ক্যানসার ধরা পড়ার মুহূর্ত থেকেই একটি পরিবার যেন অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ যাত্রায় প্রবেশ করে। চিকিৎসা কোথায় হবে, অস্ত্রোপচার সম্ভব কি না, কেমোথেরাপির খরচ কীভাবে চলবে- এমন অসংখ্য প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় ভয়, অসহায়ত্ব ও আর্থিক চাপ। বহু পরিবার সঞ্চয় শেষ করে, সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসা চালিয়ে যায়। একজন সার্জন হিসেবে এই বাস্তবতা আমি দীর্ঘদিন ধরে খুব কাছ থেকে দেখছি। আমাদের দেশে ক্যানসার তাই শুধু একটি রোগের নাম নয়- একটি পরিবারের জন্য আতঙ্ক, অসহায়ত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপেরও নাম।
এই বাস্তবতার মধ্যেই প্রতিবেশী ভারত থেকে সম্প্রতি এসেছে শিউরে ওঠার মতো খবর- ক্যানসারের ইনজেকশনে ওষুধের বদলে পানি; সন্ধান মিলেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের। দিল্লি পুলিশের তদন্তে নকল ও অবৈধভাবে সংগৃহীত ক্যানসারবিরোধী ওষুধ বিক্রি এবং ব্যবহৃত ভায়াল পুনরায় কাজে লাগানোর অভিযোগ উঠে এসেছে। আমাদের জন্য এই খবরটি কেন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা দূরবর্তী সমস্যা নয়।
প্রথমতঃ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ওষুধ সরবরাহ, রোগীর চিকিৎসাযাত্রা এবং ক্রয়-অভ্যাসে গভীর যোগাযোগ রয়েছে- বহু বাংলাদেশি রোগী সরাসরি ভারত থেকে চিকিৎসা ও ওষুধ সংগ্রহ করেন।
দ্বিতীয়তঃ যে চক্র সীমান্তের ওপারে সক্রিয় থাকতে পারে, তার প্রভাব সীমান্তের এপারেও ছড়িয়ে পড়া একেবারে অসম্ভব নয়।
তৃতীয়তঃ এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি ওষুধ durvalumab নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা আমাদের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের
পাবলিক এলার্টেও প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই মূল প্রশ্ন- একজন রোগীর শরীরে যে ক্যানসারের ওষুধটি প্রবেশ করছে, সেটি আসল, কার্যকর এবং যথাযথভাবে সংরক্ষিত- আমরা কি তা নিশ্চিত করতে পারছি? আর এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা- এই ওষুধগুলো আসল না নকল, তা যাচাই করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আমাদের হাতে নেই।
বাংলাদেশে এই গ্রে- মার্কেট পথে আসা ওষুধের প্রকৃত পরিমাণ কত, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ক্যানসাররোধী ঔষধের উচ্চ মূল্য এবং নিবন্ধন ও সরবরাহসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা এমন গ্রে-মার্কেট তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়-সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এই সমস্যা উঠে এসেছে।
তাই বৈধ আমদানি ব্যবস্থার বাইরে থেকে আসা ক্যানসারবিরোধী ওষুধসহ বাজারে থাকা উচ্চমূল্যের ওষুধ থেকে এলোমেলোভাবে নমুনা সংগ্রহ করে স্বাধীন পরীক্ষাগারে মান যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ ওঠার অপেক্ষা না করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধে আগাম, সক্রিয় ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
একজন সার্জন হিসেবে আরেকটি প্রশ্ন আমাকে ভাবায়। যথাযথ অপারেশন ও পরবর্তী কেমোথেরাপির পরও কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে অল্প সময়ের মধ্যে ক্যানসারের পুনরাবির্ভাব দেখি। এর পেছনে টিউমারের ধরন, রোগের পর্যায়, মলিকিউলার বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসায় রেসপন্সসহ বহু বৈজ্ঞানিক কারণ থাকতে পারে।
কোনো প্রমাণ ছাড়া এমন পুনঃ আবির্ভাবকে নকল বা অকার্যকর ওষুধের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একটি বৈধ প্রশ্ন সামনে আনে- রোগী যে ওষুধটি পেয়েছেন, তার সত্যতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী? এখন কি ক্যানসারের ওষুধ দেওয়ার সময়ও মনে প্রশ্ন জাগবে- ভায়ালের ভেতরে সত্যিই কার্যকর ওষুধ আছে তো?
সমাধান তাই আতঙ্ক ছড়ানো নয়, আস্থা তৈরির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। সরকারের প্রতি অনুরোধ- বিষয়টিকে জনসমক্ষে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরুন। বিদেশ থেকে ব্যক্তিগতভাবে আনা ক্যানসাররোধী ঔষধের ক্ষেত্রে একটি সহজ, রোগীবান্ধব কিন্তু কার্যকর যাচাই-পদ্ধতি তৈরি করা প্রয়োজন। যাতে রোগী নিজেই চাইলে তাঁর ওষুধ আসল কিনা যাচাই করতে পারেন। বাজারভিত্তিক গোপন পর্যবেক্ষণ বাড়ানো এবং একটি কার্যকর নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।
উল্লেখযোগ্য, সাম্প্রতিক নকল ক্যানসার ওষুধের ঘটনার পর ভারত নিজেই ক্যানসারের ওষুধের জন্য কিউআর/ বারকোডভিত্তিক সরবরাহপথ অনুসরণ ও শনাক্তকরণ বাধ্যতামূলক করার পথে হাঁটছে- আমাদের জন্যও এটি একটি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।
নকল ক্যানসারের ওষুধ শুধু অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়। এটি একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসার সুযোগ, একটি পরিবারের শেষ সম্বল এবং একজন মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে প্রতারণা।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই এমনিতেই কঠিন। অন্তত রোগী ও তাঁর পরিবারকে এই নিশ্চয়তাটুকু দিতে হবে- যে জীবনরক্ষাকারী ওষুধটির ওপর তাঁরা শেষ আস্থা রেখেছেন, সেটি নিরাপদ, আসল ও কার্যকর।
জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মান ও নিরাপত্তায় কোনো আপস নয়।
লেখক: চেয়ারম্যান, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া


















