চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্বয়ং আল্লাহ পাকের নির্দেশে মহানবী সা. ও জয়নব রা.-এর ঐতিহাসিক বিয়ে

স্বয়ং আল্লাহ পাকের নির্দেশে মহানবী সা. ও জয়নব রা.-এর ঐতিহাসিক বিয়ে

মুহাম্মদ মোরশেদ আলম

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

রসুলুল্লাহ (সা.) ও উম্মুল মুমিনিন জয়নব বিনতে জাহশ (রা.)-এর বিয়ে আসমানে বা স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কুরআনে অবতীর্ণ হয়ে ঠিক হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহজাবের ৩৭ নম্বর আয়াতে সরাসরি এই বিয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক বিয়ে থেকে মানবজাতির জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী শিক্ষা রয়েছে। বিয়ের পেছনে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি হলো—এর আগে মহানবী (সা.)-এর পালক পুত্র জায়েদ বিন হারিসা (রা.)-এর সঙ্গে জয়নব (রা.)-এর বিয়ে হয়েছিল। জায়েদ (রা.) একমাত্র সাহাবি যার নাম এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কুরআনুল করিমে এসেছে। আর কোনো সাহাবির নাম পবিত্র কুরআনে সরাসরি নেই।
 
 
জাহেলি যুগে পালক পুত্রকে নিজের ঔরসজাত পুত্রের মতো মনে করা হতো। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, জায়েদ (রা.) সিরিয়ায় বন্দি হন। হাকিম ইবনে হেজাম ইবনে খুয়াইলিদ তাঁকে ক্রয় করে স্বীয় ফুফু খাদিজা (রা.)-কে দান করেন। খাদিজা (রা.) মহানবী (সা.)-এর খেদমতের জন্য তাঁকে দান করেন। মহানবী (সা.) জায়েদ (রা.)-কে আজাদ করে দিয়ে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। জায়েদ (রা.) মহানবী (সা.)-এর কাছে দীর্ঘদিন ধরে পুত্রের মতো বসবাস করতে থাকেন। তাঁর পিতা দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাঁর অনুসন্ধান করার পর অবশেষে তাঁর সন্ধান পান। অতঃপর তাঁর পিতা ও চাচা অর্থের বিনিময়ে মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে তাঁদের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আবেদন করেন।
 
 
মহানবী (সা.) বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে বিনিময় ছাড়া তাকে নিয়ে নিতে পারো অথবা ইচ্ছা করলে আমার কাছেও রেখে যেতে পারো। জায়েদ (রা.) মহানবী (সা.)-এর কাছে থেকে যেতে চান এবং তাঁরাও মহানবী (সা.)-এর কাছে রেখে যাওয়াকে পছন্দ করেন। মহানবী (সা.) তখন বলেন, হে কুরাইশ গোত্র! তোমরা সাক্ষী থাকো! জায়েদ আমার পুত্র, সে আমার ওয়ারিশ হবে। আর আমিও তার ওয়ারিশ হব। অতঃপর তাঁর পিতা ও চাচা খুশি হয়ে দেশে ফিরে যান। বলা বাহুল্য যে রাসুল (সা.)-এর এ ঘোষণা ছিল নবুয়তপ্রাপ্তির আগে।
 
 
পুত্র বলে স্বীকার করলে পুত্র হয় না : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃপরিচয় না জানো, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে।’ (সুরা : সিজদা, আয়াত : ৫) মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে স্বীয় পিতা ছাড়া অন্যের বলে ডাকে, তার জন্য বেহেশত হারাম।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৩২৬)। আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, কাউকে স্বীয় পিতা ছাড়া অন্যের বলে ডাকা জায়েজ নয়। যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে ডাকল, সে কুফরি করল।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৫০৮)
 
 
জাহেলি যুগের প্রথা ছিল যে যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কারো পুত্রকে পোষ্যপুত্ররূপে গ্রহণ করত, তাহলে এ পোষ্যপুত্র তার প্রকৃত পুত্র বলে গণ্য হতো। এ পোষ্যপুত্র সব ক্ষেত্রে প্রকৃত পুত্রের মর্যাদাভুক্ত হতো। তারা প্রকৃত সন্তানের মতো সম্পদের অংশীদার হতো এবং বংশ ও রক্ত সম্পর্কের ভিত্তিতে যেসব নারীর সঙ্গে বিয়ে-শাদি হারাম, এ পোষ্যপুত্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এরূপ মনে করা হতো। বিয়েবিচ্ছেদ সংঘটিত হওয়ার পর ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা যেরূপ হারাম, অনুরূপভাবে পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীও হারাম বলে মনে করা হতো। ইসলাম চিরতরে এ প্রথাকে বিলুপ্ত করেছে।
 
 
জয়নবের সাথে জায়েদের বিয়ে  : জায়েদ বিন হারেসা (রা.) যৌবনে পদার্পণ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় ফুফাতো বোন জনয়ব বিনত জাহশকে তার কাছে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পাঠান। জায়েদ (রা.) যেহেতু মুক্তিপ্রাপ্ত দাস ছিলেন, সেহেতু হজরত জনয়ব ও তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ এ বিয়েতে এই বলে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন, ‘আমরা বংশমর্যাদায় তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’ তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন—‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো কাজের আদেশ করলে যে তা অমান্য করে, সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টাতায় পতিত হয়।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)। জনয়ব ও তাঁর ভাই এ আয়াত শুনে তাঁদের অসম্মতি প্রত্যাহার করে নিয়ে বিয়েতে রাজি হয়ে যান। অতঃপর চতুর্থ হিজরিতে এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ বিয়েতে মোহরানা ধার্য করা হয় ১০ দিনার, যা প্রায় চার ভরি স্বর্ণ পরিমাণ ও ৬০ দিরহাম বা ১৮ তোলা রৌপ্য পরিমাণ। তা ছাড়া দেওয়া হয়েছিল একটি ভারবাহী জন্তু, কিছু গৃহস্থালির আসবাবপত্র, আনুমানিক ২৫ সের আটা ও পাঁচ সের খেজুর। মহানবী (সা.) নিজের পক্ষ থেকে তা প্রদান করেছিলেন (ইবনে কাসির)। মহানবী (সা.)-এর নির্দেশ মোতাবেক জায়েদ বিন হারেসার সঙ্গে জয়নব (রা.)-এর বিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু তাদের স্বভাব-প্রকৃতিতে মিল হয়নি। জায়েদ (রা.) মহানবী (সা.)-এর কাছে জনয়ব (রা.) সম্পর্কে ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব, গোত্রগত মর্যাদা ও আনুগত্যে শৈথিল্য প্রদর্শনের অভিযোগ উত্থাপন করেন।
 
 
মহানবী সা.-এর কাছে ওহি : মহানবী (সা.)-কে ওহির মাধ্যমে জানানো হয় যে জায়েদ (রা.) জনয়ব (রা.)-কে তালাক দিয়ে দেবেন। অতঃপর আপনি তাঁর পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হবেন। একদা হজরত জায়েদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে এসব অভিযোগ পেশ করতে গিয়ে হজরত জনয়বকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মহানবী (সা.) যদিও ওহির মাধ্যমে অবগত হয়েছিলেন, তার পরও দুটি কারণে তিনি তালাক দিতে নিষেধ করেন। একটি হলো—তালাক দেওয়া যদিও শরিয়তে জায়েজ, কিন্তু তা অপছন্দনীয় কাজ। অপরটি হলো, মহানবী (সা.)-এর অন্তরে এরূপ ধারণা সৃষ্টি হয় যে জায়েদ তালাক দেওয়ার পর যদি তিনি জয়নবের পাণি গ্রহণ করেন, তবে আরববাসী বর্বর যুগের প্রচলিত প্রথানুযায়ী এ অপবাদ রটাবে যে রাসুল (সা.) পুত্রবধূকে বিয়ে করেছেন।
 
 
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন, আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন, তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো। তখন আপনি (আপনার) অন্তরে এমন বিষয় গোপন করেছিলেন, যা আল্লাহ প্রকাশ করে দিয়েছেন (যে দত্তক পুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে পত্নিত্বে বরণ করতে হবে)। আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন, অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর জায়েদ যখন জয়নবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিয়ে করার ব্যাপারে মুমিনদের অন্তরে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব্ব না থাকে। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৭)।
 
 
মহানবী (সা.) পঞ্চম হিজরিতে মদিনায় জনয়বকে বিয়ে করেন। তখন রাসুল (সা.)-এর বয়স ছিল ৫৮ বছর, আর জনয়ব (রা.)-এর বয়স ছিল ৩৫ বছর। এ বিয়ে হয়েছিল সরাসরি আল্লাহ তাআলার নির্দেশে। 
 
 
জনয়ব (রা.)-কে মহানবী (সা.) বিয়ে করলে মুনাফিকরা বিরোধিতার মহা উপকরণ হাতে পায়। তারা প্রচার করতে থাকে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) এতই নারীলোলুপ যে স্বীয় পুত্রবধূকে পর্যন্ত বিয়ে করেছেন। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন, ‘মুহাম্মদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত (সুরা : আল-আহজাব : ৪০)।
 
 
বহু বিয়ের প্রথা নতুন নয় : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আল্লাহর নবীর জন্য (একাধিক বিয়ের ব্যাপারে) যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে তাঁর কোনো বাধা নেই। আগের নবীদের ক্ষেত্রে এটাই ছিল আল্লাহর চিরাচরিত নিয়ম। আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত, অবধারিত। (সুরা : আল আহজাব, আয়াত : ৩৮)। 
 
 
এই বিয়ে কেবল একটি পারিবারিক বন্ধন ছিল না, বরং এর পেছনে গভীর সামাজিক, আইনি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা ছিল। রসূলুল্লাহ (সা.) ও জয়নব (রা.)-এর বিয়ের মূল শিক্ষাগুলো নিচে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা হলো:
 
 
পালক পুত্রের প্রথা বিলোপ এবং আইনি সংস্কার :
 
 
রসুলুল্লাহ সা ও জয়নব রা.- এর বিয়ের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে, পালক পুত্র কখনও নিজের আসল পুত্র নয় এবং তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা সম্পূর্ণ বৈধ।
 
 
আল্লাহর ফয়সালার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য : জয়নব (রা.) এবং যায়েদ (রা.) দুজনের কেউই শুরুতে এই বিয়েতে পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ আসার পর তারা তা মেনে নেন। পরবর্তীতে তাদের বিবাহবিচ্ছেদের পর আল্লাহ যখন নবীজিকে বিয়ে করার আদেশ দেন, তখনো আল্লাহর ফয়সালাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি শিক্ষা দেয় যে, জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।
 
 
সামাজিক সমতা এবং বংশীয় অহংকার দূরীকরণ :
 
 
জয়নব (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের এক উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন নারী এবং রাসূল (সা.)-এর আপন ফুফাতো বোন। অন্যদিকে যায়েদ (রা.) ছিলেন একজন মুক্তপ্রাপ্ত দাস। নবীজি (সা.) নিজেই প্রথমে উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক শ্রেণিভেদ ভাঙার জন্য জয়নবকে যায়েদের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে সমাজকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, ইসলামে বংশ বা সামাজিক মর্যাদা বড় নয়, বরং তাকওয়া বা খোদাভীতিই আসল।
 
 
পর্দা বা হিজাবের বিধান নাজিল : এই ঐতিহাসিক বিয়ের ওয়ালিমা (বিয়ে পরবর্তী ভোজ) অনুষ্ঠান চলাকালেই মুসলিম নারীদের জন্য পর্দার বিধান (হিজাবের আয়াত) নাজিল হয় (সূরা আল-আহজাব: ৫৩)। ফলে এই বিয়ের মাধ্যমেই মুসলিম সমাজে পারিবারিক ও সামাজিক শালীনতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
 
 
পরিশেষে: হযরত জয়নব (রা.) নিজেই এই বিয়ে নিয়ে গর্ব করে বলতেন, ‘তোমাদের বিয়ে দিয়েছেন তোমাদেরঅভিভাবকরা, আর আমার বিয়ে সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহ নিজে করিয়েছেন।’ ইসলামে নারীদের সম্মান রক্ষা, সমাজের কুসংস্কার দূর এবং একটি সুস্থ আইনি কাঠামো গঠনে এই বিয়ের শিক্ষা আজীবন অনুকরণীয়।
 
 
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক
 
 
পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট