চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০১ মে, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনের বুথফেরত জরিপ বিজিপি কি এবার মমতার দুর্গ ভাঙতে পারবে?

মুহাম্মদ মোরশেদ আলম

১ মে, ২০২৬ | ১২:২১ অপরাহ্ণ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ বিক্ষিপ্ত কিছু সহিংসতা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। এবারও ভোটদানের হারও প্রথম দফার মতোই রেকর্ড সংখ্যার দিকে ইঙ্গিত করেছে, দ্বিতীয় দফায় ভোট পড়েছে ৯৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। দ্বিতীয় দফায় সাত জেলার ১৪২টি আসনে ভোট হয়েছে। ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত রাজ্যের ১৬ জেলার ১৫২ আসনে প্রথম দফার ভোটে হার ছিল ৯১.৮৩ শতাংশ। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। আগামী ৪ মে পশ্চিমবঙ্গে ভোটগণনা হবে। ওইদিনই ভোটের চূড়ান্ত ফল জানা যাবে ।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) ভোট শেষ হওয়ার সাথে সাথে বুথফেরত জরিপ আসতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ জরিপে দাবি করা হয়েছে, বিজেপি এগিয়ে রয়েছে এবং তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। আবার কোনও কোনও জরিপে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। কোথাও আবার তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তবে এই বিভক্ত ফলের মধ্যে নামকরা সংস্থা অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া জানিয়েছে, পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় তারা আপাতত পশ্চিমবঙ্গের বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করবে না। এদিকে, বুথফেরত জরিপে বিজেপির এগিয়ে থাকার খবরের মধ্যে রাজ্যের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, ‘বিজেপি টাকা দিয়ে বুথফেরত জরিপ দেখাতে ‘বাধ্য’ করেছে।’ ২৯৪ বিধান সভা আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য ২২৬টিতে তৃণমূলই ‘জিতবে’ বলে তিনি দাবি করেছেন । যদিও সমীক্ষার ফল আসার আগেই বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী সরকার গঠনের ঘোষণা করে দিয়েছেন। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর হাসিমুখে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আঙুলে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে দলের জয় ঘোষণা করেছেন।
ম্যাট্রিজের জরিপ অনুযায়ী, বিজেপি পেতে চলেছে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন। তৃণমূল পাচ্ছে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যদের ঝুলিতে যেতে পারে ছয় থেকে ১০টি আসন। চাণক্য স্ট্র্যাটেজির জরিপ অনুসারে, বিজেপি ১৫০ আসনের বেশি পেতে পারে। তারা পেতে পারে ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন। তৃণমূল পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যদের ৬ থেকে ১০টি আসন দেওয়া হয়েছে।
পিপলস পালস-এর জরিপে তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তারা পেতে পারে ১১৭ থেকে ১৮৭টি আসন। বিজেপি পেতে পারে ৯৫ থেকে ১১০টি আসন। অন্যদের মধ্যে কংগ্রেস এক থেকে তিনটি এবং বামেরা শূন্য থেকে একটি আসনে জয় পেতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। পি-মার্কের জরিপে বিজেপিকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের মতে, এ রাজ্যে বিজেপি ১৫০ থেকে ১৭৫টি আসনে জিততে পারে। অন্যদিকে, তৃণমূল পেতে পারে ১১৮ থেকে ১৩৮টি আসন। এই সমীক্ষায় অন্যদের কোনও আসন দেওয়া হয়নি।
প্রজা পোল-এর সমীক্ষায় বিজেপিকে ১৭৮ থেকে ২০৮টি আসনে এগিয়ে রাখা হয়েছে। তৃণমূল পেতে পারে ৮৫ থেকে ১১০টি আসন। অন্য দলগুলো শূন্য থেকে পাঁচটি আসনে জিততে পারে বলে এই সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে।
পোল ডায়েরির সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৪২ থেকে ১৭১টি আসন পেতে পারে বিজেপি। তৃণমূল পেতে পারে ৯৯ থেকে ১২৭টি আসন। এ সমীক্ষায় অন্যদের পাঁচ থেকে ৯টি আসনে জেতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
জনমত পোল্‌স-এর সমীক্ষায় আবার তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। ১৯৫ থেকে ২০৫টি আসন পেয়ে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ক্ষমতা ধরে রাখবে বলে দাবি করা হচ্ছে এই সমীক্ষায়। বিজেপি পেতে পারে ৮০ থেকে ৯০টি আসন। কংগ্রেসকে এক থেকে তিনটি আসন এবং বামদের শূন্য থেকে একটি আসন দেয়া হয়েছে। অন্যরা পেতে পারে তিন থেকে পাঁচটি আসন। জেভিসি’র সমীক্ষায় তৃণমূলকে ১৩১ থেকে ১৫২টি আসনে এগিয়ে রাখা হয়েছে। বিজেপি পেতে পারে ১৩৮ থেকে ১৫৯টি আসন। কংগ্রেসকে শূন্য থেকে দু’টি আসন দেয়া হয়েছে এই সমীক্ষায়।

ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার পর ভি চিহ্ন দেখাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মমতা ব্যানার্জি। ছবি-বিবিসি

যদিও ভারতের নির্বাচনি ইতিহাস বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের বুথফেরত বা প্রাক-নির্বাচনি জনমত জরিপ মেলে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে মিলে যাওয়ার ঘটনাও আছে। গত ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের অভাবনীয় জয় কোনও বুথফেরত জরিপই আঁচ করতে পারেনি। প্রতিটি সংস্থা বিজেপির আসন সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে বলেছিল, এমনকি কয়েকটি সংস্থা তো বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে বলেও বাজি ধরেছিল। সেবার তৃণমূল জিতেছিল ২১৫টি আসনে। বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন। পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে কংগ্রেস ও সিপিএম একটিও আসন জেতেনি।
স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় কখনোই পশ্চিমবঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকে প্রায় সব সময়ই সুনির্দিষ্টভাবে একটি দলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ব্যতিক্রম হয়েছে ১৯৭১ সালে। তখন প্রকৃত অর্থেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল। একদিকে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন সিপিআই-এম (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সিস্ট) পেয়েছিল ১১৩ আসন, অন্যদিকে কংগ্রেস পেয়েছিল ১০৫ আসন। ওই সময় এই ফলের নানা কারণ ছিল। যেমন—খাদ্যসংকট ও তা নিয়ে আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া বা সিপিআই ভেঙে সিপিআই-এম গঠন বা জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে বাংলা কংগ্রেস গঠন, পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী প্রবেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের শহর ও গ্রামে তাদের ধরে বামপন্থী আন্দোলনের বেড়ে ওঠা, কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীদের রক্তাক্ত সংঘাত, রাজ্যজুড়ে ছাত্র আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনকে ঘিরে ধারাবাহিক সংঘাতের জেরে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দুটি নির্বাচনে তিন দলের মধ্যে লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি। আসন ভাগ হয়েছিল কংগ্রেস, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা বাংলা কংগ্রেস ও সিপিআইএমের মধ্যে। তিনটি প্রধান দল থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল প্রবল। ফলে তিন দল ভালো রকম আসন পেয়েছিল। যদিও ১৯৭১ সালে এককভাবে এগিয়ে ছিল কংগ্রেস, তবে সরকার গঠন করেছিল বাম জোট।
সে সময়ে লড়াইটা সিপিআই–এম ও কংগ্রেসের মধ্যে ছিল। এ সময়টা বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গে সব সময়ই মানুষ একটি দলকে হাত উপুড় করে ভোট দিয়েছে। প্রথমে কংগ্রেস (১৯৪৭-৬২), তারপরে বাম জোট (১৯৭৭-২০০৬) এবং শেষে তৃণমূল কংগ্রেস (২০১১-২০২১)। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পরে কংগ্রেসের ভোট দুই ভাগ হয়ে যায়। কংগ্রেস তৃতীয় স্থানে চলে যায় এবং দ্বিতীয় স্থানে প্রথম রানার্সআপ হিসেবে ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উঠে আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু এরপরও জয়ের জন্য দীর্ঘ ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে।
এ পর্যন্ত আটটি সংস্থার জরিপে ৬টিতে বিজিপি এগিয়ে রয়েছে। আর তৃণমূল কংগ্রেস দুটিতে। ফলে এখন একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- তবে কি এবার মমতার দুর্গ ভাঙতে চলেছে বিজিপি? বুথফেরত সমীক্ষার ফল সত্যি হলে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বিজেপি।
ওদিকে, সব সমীক্ষার গড় হিসাব কষে এনডিটিভি পোল অব পোলস যা দেখাচ্ছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গে ত্রিশঙ্কু বিধানসভা হতে চলেছে। অর্থাৎ কোনো দলই নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। তাদের হিসাবটি হচ্ছে : তৃণমূল পাচ্ছে ১৪৬, বিজেপি ১৪০, কংগ্রেস ২, সিপিএম ১ ও অন্যান্য ৫টি আসন। ফলে চতুর্থবারের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নেবেন নাকি প্রথমবার বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন হতে যাচ্ছে তারজন্য ৪ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : মুহাম্মদ মোরশেদ আলম, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট