োজন।

মূল বিষয় রোগীর অধিকার ও নিরাপত্তা

এই আলোচনা কোনো ডিগ্রি, পদবি কিংবা পেশাগত পরিচয়ের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর কেন্দ্রে থাকা উচিত রোগী। একজন ক্যানসার রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে সাধারণত জানেন না একটি chemotherapy regimen নির্বাচন করতে কত guideline, biomarker, toxicity profile এবং clinical evidence বিবেচনা করতে হয়। একইভাবে একটি radiotherapy plan তৈরির পেছনে target contouring, imaging, dose calculation, organ-at-risk constraints, medical physics এবং quality assurance কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও তাঁর পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

রোগী বিশ্বাস করেন, চিকিৎসাব্যবস্থা তাঁর জন্য সঠিক বিশেষজ্ঞ, সঠিক প্রযুক্তি এবং নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করবে। এই বিশ্বাস রক্ষা করা চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়িত্ব। ক্যানসার চিকিৎসায় একটি ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি অনেক বড় হতে পারে। ভুল drug selection বা toxicity management যেমন রোগীর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি ভুল radiation target, dose বা planning স্বাভাবিক অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। আবার treatment sequencing-এর ভুল সিদ্ধান্ত কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফলাফলকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই আধুনিক cancer care মূলত multidisciplinary care। একজন চিকিৎসকের সবকিছু একা করার পরিবর্তে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ নিজ নিজ দক্ষতা নিয়ে একই রোগীর চিকিৎসায় অংশ নেন।

তরুণ চিকিৎসকদের জন্যও সুস্পষ্ট প্রশিক্ষণ দরকার

একজন তরুণ চিকিৎসকের কাছ থেকে একই সঙ্গে আধুনিক systemic therapy এবং অত্যাধুনিক radiotherapy—দুটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশাল ক্ষেত্রের পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা প্রত্যাশা করাও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। একদিকে তাঁকে chemotherapy protocol, immunotherapy toxicity, targeted therapy resistance, molecular oncology, clinical trial data এবং নতুন নতুন drug সম্পর্কে আপডেট থাকতে হবে। অন্যদিকে একই চিকিৎসককে যদি radiation physics, radiobiology, contouring, treatment planning, dose constraints, stereotactic treatment, image guidance এবং radiation safety-তেও সমান গভীর expertise বজায় রাখতে হয়, তাহলে তাঁর ওপর একটি বিশাল পেশাগত দায়িত্ব এসে পড়ে।

তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য স্পষ্ট training pathway, scope of practice, credentialing এবং competency framework তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান Clinical Oncologists-দের অবদান অবশ্যই স্বীকার করতে হবে

বাংলাদেশে বহু Clinical Oncologist দীর্ঘদিন ধরে সীমিত জনবল, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর মধ্যেও ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। দেশের oncology service গড়ে ওঠার পেছনে তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট সময়ের বাস্তবতা ও প্রয়োজনের মধ্যে গড়ে উঠেছে। তাই ভবিষ্যৎ ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অতীতের চিকিৎসকদের কাজ বা অবদানকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই পরবর্তী পর্যায়ের oncology system তৈরি করা উচিত।

যেসব চিকিৎসক ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন ধরে dual practice করে আসছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা, competence, case volume এবং institutional role বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত transitional বা grandfathering policy তৈরি করা যেতে পারে। অর্থাৎ পরিবর্তন হওয়া উচিত evolutionary, disruptive নয়।

শুধু ডিগ্রি আলাদা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না

এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আসে। Medical Oncology এবং Radiation Oncology-কে আলাদা specialty হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া তুলনামূলক সহজ। কিন্তু Radiation Oncology-কে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় specialty হিসেবে গড়ে তুলতে হলে তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে।

Radiation Oncology মূলত technology-dependent specialty। একজন অত্যন্ত দক্ষ Radiation Oncologist থাকলেও তাঁর হাসপাতালে যদি পর্যাপ্ত radiotherapy machine না থাকে, treatment planning system না থাকে, medical physicist না থাকেন, dosimetrist না থাকেন, radiotherapy technologist না থাকেন এবং যথাযথ quality assurance infrastructure না থাকে—তাহলে তাঁর পক্ষে আধুনিক radiation oncology practice করা সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।

পর্যাপ্ত linear accelerator ছাড়া Radiation Oncology এগোবে না

বাংলাদেশে পৃথক Radiation Oncology training সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক linear accelerator বা LINAC স্থাপন করতে হবে। শুধু রাজধানী বা কয়েকটি বড় শহরে নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জন্য geographical access বিবেচনায় রেখে regional cancer centre-গুলোতে আধুনিক radiotherapy facility গড়ে তুলতে হবে।

একটি LINAC স্থাপন করলেই অবশ্য কাজ শেষ হয় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন—medical physicist, dosimetrist, radiotherapy technologist, oncology nurse, biomedical engineer, maintenance support, treatment planning system, CT simulator, immobilization facility, radiation safety ব্যবস্থা এবং নিয়মিত quality assurance। অর্থাৎ একটি radiotherapy centre আসলে একটি সম্পূর্ণ multidisciplinary technical ecosystem।

৫-১০ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা দরকার

বাংলাদেশে Oncology reform তাই এক বছরের প্রকল্প হতে পারে না। এর জন্য অন্তত ৫ থেকে ১০ বছরের একটি জাতীয় পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।

প্রথম পর্যায়ে দেশের বর্তমান cancer burden, radiotherapy machine সংখ্যা, machine utilization, waiting time, geographical distribution, oncology manpower এবং আগামী দশকের সম্ভাব্য demand নির্ণয় করা যেতে পারে।

এরপর নির্ধারণ করতে হবে আগামী পাঁচ এবং দশ বছরে কতজন Medical Oncologist, Radiation Oncologist, Medical Physicist, Dosimetrist, Radiotherapy Technologist এবং Oncology Nurse প্রয়োজন হবে। একইসঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে কতটি নতুন LINAC, brachytherapy unit, CT simulator এবং regional cancer centre প্রয়োজন।

এটি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক পরিকল্পনা না হয়ে medical university, postgraduate training institution, regulatory authority, সরকারি ও বেসরকারি cancer centre এবং সংশ্লিষ্ট professional body-গুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা হওয়া উচিত।

নবীন চিকিৎসকদের কাছে Radiation Oncology আকর্ষণীয় করতে হবে

এই বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি তরুণ চিকিৎসক দেখেন যে Radiation Oncology-তে training নেওয়ার পর কাজ করার মতো পর্যাপ্ত machine নেই, আধুনিক technology নেই, medical physics support নেই, career progression সীমিত এবং দেশের অনেক অঞ্চলে radiotherapy infrastructure অনুপস্থিত—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এই specialty-র প্রতি তাঁদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

তাই শুধু নতুন training seat তৈরি করলেই হবে না। Training এবং infrastructure expansion পাশাপাশি এগোতে হবে। নতুন regional cancer centre, আধুনিক LINAC, stereotactic capability, brachytherapy service, academic post, research opportunity এবং structured career pathway তৈরি হলে মেধাবী তরুণ চিকিৎসকদের Radiation Oncology-তে আকৃষ্ট করা সহজ হবে।

সম্ভাব্য রূপরেখা

বাংলাদেশ চাইলে ধাপে ধাপে এই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে পারে। প্রথমে Medical Oncology এবং Radiation Oncology-র জন্য পৃথক curriculum, examination, logbook, competency requirement এবং exit standard তৈরি করা যেতে পারে।

বর্তমানে যারা combined oncology training-এ আছেন, তাঁদের শিক্ষা বা ভবিষ্যৎ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—সেজন্য transitional pathway রাখা জরুরি।

পরবর্তী পর্যায়ে নতুন trainees-দের জন্য পৃথক training pathway চালু করা যেতে পারে। একই সময়ে একটি National Radiotherapy Capacity Plan তৈরি করে আগামী ৫-১০ বছরে পর্যায়ক্রমে LINAC ও অন্যান্য radiotherapy infrastructure বাড়াতে হবে।

Medical Physicist, Dosimetrist ও Radiotherapy Technologist তৈরির জন্য পৃথক manpower plan নিতে হবে। দেশের tertiary এবং regional cancer centre-গুলোতে multidisciplinary tumor board, chemotherapy safety, radiation safety, clinical audit, morbidity review এবং quality assurance system শক্তিশালী করতে হবে।

আর রোগীদেরও জানার সুযোগ থাকতে হবে—তাঁর systemic therapy কে পরিচালনা করছেন, তাঁর radiotherapy কে পরিকল্পনা করছেন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের specialty training কী।

একে অপরের বিকল্প নয়, সহযোগী

Medical Oncology এবং Radiation Oncology-কে আলাদা specialty করার অর্থ কোনোভাবেই দুটি শাখাকে একে অপরের প্রতিযোগী করা নয়। বরং এর ঠিক বিপরীত।

একজন Medical Oncologist এবং একজন Radiation Oncologist একই রোগীর চিকিৎসায় সহযোগী। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন Surgical Oncologist, Pathologist, Radiologist, Medical Physicist, Oncology Nurse, Pharmacist, Palliative Care Specialist এবং অন্যান্য পেশাজীবী।

ক্যানসার চিকিৎসার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিনির্ভর নয়; team-based।

বিশেষায়ন যত বাড়বে, multidisciplinary collaboration-ও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসা এখন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, একইসঙ্গে চিকিৎসার প্রযুক্তি ও জটিলতাও বাড়ছে। তাই আজকের training এবং infrastructure সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের cancer care-কে প্রভাবিত করবে।

ভবিষ্যতে Medical Oncology এবং Radiation Oncology-কে পৃথক ও শক্তিশালী specialty হিসেবে গড়ে তোলা যৌক্তিক পথ হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন শুধু নাম বা ডিগ্রি পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

বিশেষ করে Radiation Oncology-র ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত LINAC, Medical Physicist, Dosimetrist, Radiotherapy Technologist এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ৫-১০ বছরের জাতীয় পরিকল্পনা।

বর্তমান Clinical Oncologists-দের অভিজ্ঞতা ও অবদানকে সম্মান জানিয়ে, বর্তমান trainees-দের অধিকার রক্ষা করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য সুস্পষ্ট training ও career pathway তৈরি করেই এই পরিবর্তন এগিয়ে নেওয়া উচিত।

এটি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পেশার বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। এটি বাংলাদেশের cancer care-কে আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত করার একটি সুযোগ।

লক্ষ্য একটাই হওয়া উচিত—দেশের প্রতিটি ক্যানসার রোগী যেন সঠিক সময়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে নিরাপদ, আধুনিক ও মানসম্পন্ন চিকিৎসা পান; আর সেই চিকিৎসা দেওয়ার জন্য দেশের চিকিৎসকদের হাতে যেন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি এবং সহায়ক জনবল থাকে।

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট