চট্টগ্রাম বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কারও মুখে হাসি কেউ ‘আতঙ্কিত’

সাইফুল আলম

২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:২৫ অপরাহ্ণ

নতুন পে স্কেল ঘোষণায় সরকারি চাকরিজীবীদের মুখে হাসি ফুটলেও বেসরকারি চাকরিজীবী কিংবা অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী ‘আতঙ্কিত’ হয়ে পড়েছেন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন পে-স্কেলের কারণে খাদ্য ও খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তাই এই চাপ সামাল দিতে সরকারকে ‘ব্যয় সংকোচন নীতি’ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

 

১১ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর সোমবার নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে এক লাফে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। প্রথম গ্রেডে নির্ধারিত বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। পাশাপাশি পেনশন ও বিভিন্ন ভাতাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সরকার একসঙ্গে পুরো বেতন কাঠামো কার্যকর করছে না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে। মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হওয়ার কথা। প্রচলিত সাধারণ প্রবণতা হলো, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তারা বেশি পণ্য ও সেবা কিনেন। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যবসা- বাণিজ্যে। কিন্তু বাজারে সেই বাড়তি চাহিদা মেটানোর মতো পণ্য না থাকলে দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিবে।

 

এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সীমিত আয়ের বেসরকারি কর্মীদের ওপর। বাজারে দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ বাড়লেও অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত বেতন বাড়ানোর কোনো নীতি নেই। এর ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। মধ্যবিত্ত- নিম্নবিত্ত মানুষকে তাই বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন খরচ কমাতে হয়। ভাঙতে হয় সঞ্চয়। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তা, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান ও আয়ের অনিশ্চয়তা-দুইয়ের ব্যবধান এক ধরনের সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।

 

মঙ্গলবার সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও স¤প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান স্বীকার করে বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক মানুষের বেতন বাড়লে কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে নতুন বেতন কাঠামোয় সবার বেতন দ্বিগুণ হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়।’

 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন না হওয়া এবং এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার কারণে বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। এর সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতা বাড়ানো জরুরি। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে সমস্যা দেখা দিতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের হাতে বাড়তি অর্থ এলেও বাজারে খাদ্যপণ্য, বাড়ি, পরিবহন, চিকিৎসা বা অন্যান্য সেবার সরবরাহ যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

 

কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কম। বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মীদের আয় বড় হারে বাড়লেও অন্য শ্রেণি অর্থাৎ বেসরকারি চাকুরেদের আয় না বাড়লে শ্রমবাজারে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। তবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে যদি কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি ও জনসেবার মান বাড়ানো যায়, তাহলে এই ব্যয়কে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বিনিয়োগে পরিণত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

 

বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের দ্বিগুণ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত এই যে বেতন বৃদ্ধি এতে কিন্তু অন্যান্য বেসরকারি খাতেও; শিল্প- কলকারখানা, অন্য জায়গাতেও চাপ বাড়বে।’ বর্ধিত বেতনের অর্থ যোগাতে সরকারের অন্যান্য অগুরুত্বপূর্ণ ব্যয় কমানোর পরামর্শ বিশ্লেষকদের।

 

নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের উচিত হবে এখন কীভাবে বেতন-ভাতাদি এবং অন্যান্য ব্যয় কমানোর জন্য একটি উৎপাদনশীলতা কমিশন করে কোন কোন জায়গাগুলোতে ব্যয় কমাবে সেটির লক্ষ্যে কাজ করা। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর তাগিদ দেন তিনি।

 

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি ফজলুল হাকিম লালা অবিলম্বে সরকারকে শ্রমিকদের জন্যও একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করার দাবি জানান। বলেন, বাজারদরের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি। বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা মজুরি শোষণের শিকার হচ্ছেন এবং প্রকৃত মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

নতুন পে স্কেলকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন শ্রমিকদের জন্যও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং যেসব খাতে দীর্ঘদিন মজুরি পুনর্নির্ধারণ হয়নি, সেখানে দ্রæত মজুরি বোর্ড গঠন করার দাবি জানান।

 

তবে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন-জ্বালানি সংকটের কারণে দেশীয় শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে রপ্তানি আয়। নাকাল এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হলে সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট