চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

এআই যুগে চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক তথ্য হোক সংলাপের, সংঘাতের নয়

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

চিকিৎসকের চেম্বারে এখন নতুন একটি দৃশ্য ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। রোগী বা তাঁর স্বজন মোবাইল হাতে জানতে চাইছেন ‘-এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) বলছে এই পরীক্ষাটি দরকার, আপনার মত কী?’, ‘এই ওষুধটি কি আরও কার্যকর?’ কিংবা ‘অপারেশন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প আছে কি?’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসাবিষয়ক বিপুল তথ্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে এনে দিয়েছে। ফলে রোগী এখন আগের চেয়ে বেশি তথ্যসমৃদ্ধ, প্রশ্নশীল এবং নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্তে অংশ নিতে আগ্রহী। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক একটি পরিবর্তন। একজন সচেতন রোগী বা তাঁর পরিবার যখন নিজের অসুখ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তা আলোচনাকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

 

তাহলে সমস্যা ঠিক কোথায়? তথ্য জানা সমস্যা নয়; সচেতন রোগী বরং চিকিৎসার জন্য সহায়ক। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন রোগী এআই তথ্যকে ব্যক্তিনির্ভর চিকিৎসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেন, আর চিকিৎসক রোগীর সেই তথ্য উপস্থাপন বা প্রশ্ন করাকে নিজের পেশাগত দক্ষতার প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন।

 

বর্তমান প্রজন্ম জেন-জি বদলে দিচ্ছে চেম্বারের ভাষা। ডিজিটাল জগতে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম তথ্য খোঁজে, তুলনা করে, দ্বিতীয় মতামত চায় এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি জানতে চায়। একে চিকিৎসকের প্রতি অনাস্থা ভাবলে ভুল হবে-এটি বরং তথ্যসচেতনতা ও নিজের চিকিৎসায় সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি নতুন সংস্কৃতি। বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব। এক সময়ের চিকিৎসক ভাল বুঝেন (ডক্টর নোজ বেস্ট) সম্পর্ক দ্রুত ‘শেয়ারড ডিসিশন মেকিংয়ের’ দিকে এগোচ্ছে। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তনের জন্য চিকিৎসক ও রোগী-দুই পক্ষকেই প্রস্তুত হতে হবে।

 

আরেকটি নতুন বাস্তবতা হলো প্রযুক্তি-সচেতন প্রজন্মের অনেক রোগী এখন চিকিৎসকের পরামর্শ মোবাইলে রেকর্ড করতে চান। প্রথম শুনলে এটি অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু এর পেছনের যুক্তিটুকু অস্বীকার করা যায় না-জটিল নির্দেশনা মনে রাখা, বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করা কিংবা প্রয়োজনে পরে আবার শোনার জন্য এটি বাস্তবিক প্রয়োজন থেকেই আসে। পারস্পরিক সম্মতিতে করা এমন রেকর্ডিং চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে বোঝাপড়া আরও বাড়াতে পারে। তবে অনুমতি ছাড়া গোপনে রেকর্ড করা বা রেকর্ড করা কথোপকথন অন্যত্র প্রচার করা-এটি সম্পর্কের মূল ভিত্তি অর্থাৎ আস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

 

আগামী দিনের রোগী হবেন আরও তথ্যসমৃদ্ধ, আরও প্রশ্নশীল এবং নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্তে আরও অংশগ্রহণকারী। ফলে চিকিৎসকের ভূমিকাও বদলাবে। শুধু রোগ নির্ণয় ও প্রেসক্রিপশন দেওয়া নয়-তথ্যের ভিড় থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্যটি চিনতে রোগীকে সাহায্য করাও চিকিৎসকের নতুন দায়িত্বের অংশ হয়ে উঠবে। যথাযথ কাউন্সেলিং বাড়তি সৌজন্য নয়, চিকিৎসারই অংশ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রতিটি রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ সব সময় থাকে না। এক্ষেত্রে কনসাল্টেশন বে-তে নির্ভরযোগ্য বাংলা ডিজিটাল রিসোর্স ও সহজবোধ্য তথ্য-লিফলেট রাখা গেলে রোগীর প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সহজ হবে এবং সীমিত সময়ের মধ্যেও চিকিৎসক-রোগীর যোগাযোগ অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো-একই রোগ হলেও কখনো একই রোগী নয়। বয়স, রোগের পর্যায়, সহ-অসুস্থতা, শারীরিক সক্ষমতা, পরীক্ষার ফল, পূর্ববর্তী চিকিৎসা, এমনকি রোগীর ব্যক্তিগত পছন্দ-সব মিলিয়েই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত হয়। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করতে পারে, এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়তা করতে পারে। কিন্তু রোগীর চোখের অনিশ্চয়তা বোঝা, তাঁর ভয়ের কারণ শোনা এবং কঠিন মুহূর্তে মানবিকভাবে পাশে থাকা- এই কাজ এখনো মানুষের।

 

প্রযুক্তি বাড়ুক, মানবিকতাও বাড়ুক-এআই চিকিৎসকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, রোগীও চিকিৎসকের প্রতিপক্ষ নন। এআই দিতে পারে তথ্য; চিকিৎসক যোগ করেন রোগীর সামগ্রিক ক্লিনিক্যাল অবস্থা, অভিজ্ঞতা ও বিচারবোধ আর রোগী নিয়ে আসেন নিজের অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ ও পছন্দ। এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা সিদ্ধান্ত।

 

এআই যুগে চিকিৎসক- রোগীর কথোপকথনের নতুন সংস্কৃতি হতে পারে এমন-
রোগী: ‘এআই থেকে এই তথ্যটি পেয়েছি। আমার ক্ষেত্রে এটি কতটা প্রযোজ্য?’
চিকিৎসক: ‘চলুন, আপনার সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে দেখি তথ্যটি আপনার ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক।’

 

হয়তো এই ছোট্ট সংলাপই এআই-কে সংঘাতের উৎস না বানিয়ে পারস্পরিক আস্থা, অংশীদারত্ব ও ‘শেয়ারড ডিসিশন মেকিং’-এর সেতু হয়ে উঠতে পারে।
এআই আমাদের আরও তথ্যসমৃদ্ধ করুক। তথ্য হোক সংলাপের সূচনা- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। প্রযুক্তি বদলাবে, চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়ে যাবে; কিন্তু চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন সেই মানুষটি-রোগী।

 

লেখক: চেয়ারম্যান, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট