চট্টগ্রাম বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

মন্তব্য প্রতিবেদন

এতটা আমদানিনির্ভর হলাম কেন?

জ্বালানি সংকট

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক বছর ধরে গ্যাসের ঘাটতি, শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাধা এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতা আমাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকট আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে-স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমরা এতটা বিদেশনির্ভর কেন?
দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। গ্যাসের ক্ষেত্রেও দেশীয় উৎপাদন কমছে, আর ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের মাটির নিচে এবং বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল-গ্যাসের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি অনুসন্ধান করা হয়নি।
তাহলে প্রশ্নটি শুধু ‘আমাদের তেল-গ্যাস আছে কি না’- এমন নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি যথেষ্ট খুঁজেছি?

 

আমদানি যেন সহজ সমাধান হয়ে গেছে
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতির সামর্থ্য সীমিত ছিল। তখন বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা ছিল অনেকটাই অনিবার্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে, শিল্পায়ন হয়েছে, বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। সেই সঙ্গে জ্বালানি অনুসন্ধানও সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
তিতাস, হবিগঞ্জ, রশিদপুর, কৈলাসটিলা, বিবিয়ানা-দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ওপর আমরা কয়েক দশক ধরে নির্ভর করেছি। কিন্তু নতুন অনুসন্ধানের গতি সেই তুলনায় ছিল ধীর। ফলে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে এমন-
দেশীয় গ্যাস কমছে → এলএনজি আমদানি বাড়ছে → বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে→আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সংকট তীব্র হচ্ছে।
এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে সংকট মোকাবিলার একটি পদ্ধতি।

 

বাপেক্স কেন আরও শক্তিশালী হল না?
১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশীয়ভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সক্ষমতা তৈরি করা।
কিন্তু প্রায় চার দশক পরও বাপেক্সকে বিশ্বের মানসম্পন্ন একটি জাতীয় অনুসন্ধান কোম্পানিতে পরিণত করতে আমরা কতটা সফল হয়েছি, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বর্তমান সরকার অবশ্য এই জায়গায় কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বাপেক্সের অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়াতে নতুন খননযন্ত্র সংগ্রহের পরিকল্পনা চলছে। জুলাই ২০২৬-এ বাপেক্সের মাধ্যমে তিনটি নতুন কূপ-একটি মূল্যায়ন ও উন্নয়ন কূপ এবং দুটি অনুসন্ধান কূপ-খননের জন্য ৭২৯ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আরও বড় পরিকল্পনা হলো, ২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে ৫৮টি তেল ও গ্যাস কূপ খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা।
এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এত বড় উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া হল না কেন? কারণ একটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে পরে সেখান থেকে ফল পাওয়া এবং সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে কয়েক বছর লেগে যায়। তাই জ্বালানি অনুসন্ধানকে প্রকল্পভিত্তিক নয়, ধারাবাহিক জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে নিতে হবে।

 

পুরনো গ্যাসক্ষেত্রের ওপর অতিনির্ভরতা
দেশের গ্যাস উৎপাদন কমার একটি কারণ পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস। এখানে শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র খোঁজাই যথেষ্ট নয়। পুরোনো ক্ষেত্রগুলোরও আধুনিক মজুত ব্যবস্থাপনা দরকার। নতুন ভূকম্পন জরিপ, মজুতের মডেল প্রণয়ন, চাপ বৃদ্ধি, কূপ মেরামত, পার্শ্বকূপ খনন ও উন্নত পুনরুদ্ধার পদ্ধতির মাধ্যমে বিদ্যমান ক্ষেত্র থেকে আরও গ্যাস আহরণ সম্ভব কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ নতুন গ্যাস আবিষ্কারের অপেক্ষায় থেকে পুরোনো গ্যাস নষ্ট করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।

 

ভোলায় গ্যাস পড়ে আছে, আমরা এলএনজি কিনছি
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি বড় বৈপরীত্য হচ্ছে ভোলা। ভোলার তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে মোট সম্ভাব্য মজুত প্রায় ১ হাজার ৪৩২ বিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে বলে পেট্রোবাংলার সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অথচ সেখান থেকে এখন পর্যন্ত ২০০ বিলিয়ন ঘনফুটেরও কম গ্যাস উত্তোলন হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে যখন গ্যাসের ঘাটতি, তখন ভোলার গ্যাস কীভাবে দ্রুত ও অর্থনৈতিকভাবে জাতীয় গ্রিডে আনা যায়, সেটি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
এখানে প্রশ্নটি খুবই সরল-দেশের ভেতরে ব্যবহারযোগ্য গ্যাস থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন প্রথমে বিদেশ থেকে গ্যাস কিনব?
ভোলার গ্যাস মূল ভূখ-ে আনার জন্য পাইপলাইন, প্রক্রিয়াকরণ ও সঞ্চালন অবকাঠামোর প্রয়োজন- একথা ঠিক। কিন্তু সেই বিনিয়োগের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করতে হবে এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে।

 

সবচেয়ে বড় অপূর্ণ সম্ভাবনা বঙ্গোপসাগর
বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত; বঙ্গোপসাগর। ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশাল সমুদ্রাঞ্চলের ওপর অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু এরপরও সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ ২৪টি সমুদ্রভিত্তিক ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করেছিল। দীর্ঘ সময়েও কোনো কোম্পানি আনুষ্ঠানিক দরপত্র জমা দেয়নি। এই ব্যর্থতা থেকে সরকার এবার শিক্ষা নিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
২০২৬ সালের মে মাসে নতুন করে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি সমুদ্রভিত্তিক ব্লক-১১টি অগভীর পানির এবং ১৫টি গভীর পানির-আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। সংশোধিত উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তিতে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমাতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, ব্যয় পুনরুদ্ধার, পাইপলাইন বিনিয়োগ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এবার দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর ২০২৬। এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এখানেও একটি কথা মনে রাখতে হবে-দরপত্র আহ্বান কোনো আবিষ্কার নয়। সাফল্য মাপতে হবে অন্যভাবে- কতটি কোম্পানি দরপত্র জমা দিল, কতটি ব্লক বরাদ্দ হলো, কবে ভূকম্পন জরিপ শুরু হলো, কবে প্রথম অনুসন্ধান কূপ খনন হলো এবং শেষ পর্যন্ত কতটি বাণিজ্যিক আবিষ্কার হলো।

 

কেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগে আসেনি?
আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি কোনো দেশে শুধু সম্ভাবনার কথা শুনে বিনিয়োগ করে না। তারা দেখে ভূতাত্ত্বিক তথ্য, আর্থিক শর্ত, গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, ব্যয় পুনরুদ্ধার, করব্যবস্থা, পাইপলাইন অবকাঠামো, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্থিতিশীলতা।
বাংলাদেশের আগের সমুদ্রভিত্তিক দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ ছিল। তাই নতুন উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে শর্ত শিথিল করা নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু এখানে ভারসাম্যও জরুরি।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ যেন দুর্বল না হয়; আবার জাতীয় স্বার্থের নামে এমন শর্তও দেওয়া যাবে না, যাতে কোনো বিনিয়োগকারী ঝুঁকি নিতে রাজি না হয়। একটি ভালো উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত-রাষ্ট্র ও বিনিয়োগকারী উভয়ের জন্য ন্যায্য ঝুঁকি ও ন্যায্য প্রত্যাবর্তন।

 

এলএনজি আমাদের বাঁচিয়েছে, নিরাপদ করেনি
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। এতে বিদ্যুৎ ও শিল্পের কিছু চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এলএনজি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিকল্প নয়। কারণ এর সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, তরলীকরণ ব্যয়, জাহাজে পরিবহন, পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর, বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটেও দেখা গেছে, আমদানিকৃত এলএনজি খালাসে সমস্যা হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। আগস্টে প্রধানমন্ত্রীও বলেছিলেন, এলএনজি খালাসে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যার কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা স্বাভাবিক হবে।
এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়- একটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা যদি আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার একটি ছোট বিঘ্ন ও বড় জাতীয় সংকট তৈরি করতে পারে।

 

গ্যাস সংকট মানে শুধু বিদ্যুৎ সংকট নয়
গ্যাস বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান জ্বালানি। গ্যাসের ঘাটতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। সার কারখানা বন্ধ হতে পারে। রপ্তানি কমতে পারে। কর্মসংস্থানে চাপ পড়ে।
অর্থাৎ- গ্যাস সংকট → বিদ্যুৎ সংকট → শিল্প উৎপাদন কমে → রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় → কর্মসংস্থানে চাপ তৈরি হয় → মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
এই কারণে জ্বালানি নিরাপত্তাকে আর শুধু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়।

 

তেলের ক্ষেত্রে বাস্তবতা আরও কঠিন
গ্যাসের তুলনায় বাংলাদেশের তেলসম্পদের সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য অনেক কম।
১৯৮৬ সালে সিলেটের হরিপুরে অপরিশোধিত তেল আবিষ্কার হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে উৎপাদনও শুরু হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা- কোনো একটি তেল আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে তেলনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা যায় না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়া মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ। এখানে ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু মনে রাখতে হবে- শোধনাগার নিরাপত্তা আর জ্বালানি নিরাপত্তা এক জিনিস নয়।
শোধনাগার আমদানি করা অপরিশোধিত তেল বা পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিশোধন করতে পারে; ভূগর্ভে নতুন তেল সৃষ্টি করতে পারে না। তাই শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত, সরবরাহকারী দেশের বৈচিত্র্য, জ্বালানি সাশ্রয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগও জরুরি।

 

তাহলে ৫৫ বছরে কোথায় ভুল হলো?
কয়েকটি জায়গায় আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতা স্পষ্ট।
প্রথমত : অনুসন্ধানে ধারাবাহিকতা ছিল না। সরকার বদলেছে, অগ্রাধিকার বদলেছে; কিন্তু ১০-১৫ বছরের একটি জাতীয় অনুসন্ধান কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
দ্বিতীয়ত : বাপেক্সকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
তৃতীয়ত : সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধানে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে।
চতুর্থত : বিনিয়োগ কাঠামো বারবার পরিবর্তিত হয়েছে।
পঞ্চমত : ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদে ঘাটতি ছিল।
ষষ্ঠত : আমরা আমদানিকে অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচনা করেছি।
আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-জ্বালানি অনুসন্ধানের ফল পেতে সময় লাগে বলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তার গুরুত্ব অনেক সময় কমে গেছে।
একটি এলএনজি কার্গো আজ কেনা যায়। কিন্তু একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে বছর লাগে। এই সময়ের ব্যবধানই আমাদের নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে।

 

তাহলে এখন কী করা উচিত?
বর্তমান সরকারের নতুন উদ্যোগগুলোকে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করা দরকার।
২০২৬-২০৪০ জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা : কতটি ভূকম্পন জরিপ হবে, কতটি অনুসন্ধান কূপ হবে, কতটি মূল্যায়ন কূপ হবে, কত বিলিয়ন ঘনফুট মজুত যোগ হবে এবং প্রতিদিন কত মিলিয়ন ঘনফুট নতুন উৎপাদন হবে-সবকিছুর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকতে হবে। প্রতি ছয় মাসে অগ্রগতির হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
২৬টি সমুদ্রভিত্তিক ব্লককে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া : ৩০ নভেম্বরের দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়ের পর যত দ্রুত সম্ভব সফল দরদাতাদের নির্বাচন করতে হবে। এরপর চুক্তি প্রদান, ভূকম্পন জরিপ ও খননের মধ্যে অযথা প্রশাসনিক বিলম্ব যেন না হয়।
বাপেক্সের আমূল সংস্কার : বাপেক্সকে শুধু সরকারি কোম্পানি নয়, আন্তর্জাতিক মানের জাতীয় অনুসন্ধান কোম্পানি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক ভূকম্পন প্রযুক্তি, খনন সরঞ্জাম, মজুতের মডেল প্রণয়ন, দক্ষ ভূতত্ত্ববিদ এবং আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগ-সবকিছুর প্রয়োজন।
ভোলার গ্যাসের দ্রুত ব্যবহার : ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার সবচেয়ে অর্থনৈতিক পথ কোনটি, তা দ্রুত নির্ধারণ করতে হবে।
পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পুনরুদ্ধার : নতুন ক্ষেত্রের পাশাপাশি পুরোনো ক্ষেত্রের অবশিষ্ট গ্যাসও অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনের চেষ্টা করতে হবে।
কেবল কূপ খনন নয় ফলাফলই মাপকাঠি : কতটি কূপ খনন হলো, সেটি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রতিটি কূপের ক্ষেত্রে জনগণকে জানাতে হবে- কত খরচ হলো, কী পাওয়া গেল, কত মজুত যোগ হলো এবং জাতীয় গ্রিডে কত গ্যাস যুক্ত হলো। এতে জবাবদিহিও বাড়বে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমবে।

 

আমরা কি ৯৫ শতাংশ আমদানি শূন্যে নামাতে পারব?
এক কথায় এর উত্তর- না, অন্তত অদূর ভবিষ্যতে নয়। তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করার মতো সম্পদভিত্তি আছে- এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
গ্যাসের ক্ষেত্রে দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তেলের ক্ষেত্রে কৌশলগত মজুত, সরবরাহকারীর বৈচিত্র্য ও জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। বিদ্যুৎ ও পরিবহনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।
অর্থাৎ লক্ষ্য হওয়া উচিত আমদানি সম্পূর্ণ শূন্য করা নয়; অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা কমানো।

 

সুযোগ এখনও আছে
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো- খেলা এখনো শেষ হয়নি। আমাদের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র আছে। ভোলায় সম্ভাবনা আছে। দেশের বিভিন্ন স্থলভাগের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো এখনো পুরোপুরি অনুসন্ধান করা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রাঞ্চল এখনো মূলত অনাবিষ্কৃত।
২০২৬ সালে সরকারের নতুন সমুদ্রভিত্তিক দরপত্র আহ্বান, সংশোধিত উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি, বাপেক্সের খনন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এবং নতুন অনুসন্ধান কূপের পরিকল্পনা তাই আশার কারণ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে।
ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই আসল। দরপত্র আহ্বান নয়- খনন চাই। খনন নয়- বাণিজ্যিক আবিষ্কার চাই। আবিষ্কার নয়-উৎপাদন চাই। আর উৎপাদন নয়-সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানো চাই।
এই চার-পাঁচটি ধাপের প্রতিটি যদি দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা যায়, তবেই ২০২৬ সালের উদ্যোগকে বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির মোড় পরিবর্তনের সূচনা বলা যাবে।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আমাদের এখন আর শুধু এই প্রশ্ন করার সময় নেই-‘দেশে গ্যাস আছে কি?’
প্রশ্ন হওয়া উচিত- ‘আমরা কতটা খুঁজেছি, কতটা জানি এবং যা আছে তার কতটা অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি?’
একটি দেশ তার জ্বালানি নিরাপত্তা অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ থাকতে পারে না। জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
আমরা ৫৫ বছর হারিয়েছি। আর একটি দশক হারানোর সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট