চট্টগ্রাম সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

কূটনৈতিক সুযোগ, না কি কৌশলগত ফাঁদ?

মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশ

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৩১ আগস্ট, ২০২৬ | ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ

মক্কা-মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র নগরী। সেই মক্কাতেই ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- তিন দেশের যেকোনো একটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র আগ্রাসনকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে চুক্তিটিকে অনেকেই ন্যাটোর কালেক্টিভ- ডিফেন্স প্রিন্সিপালের সঙ্গে তুলনা করছেন। তবে এটিকে এখনই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলা ঠিক হবে না; ন্যাটোর মতো সমন্বিত সামরিক কমান্ড, দীর্ঘদিনের অপারেশনাল স্ট্রাকচার কিংবা পূর্ণাঙ্গ কালেক্টিভ ওয়ার প্ল্যানিং এখনো এর নেই।
তবে বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তি যে শুধু ধর্মীয় বা প্রতিরক্ষাগত কোনো বিষয় নয়, তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স গত ২৫ আগস্ট জানায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, ঢাকা মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এ বিষয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এরপর ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে বাংলাদেশ তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখনো সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি; বরং সম্ভাবনাটি খোলা রেখেছে। এই মুহূর্তে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা।

 

এতে যোগ দেওয়া কি উচিত হবে বাংলাদেশের?
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করা অবশ্যই বাংলাদেশের স্বার্থে; কিন্তু একটি কালেক্টিভ- ডিফেন্স এলায়েন্সের পূর্ণ সদস্য হওয়ার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হবে। কারণ এর লাভ যেমন আছে, তেমনি এর জিওপলিটিক্যাল কস্টও যথেষ্ট।

 

মক্কা প্যাক্টের শক্তির সমীকরণ
চুক্তির তিন সদস্য তিন ধরনের শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
সৌদি আরব- বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক ও বিপুল সভরেইন ক্যাপিটালের অধিকারী।
তুরস্ক- ন্যাটো সদস্য, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং দ্রুত বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্পের দেশ; বিশেষ করে ড্রোন ও অন্যান্য ডিফেন্স টেকনোলোজিতে তার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য।
পাকিস্তান- বড় সামরিক শক্তি এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র।
তাই তিন দেশের সমন্বয় শুধু সামরিক নয়- অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, জ্বালানি, ইন্টেলিজেন্স ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে- এমন কথা স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বলেনি। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোন জোট কী বলছে তার চেয়ে অন্য দেশগুলো সেটিকে কীভাবে দেখছে তা গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই ভারত, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন- সবাই এই নতুন সমীকরণকে গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করবে।

 

বাংলাদেশের জন্য প্রথম বাস্তবতা: সৌদি আরব
বাংলাদেশের মক্কা প্যাক্ট আলোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক যুক্তি হলো সৌদি আরব। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেকর্ড প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছেÑ যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। ২০২৫ সালে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ছিল; আগের বছরের তুলনায় তা প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে আইওএম’র তথ্যেও দেখা যায়।
অর্থাৎ সৌদি আরব বাংলাদেশের কাছে শুধু একটি বন্ধুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ নয়। এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
লাখ লাখ বাংলাদেশি সৌদি আরবে কর্মরত। তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করে, আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়তা করে এবং দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করে।
তাই সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ। কিন্তু রেমিট্যান্সের চেয়েও বড় বিষয়-বিনিয়োগ। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো পর্যাপ্ত বিদেশি বিনিয়োগ না আসা।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের নেট এফডিআই বেড়ে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে যা ২০২৪ সালের ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। এটি ইতিবাচক খবর হলেও বাংলাদেশের প্রয়োজনের তুলনায় পরিমাণটি এখনো অপ্রতুল।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর অধীনে দেশটি বিপুল বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ যদি সেই ক্যাপিটালের একটি অংশ আকর্ষণ করতে পারে, তাহলে জ্বালানি, পরিবহন ব্যবস্থা, বন্দর, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, উৎপাদন, আবাসন, পর্যটন, গ্যাস অবকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এখানে মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের জন্য একটি ডিপ্লোমেটিক লিভারেজ তৈরি করতে পারে।

 

স্পষ্ট করতে হবে একটি বিষয়:
প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিলেই সৌদি বিনিয়োগ আসবে- এমন কোনো অর্থনৈতিক সূত্র নেই। সৌদি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবেন যদি তাঁরা নীতির স্থায়িত্ব, দ্রুত অনুমোদন, জমির নিশ্চয়তা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, কর ও শুল্কের স্বচ্ছতা, মুনাফা রিপাট্রিয়েশনের নিশ্চয়তা, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন দেখতে পান।
অতএব, বাংলাদেশের উচিত মক্কা প্যাক্টকে সৌদি ইকোনোমিক পার্টনারশিপের দরজা খোলার কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা- বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে নয়।

 

দ্বিতীয় বাস্তবতা: পাকিস্তান
১৯৭১-এর ইতিহাস বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ককে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আলাদা করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থির নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের বরফ গলছে। বাণিজ্য, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। এটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়।
কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আর পাকিস্তানের কালেক্টিভ- ডিফেন্স এলায়েন্স’র সদস্য হওয়া এক বিষয় নয়।
প্রথমটি বাইলেটারেল ডিপ্লোমেসি এবং দ্বিতীয়টি স্ট্র্যাটেজিক এলাইনমেন্ট। এই পার্থক্যটি ঢাকা যত স্পষ্টভাবে বুঝবে, তত ভালো।

 

বড় প্রশ্ন ভারত
মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের যোগদানের সবচেয়ে বড় জিওপলিটিক্যাল কস্ট সম্ভবত এখানেই। ভারত ও পাকিস্তান দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক যতই স্বাভাবিক হোক, ঢাকা যদি পাকিস্তানের সঙ্গে একটি কালেক্টিভ- ডিফেন্স এরেইঞ্জমেন্ট’র অংশ হয়, তাহলে দিল্লি সেটিকে নিছক বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক হিসেবে দেখবে না।
রয়টার্সের বিশ্লেষণেও সতর্ক করা হয়েছে যে মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের যোগদান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী। স্থলসীমান্ত, নদীর পানি, সীমান্ত নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, ট্রানজিট, কানেক্টিভিটি এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ- সবকিছুর সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই ভারতকে পছন্দ করা বা না করার প্রশ্ন নয়। ভারতের সঙ্গে কাজ করা বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক নেসেসিটি। একইভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করাও বাংলাদেশের অধিকার।
কিন্তু বাংলাদেশের কূটনীতি এমন হওয়া উচিত যাতে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ককে দিল্লি-বিরোধী এলায়েন্স হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ না থাকে।

 

ইরান: অদৃশ্য আরেকটি সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনীতিতে ইরানকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।
সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্কের উন্নতি যেমন হয়েছে, তেমনি তাদের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক রিভালরিও পুরোপুরি শেষ হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। বাংলাদেশের কোনো পক্ষের হয়ে এই প্রতিযোগিতায় ঢোকার প্রয়োজন নেই।
আমাদের প্রয়োজন- জ্বালানি, শ্রমবাজার, বাণিজ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্য পলিসি হওয়া উচিত মাল্টি ভেক্টর ডিপ্লোমেসি।

 

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকেও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামরিক সরবরাহকারী চীন। সাম্প্রতিক রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চীনের J-10CE যুদ্ধবিমান ও এটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আলোচনায় এগোচ্ছে।
অর্থাৎ একদিকে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ডিফেন্স কো- অপারেশন বাড়াচ্ছে; অন্যদিকে সৌদি- তুরস্ক- পাকিস্তান ডিফেন্স আর্কিটেকচার-এ যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। এটি বাংলাদেশের জন্য সুযোগও, আবার সূক্ষ্ম ডিপ্লোমেটিক ব্যালেন্সিং-এর পরীক্ষাও।
অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজার অপরিহার্য।
অতএব বাংলাদেশ এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না, যাতে ওয়াশিংটন বা বেইজিং মনে করে ঢাকা স্থায়ীভাবে কোনো একটি জিওপলিটিক্যাল ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছে।

 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল পরীক্ষা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুল উদ্ধৃত নীতি- ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ আজকের মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ডে এই নীতিকে নতুন অর্থে ব্যবহার করতে হবে।
এখন প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়- ‘আমরা কার পক্ষে?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত- ‘বাংলাদেশের স্বার্থে আমরা কার সঙ্গে কী করতে পারি?’
সৌদি আরবের সঙ্গে বিনিয়োগ ও শ্রমিক; চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও ডিফেন্স, ভারতের সঙ্গে কানেক্টিভিটি ও বাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এক্সপোর্ট ও টেকনোলজি, জাপানের সঙ্গে কোয়ালিটি ইনফ্রাস্ট্র্যাকচার, তুরস্কের সঙ্গে ডিফেন্স টেকনোলজি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোঅপারেশন, পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রেড ও হিস্ট্রিক্যাল রিকনসিলিয়েশন। সবগুলোই একসঙ্গে সম্ভব। এটাই স্ট্র্যাটিজিক এটোনমি।

 

তাহলে মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
বাংলাদেশের বিবেচনার জন্য তিনটি পথ রয়েছে। এক. এখনই পূর্ণ সদস্য হওয়া। এতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দ্রুত বাড়তে পারে। কিন্তু এর স্ট্র্যাটিজিক কস্টও সবচেয়ে বেশি।
দুই. সরাসরি প্রত্যাখ্যান। এতে ডিপ্লোমেটিক রিস্ক কমবে। কিন্তু সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ডিফেন্স কো-অপারেশনের একটি নতুন সুযোগ হারাতে পারে বাংলাদেশ।
তিন. ‘কৌশলগত অংশীদার হওয়া’- আমার পছন্দ। বাংলাদেশ পূর্ণ সদস্য না হয়ে- জয়েন্ট মিলিটারি ট্রেনিং, কাউন্টার টেরোরিজম, ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট, মেরিটাইম সিকিউরিটি, ইন্টেলিজেন্স কো- অপারেশন, ডিফেন্স টেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, পিস কিপিং, ডিফেন্স প্রোডাকশন ইত্যাদিতে সহযোগিতা করতে পারে। এর মাধ্যমে সুবিধা নেওয়া যাবে, কিন্তু কালেক্টিভ ওয়ার অবলিগেশন থেকে দূরে থাকা সম্ভব হবে।

 

বাংলাদেশের জন্য সাতটি করণীয়
প্রথমত: মক্কা প্যাক্টে যোগদানের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট প্রকাশ করা উচিত।
দ্বিতীয়ত: সৌদি আরবের সঙ্গে ডিফেন্স এগ্রিমেন্টের পাশাপাশি একটি কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
তৃতীয়ত: সৌদি ভিশন ২০৩০-এর সঙ্গে এনার্জি, পোর্ট, লজিস্টিকস, এগ্রিকালচার, ফার্মাসিটিক্যালস, ম্যানুফ্যাকচারিং আই টুরিজমে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট প্রজেক্ট পাইপলাইন তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত: সৌদি শ্রমবাজারে শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে দক্ষ জনশক্তির অংশ বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত: তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ডিফেন্স কো- অপারেশন বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু তা কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে ডাইরেক্টেড এলায়েন্স হিসেবে যেন প্রতীয়মান না হয়।
ষষ্ঠত: ভারতকে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে- বাংলাদেশের সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক সম্পর্ক কোনো এন্টি-ইন্ডিয়া প্রজেক্ট নয়।
সপ্তমত: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- বাংলাদেশকে কোনো পার্মানেন্ট জিওপলিটিক্যাল ব্লকে আবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

অর্থনীতির জন্য আসল হিসাব

মক্কা প্যাক্টের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক লাভকে বাস্তবতার মাপকাঠিতে বিচার করলে চিত্রটি এমন- রেমিট্যান্স: বড় সম্ভাবনা। শ্রমবাজার: বড় সম্ভাবনা।
সৌদি বিনিয়োগ: অত্যন্ত বড় সম্ভাবনা- কিন্তু তা চুক্তির স্বয়ংক্রিয় ফল নয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা: সম্ভাবনা রয়েছে।
ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি: তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এফডিআই: পরোক্ষভাবে ইতিবাচক হতে পারে, যদি কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। কিন্তু বিপরীত দিকে-
ইন্ডিয়া রিস্ক: উচ্চ।
ইরান/ মধ্যপ্রাচ্য এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট: মাঝারি থেকে উচ্চ।
ইউএস/ ওয়ের্স্টান পারসেপশন: সতর্কতার বিষয়।
চীনা- জিআই স্ট্র্যাটেজিক ক্যালকুলেশন: চীন গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, লাভ এবং ঝুঁকির ভারসাম্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম।
মক্কা প্যাক্ট নয়, বাংলাদেশের দরকার ‘মক্কা কূটনীতি’। বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বুদ্ধিমান কৌশল হতে পারে মক্কা প্যাক্টকে একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা। নিজেকে কোনো নতুন জিওপলিটিক্যাল ব্লকের মধ্যে আটকে না ফেলা।
সৌদি আরবকে বলতে হবে- আমরা আপনার নিরাপত্তা উদ্বেগ বুঝি; আপনিও বাংলাদেশের ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে’ অগ্রাধিকার দিন।
তুরস্ককে বলতে হবে- ডিফেন্স কো- অপারেশনের সঙ্গে টেকনোলজি ট্রান্সফার ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্টনারশিপ চাই।
পাকিস্তানকে বলতে হবে- অতীতকে অস্বীকার নয়, কিন্তু ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়াতে চাই।
ভারতকে বলতে হবে- আমাদের নতুন বন্ধুত্ব আপনাদের বিরুদ্ধে নয়। চীনকে বলতে হবে- আমাদের স্ট্যাটেজিক পার্টনারশিপ থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের ফরেন পলিসি কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে বলতে হবে- বাংলাদেশ রিমেইনস ওপেন, প্রাগমেটিক এন্ড কমার্শিয়ালি এনগেজড। এটাই হবে পরিণত কূটনীতি।
বাংলাদেশের আজকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সামরিক শক্তি নয়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার ভূ-অবস্থান, বিশাল জনশক্তি, বাজার এবং ডিপ্লোমেটিক ফ্ল্যাক্সিবিলিটি।
২০২৫ সালে নেট এফডিআই মাত্র ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার- এই দুটি সংখ্যা বাংলাদেশের বাস্তব অগ্রাধিকার স্পষ্ট করে দেয়।
আমাদের দরকার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও রপ্তানি।
সুতরাং মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য ‘জয়’ বা ‘পরাজয়’-এর প্রশ্ন নয়। এটি একটি বার্গেইনিং অপরচুনিটি।
সফল কূটনীতি হবে তখনই, যখন বাংলাদেশ মক্কা থেকে শুধু একটি প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি নয়, সৌদি বিনিয়োগ, বর্ধিত শ্রমবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ফিরতে পারবে।
কিন্তু একই সঙ্গে যদি দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়, ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের সঙ্গে স্ট্র্যাটিজিক মিসআন্ডারস্ট্রান্ডিং তৈরি হয়, কিংবা বাংলাদেশ কোনো মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের পক্ষ হয়ে পড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক লাভের চেয়ে জিওপলিটিক্যাল কস্ট অনেক বড় হয়ে যেতে পারে।
তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর নীতি হতে পারে, ‘বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, বাণিজ্য সবার সঙ্গে; নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রয়োজনমতো, কিন্তু কোনো শক্তির বলয়ে বন্দী নয়।’
মক্কা প্যাক্টে স্বাক্ষর করাই কূটনৈতিক সাফল্য নয়। মক্কাকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে কাজে লাগাতে পারাই হবে সাফল্য।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট