ব্রেক্সিটের (BREXIT) কথা মনে আছে? খুব বেশি দিন আগেকার কথা নয়। কত হইচই, কত আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, উত্তেজনা, ক্যাম্পইন, গবেষণা। সেই ‘ব্রেক্সিট’ সম্প্রতি নুতন করে আবার ব্রিটিশ রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে। ইংরেজি Britain Ges Exit – এই দুই শব্দের সমন্বয়ে ‘ব্রেক্সিট’ (BREXIT) শব্দের উৎপত্তি, যার ব্যাখ্যা করলে দাড়ায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসা। দুটি ভিন্ন শব্দ এবং ধ্বনির অংশকে এককরে আর একটি নুতন শব্দ তৈরির প্রক্রিয়াকে ভাষা-বিজ্ঞানের অভিধানে বলা হয় ‘পোর্টম্যান্টো’। ফরাসি শব্দ, পোর্টম্যান্টোকে ‘ব্লেন্ড ওয়ার্ড’ বলা হয় অর্থাৎ মিশ্র শব্দ। এই ধরণের অনেক ব্লেন্ড-ওয়ার্ড রয়েছে, যেমন ‘মোটেল’। এটি এসেছে ‘মোটর’ (মোটরিস্ট) এবং ‘হোটেল’ থেকে। একইভাবে, Smog (ধোঁয়াশা) শব্দটির উৎপত্তি smoke (ধোঁয়া) এবং fog (কুয়াশা) থেকে। যাই হোক, ভাষাবিজ্ঞানকে আপাতত ছুটি দিয়ে ফিরে আসি মূল বিষয় ‘ব্রেক্সিট’ প্রসঙ্গে।
ব্রিটেন ২০২০ সালের আগ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অধীনে ছিল। প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, কট্টর ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফরাজের মত ‘ইউরো স্কেপ্টিক’ নেতারা ব্রিটেনকে ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার জন্যে দেশব্যাপী ক্যাম্পইন করেন। প্রধানমন্ত্রী হবার আগে বরিস জনসন ছিলেন সাংবাদিক। তিনি তার লেখায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ব্রিটেনের জন্যে কেবল ভয়ের কারণ হিসাবে নয়, তিনি ইইউ-কে উপহাসের পাত্রে পরিণত করতে সচেষ্ট ছিলেন। আর নাইজেল ফারাজ না থাকলে তো ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে কোন ‘গণভোট’ হতোনা বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। সে সময়কার ‘ইউকিপ’-এর এই নেতা বৃটিশ জনগণের মগজে অতি চতুরতা ও সক্ষমতার সাথে ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ব্রিটেন ইউনিয়নে থাকলে তাদের দেশ ইমিগ্রেন্টে সয়লাব হয়ে যাবে এবং দেশীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। এই দুজন ছাড়াও ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পেছনে আরো যিনি সক্রিয় ছিলেন তিনি হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী, ঋষি সুনাক। এরা সবাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুনকে সীমাহীন চাপের মধ্যে ফেলেছিলেন এবং গণভোট দিতে চাপ দেন। ভোটে সামান্য ব্যবধানে ব্রেক্সিট-পক্ষের জয় হয়। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসে। ডেভিড ক্যামেরুন, ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, লিজ ট্রাস, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার, ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী জন মেজর, টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউন- এরা সবাই চেষ্টা করেছিলেন জনগণকে বুঝাতে যে ইউনিয়নের মধ্যে থাকলে ব্রিটেনের লাভ ছাড়া ক্ষতি হবেনা। কিন্তু মিথ্যে আশা, মিথ্যে আশ্বাস ও গলাবাজির কাছে তাদের হার হয়েছিল। দেশের শতকরা ৫১.৯% ভাগ ব্রিটিশ জনগণ ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। ইউনিয়নের মধ্যে থেকে যাবার জন্যে ভোট দিয়েছিলেন ৪৮.১১% ভাগ নাগরিক। ডেভিড ক্যামেরুন সাথে সাথে পদত্যাগ করেন, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, থেরেসা মে। এরপর চারবছর ধরে ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলে এবং ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসে।
দুই. ব্রেক্সিট-শিবিরে আনন্দের বন্যা বয়ে গেলেও তাদের সে আনন্দ, উচ্ছাস খুব বেশিদিন আর আগের পর্যায়ে রইলো না। যে আশার বাণী শোনানো হয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এলে দেশের অর্থনীতি ধাঁই ধাঁই করে উর্দ্ধগামী হবে, দেশে অভিবাসীর-স্রোত ঠেকানো যাবে, রপ্তানি বাড়বে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো ঠিক তার উল্টো। ‘ন্যাশনাল ব্যুরো ফর ইকোনমিক রিসার্চ’ (এনবিইআর )-এর এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ইইউ ত্যাগ করার ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্ত ছিল যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক পতনের মূল কারণ (ক্যাটালিস্ট)। ব্রেক্সিটের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা ধীরে ধীরে যে ভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করে তা ছিল অকল্পনীয়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী স্যার স্টারমার যখন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে লড়ছেন এবং পাশাপাশি দলের ভেতর সম্ভাব্য নেতৃত্ব-প্রার্থীরা (ওয়েস স্ট্রিটিং এবং এন্ডি বার্নহ্যাম) তাদের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, তখন মনে হচ্ছে ব্রেক্সিটকে ঘিরে পুরানো বিতর্কটি পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে। স্টারমার বলেন, ব্রিটেনের অবস্থা নিয়ে জনগণ হতাশ। ব্রেক্সিটের অন্যতম নেতা নাইজেল ফারাজের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘নাইজেল ফারাজ ব্রেক্সিট নিয়ে কী বলেছিলেন? নাইজেল বলেছিলেন, ব্রেক্সিট আমাদের আরো ধনী করবে। ভুল, ব্রেক্সিট আমাদের আরো গরিব করছে। নাইজেল বলেছিলেন, ব্রেক্সিট অভিবাসন কমাবে, ভুল। অভিবাসন আকাশচুম্বী হয়ে গিয়েছিল। নাইজেল বলেছিলেন, ব্রেক্সিট আমাদের আরো সুরক্ষিত করবে। আবারো ভুল। ব্রেক্সিট আমাদের দুর্বল করেছে।’ স্টারমার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আরো ঘনিষ্ট সম্পর্ক স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাবেন বলে ঘোষনা দেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পরপর কয়েকটি টোরি সরকারের অধীনে বছরের পর বছর ধরে চলা উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের পর, স্যার স্টারমার ইইউ-এর সাথে সম্পর্ক ‘পুনরায় স্থাপন’ এবং এই জোটের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতুশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। পিছিয়ে নেই স্টারমার্কের নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া লেবার দলীয় প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ওয়েস স্ট্রিটিং। তিনি ব্রিটেনকে য়ুরোপীয় ইউনিয়নের সাথে একটি ‘নুতন বিশেষ সম্পর্ক’ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। তিনি ইঙ্গিত দেন যে আগামীতে তিনি ব্রিটেনকে এই জোটে পুনরায় দেখতে চান। পিছিয়ে নেই লেবার দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী পদের জন্যে লড়ার জন্যে যিনি ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন সেই এন্ডি বার্নহামও। তিনি অবিলম্বে ব্রেক্সিট নিয়ে বিতর্ক শুরু করার উপর জোর দেন। জনগণের ‘পালস’ বুঝে যে তারা এই সুরে কথা বলছেন তা বলা বাহুল্য।
তিন. যে বৃটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসার জন্যে এতকিছু করলেন, এখন কেন তারা তাদের (ইইউ) সাথে পুনরায় ‘ঘর’ করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছেন? এর পেছনে কী কারণ তা পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেনকে অর্থনৈতিকভাবে বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তার মধ্যে যে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য তা হলো- ক) খাদ্যদ্রব্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য : ব্রেক্সিটের ফলে খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। মাংস ও পনিরের মত খাদ্যদ্রব্য, যা ইইউ থেকে আমদানির উপর নির্ভরশীল, সেগুলি এখন নানা বাণিজ্যিক বাধা ও নিয়মাবলীর কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ২৫% শতাংশ বেড়েছে, যা ‘ব্রেক্সিট’ না হলে যা বৃদ্ধি পেত, তার চাইতে শতকরা ৮% বেশি। খ) বিমানবন্দর ও বর্ডারে দীর্ঘ সারি: ব্রেক্সিটের পর থেকে ইইউ-গন্তব্যগুলিতে ব্রিটিশ নাগরিকদের নুতন পাসপোর্ট-নিয়মের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আগে ভিসা ছাড়াই যাওয়া যেত। এখন ইইউ দেশে প্রবেশ ও ত্যাগ- উভয় সময়ে পাসপোর্টে স্ট্যাম্প লাগানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ফলে এয়ারপোর্ট ও অন্যান্য বর্ডারে সময় ও নানা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। ইউরোপীয় পাসপোর্টধারিরা স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট-গেইট ব্যবহার করতে পারেন। ব্রিটিশ নাগরিকরা ব্রেক্সিটের আগে এমন সুবিধা পেতেন। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর প্রায়শ তাদের এই স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট গেইট ব্যবহার করতে দেয়া হয়না। এখন যুক্তরাজ্যের ভ্রমণকারীদের ইইউ দেশসমূহ ভ্রমণ করার জন্যে ফি সহ অনলাইন রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এছাড়া আবেদনের পর ৯৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ব্রেক্সিটের আগে এই সমস্ত ঝামেলা ছিলনা। গ) ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে: ব্রেক্সিট ব্রিটিশ ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলির জন্যে ইইউ-র সাথে বাণিজ্য করাকে অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছে। ফেডারেশন অফ স্মল বিজনেসেস-এর মতে, ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করার পর থেকে অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বর্ধিত খরচ, নিয়মকাকুন, ডকুমেন্ট, বিলম্ব ও বিঘেœর কথা জানিয়েছে। ঘ) ইইউ-তে চাকরি ও পড়াশুনা কঠিন হয়ে পড়েছে: ব্রেক্সিট-এর আগে ব্রিটিশ নাগরিকদের ভিসা ছাড়াই ইইউ-সদস্য রাষ্ট্রে ভ্রমণ, বসবাস, কাজ ও পড়াশোনা করার অধিকার ছিল। ইইউ-এর অবাধ চলাচল আইনের শর্তানুযারী তারা এই সুবিধা ভোগ করতে পারতেন। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর তাদের ইইউ নাগরিকত্ব এবং অবাধ চলাচলের অধিকার শেষ হয়ে যায়। এখন তারা ১৮০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন ‘স্যানজেন এলাকায়’ (ইইউ দেশগুলি এবং নরওয়ে, সুইজারল্যান্ডের মত আরো কয়েকটি দেশ) থাকতে পারবেন। ঙ ) শিল্পীরা বাধার সম্মুখীন: শিল্পীরা ব্রেক্সিটের আগে ইইউ-সদস্য রাষ্ট্রে কনসার্ট, উৎসব এবং সফরে সংগীত পরিবেশন করার স্বাধীনতা ভোগ করতেন। ব্রেক্সিটের পর তাদের নানা নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। একইভাবে, সফররত নাট্যদল বা বিভিন্ন স্থানে শুটিংরত চলচ্চিত্র কর্মীরা ইইউ-তে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ‘বেস্ট ফর ব্রিটেন’ নামক এক প্রচারণা গোষ্ঠীর এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৭-২০ সালের তুলনায় ২০২৩ সালের সামারে ইউরোপ জুড়ে মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করার জন্যে নির্ধারিত ব্রিটিশ শিল্পীর সংখ্যা গড়ে ৩২% কমেছে।
সবশেষে: এতো গেল অনেক সমস্যার কেবল কয়েকটি দিক। ব্রেক্সিটের আগে ব্রিটিশরা টের পাননি ব্রেক্সিটের ফলাফল এমন তিতো হবে। আর তাই এখন দুই-তৃতীয়াংশ ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন যে ব্রেক্সিট তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মজার ব্যাপার হলো, এদের মধ্যে ইউরোপ-ছাড়ো, অর্থাৎ ব্রেক্সিটের পক্ষের ভোটাররাই বেশি অসন্তুষ্ট। যদিও বা সে কথা মানতে রাজি নয় টোরি দল এবং রিফর্ম ইউকে। তাদের কথা হলো, ‘ব্রেক্সিটের পর আমাদের দেশ এর সুফল ভোগ করছে। বিশ্বজুড়ে গতিশীল, দ্রুতবর্ধনশীল বাজারগুলির সাথে নুতন বাণিজ্য চুক্তি সুরক্ষিত করেছে এবং ব্রাসেলস (ইইউ) থেকে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করেছে।’ (৩১-০৫-২০২৬)
লেখক: হল্যান্ডপ্রবাসী সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
পূর্বকোণ/পিবি

















