চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

বেইজিংয়ের পথে মধ্যপ্রাচ্যের বাতাস

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১৯ জুন, ২০২৬ | ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার খবরে বিশ্বজুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনাকে অনেকেই ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়, সমুদ্রপথ খুলে যায় এবং আলোচনার টেবিলে সমঝোতা হয়, তাহলে প্রকৃত বিজয়ী কে?
অর্থনীতিবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেফরি স্যাক্স এর মতো অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, দৃশ্যমান কূটনৈতিক অর্জনের আড়ালে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যেখানে চীন ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে নিজের অনুকূলে নিয়ে যাচ্ছে।

 

বহু বছর ধরে ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বেইজিং তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। চীন আজ ইরানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং জ্বালানি ক্রেতা। ফলে তেহরানের ওপর এমন একটি প্রভাব চীনের রয়েছে, যা অন্য অনেক রাষ্ট্রের নেই। সাম্প্রতিক সমঝোতার প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্পর্ক বেইজিংকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে তারা উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে নীরব কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হয়নি। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু ইরানের জন্য নয়, চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হতো।

 

এই ঘটনায় আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য আর আগের মতো এককভাবে মার্কিন প্রভাব বলয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একসময় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। চীন একই সঙ্গে ইরান, উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠছে, যেখানে অর্থনৈতিক প্রভাব ক্রমেই সামরিক শক্তির সমকক্ষ হয়ে উঠছে।

 

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমব্রিজ (কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল মুদ্রাভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেন প্ল্যাটফর্ম)। এমব্রিজ প্রকল্পটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেনের একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। যদি ভবিষ্যতে ইরান, চীন এবং কিছু আরব রাষ্ট্র এই ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনা শুরু করে, তবে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলারের একচেটিয়া প্রভাব কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তবে এমব্রিজ এখনও একটি বিকাশমান ও সীমিত পরিসরের উদ্যোগ। এটি স্বল্পমেয়াদে ডলারভিত্তিক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হয়ে উঠছেÑ এমন দাবি করার সময় এখনও আসেনি।

 

অবশ্য এখানে বাস্তবতার কথাও বলতে হবে। ডলারের আধিপত্য রাতারাতি শেষ হয়ে যাচ্ছেÑ এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। এখনও বৈশ্বিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ডলারভিত্তিক কাঠামো। মার্কিন আর্থিক বাজারের গভীরতা, আইনগত সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক আস্থা এখনও অন্য যে কোনো বিকল্পের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
তবে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে বিশ্ব ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান নির্ধারক ছিল। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে বন্দর, জ্বালানি, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ক্ষেত্রগুলোতে চীন ধারাবাহিকভাবে তার অবস্থান শক্তিশালী করছে।

 

অন্যদিকে, আরব রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকাও নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা, সীমান্ত সংকট এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। অনেক আরব রাষ্ট্রের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে যে ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী নীতির ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল ও তার সমর্থকরা যুক্তি দেন যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তাই তাদের পদক্ষেপের প্রধান কারণ। একই সময়ে আরব রাষ্ট্রগুলোও বুঝতে পারছে যে কেবল সামরিক সংঘাত নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সংযোগই স্থিতিশীলতার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হতে পারে। এই কারণেই তারা একদিকে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকলেও অন্যদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে।

 

সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল একটি যুদ্ধবিরতি বা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখলে ভুল হবে। এর অন্তরালে চলছে আরও বড় প্রতিযোগিতা; কে ভবিষ্যতের মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং আর্থিক কাঠামো নির্ধারণ করবে।
যুদ্ধের ধোঁয়া হয়তো আপাতত সরে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালীতে আবার জাহাজ চলবে। বাজারে স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রতিটি যুদ্ধের একটি দৃশ্যমান সমাপ্তি থাকে, আবার একটি অদৃশ্য পরিণতিও থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের অদৃশ্য পরিণতি হতে পারে শক্তির কেন্দ্রের ধীর কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্থানান্তর।

 

এই স্থানান্তর একদিনে ঘটবে না, কিংবা এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হঠাৎ করেই বিলীন হয়ে যাবে। বরং বাস্তবতা হলো, ওয়াশিংটন এখনও নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি। কিন্তু একই সঙ্গে বেইজিং ধৈর্য বাণিজ্য, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর কূটনীতির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ক্রমাগত শক্তিশালী করে চলেছে।
হয়তো এই কারণেই ‘কে যুদ্ধ থামালো’ সেটি নয় আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- যুদ্ধ থামার পর নতুন বিশ্বব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হলো কে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকের দৃষ্টি এখন ক্রমশ ওয়াশিংটন থেকে সরে বেইজিংয়ের দিকে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট